Advertisement

পায়ে বারবার টান ধরছে, যে ৫ কারণ হতে পারে দায়ী

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
পায়ে বারবার টান ধরছে, যে ৫ কারণ হতে পারে দায়ী

হঠাৎ পায়ের পেশিতে টান ধরে শক্ত হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শুরু হলো তীব্র ব্যথা। অনেক সময় রাতে ঘুমের মধ্যেও এমনভাবে পায়ে টান ধরে যে ঘুম ভেঙে যায়। সাধারণত কিছুক্ষণ পর টান ছেড়ে যায়, কিন্তু ওই সময়ের ব্যথা বেশ কষ্টদায়ক হতে পারে।

Advertisement

পায়ে টান ধরলেই অনেকেই ধরে নেন, শরীরে পানির ঘাটতি হয়েছে। পানিশূন্যতা অবশ্যই পেশিতে টান ধরার একটি কারণ হতে পারে। বিশেষ করে গরমে বেশি ঘামলে শরীর থেকে পানি ও বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। তবে সব ধরনের পেশিতে টানের জন্য শুধু পানিশূন্যতাকে দায়ী করা ঠিক নয়। পেশির অতিরিক্ত ব্যবহার, দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় থাকা, স্নায়ুর সমস্যা, রক্ত চলাচলে সমস্যা, কিছু রোগ ও ওষুধের কারণেও এমন হতে পারে।


পায়ে টান ধরলে আসলে কী হয়

পায়ের কোনো পেশি হঠাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্ত হয়ে গেলে তাকে পেশিতে টান বা লেগ ক্র্যাম্প বলা হয়। সাধারণত পায়ের পেছনের পেশি বা কাফে এটি বেশি দেখা যায়। তবে উরু কিংবা পায়ের পাতাতেও টান ধরতে পারে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পেশিতে টান গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ নয় এবং কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা কমে যায়। তবে যদি নিয়মিত এমন হতে থাকে, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যথা থাকে বা অন্য কোনো উপসর্গের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত পরিশ্রম ও পেশির ক্লান্তি

হঠাৎ বেশি হাঁটা, দৌড়ানো, ব্যায়াম করা বা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে পায়ের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করার পর হঠাৎ কঠিন ব্যায়াম শুরু করলে পেশিতে টান ধরার ঝুঁকি বাড়ে।

একইভাবে সারাদিন শারীরিক পরিশ্রমের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নিলেও পেশি ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। গবেষণায় পেশির ক্লান্তি ও অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে ক্র্যাম্পের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাই ব্যায়াম বা ভারী কাজের আগে শরীরকে প্রস্তুত করা এবং পরে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

শরীরে পানি ও খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া

পানিশূন্যতা পায়ে টান ধরার পরিচিত কারণগুলোর একটি। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় বেশি ঘাম হলে শরীর থেকে শুধু পানি নয়, সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইটও বেরিয়ে যায়।

ইলেকট্রোলাইট শরীরের পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালশিয়াম বা সোডিয়ামের মাত্রায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে কিছু মানুষের পেশিতে টান বা খিঁচুনি হতে পারে।

তবে পায়ে টান ধরলেই নিজের ইচ্ছায় পটাশিয়াম বা ম্যাগনেশিয়ামের সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। শরীরে কোন খনিজের ঘাটতি আছে কি না, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করে দেখা ভালো।

দীর্ঘ সময় বসে বা একই অবস্থায় থাকা

অনেকক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকা, দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকা কিংবা পা একই অবস্থায় রাখার কারণেও পেশিতে টান ধরতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ের পেশি নিষ্ক্রিয় থাকে এবং রক্ত চলাচলেও প্রভাব পড়তে পারে।

অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, দীর্ঘ যাত্রা কিংবা একটানা দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাস থাকলে মাঝেমধ্যে অবস্থান পরিবর্তন করা এবং হালকা হাঁটাচলা করা উপকারী হতে পারে। দীর্ঘ সময়ের নিষ্ক্রিয়তা পায়ে ক্র্যাম্পের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

স্নায়ু বা রক্ত চলাচলের সমস্যা

পায়ে বারবার টান ধরার পেছনে স্নায়ুর সমস্যাও থাকতে পারে। মেরুদণ্ডের কোনো অংশে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়লে পায়ে ব্যথা, ঝিনঝিনি, জ্বালাপোড়া বা টান ধরার মতো অনুভূতি হতে পারে।

আবার পায়ের রক্তনালিতে রক্ত চলাচল কমে গেলেও ব্যথা বা পেশিতে টান দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে হাঁটার সময় পায়ে ব্যথা বা টান শুরু হয় এবং বিশ্রাম নিলে কমে যায়, এমন হলে রক্ত চলাচলের সমস্যা আছে কি না তা চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কিছু রোগ ও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বারবার পায়ে টান ধরার সঙ্গে কিছু শারীরিক সমস্যারও সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, কিডনির অসুস্থতা, লিভারের রোগ এবং কিছু স্নায়ুর সমস্যা পেশিতে ক্র্যাম্পের কারণ হতে পারে।

এ ছাড়া কিছু ওষুধের কারণেও পেশিতে টান ধরতে পারে। বিশেষ করে কিছু মূত্রবর্ধক ওষুধ এবং কোলেস্টেরল কমানোর কিছু ওষুধের সঙ্গে পেশিতে ব্যথা বা ক্র্যাম্পের সম্পর্ক পাওয়া যায়।

কোনো নতুন ওষুধ শুরু করার পর যদি হঠাৎ পায়ে নিয়মিত টান ধরতে শুরু করে, তাহলে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো উচিত।

রাতে পায়ে টান ধরার কারণ কী

অনেকের ক্ষেত্রে পায়ে টান ধরার সমস্যা রাতে বেশি হয়। একে সাধারণভাবে রাতের পেশির ক্র্যাম্প বলা হয়। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কাফের পেশি শক্ত হয়ে গিয়ে তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে।

এর নির্দিষ্ট কারণ সব সময় পাওয়া যায় না। পেশির ক্লান্তি, দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় থাকা, বয়স বাড়া এবং কিছু শারীরিক সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

টান ধরলে তখন কী করবেন

পায়ে হঠাৎ টান ধরলে প্রথমে যে পেশিতে টান ধরেছে সেটি ধীরে ধীরে প্রসারিত করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কাফে টান ধরলে পা সোজা করে পায়ের পাতার আঙুল নিজের শরীরের দিকে ধীরে টেনে আনা যেতে পারে।

হালকা হাতে আক্রান্ত পেশিতে মালিশ করলেও আরাম পাওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে গরম সেঁক পেশিকে শিথিল করতে সাহায্য করতে পারে। সাধারণত কিছুক্ষণ পর ক্র্যাম্প নিজে থেকেই কমে যায়।

তবে জোর করে পেশি টানবেন না। ব্যথা বাড়লে থেমে যেতে হবে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

মাঝেমধ্যে পায়ে টান ধরলে সাধারণত খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু নিয়মিত বা ঘন ঘন এমন হলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

বিশেষ করে নিচের সমস্যাগুলো থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো-

  • বারবার পায়ে টান ধরা
  • টান ধরার পর দীর্ঘ সময় ব্যথা থাকা
  • পায়ে দুর্বলতা বা অসাড়তা অনুভব করা
  • পায়ে ঝিনঝিনি বা জ্বালাপোড়া থাকা
  • হাঁটার সময় বারবার পায়ে ব্যথা বা টান ধরা
  • পা ফুলে যাওয়া
  • পায়ের ত্বকের রং বদলে যাওয়া
  • নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর সমস্যা দেখা দেওয়া

পায়ে টান ধরার সঙ্গে যদি হঠাৎ পা ফুলে যায়, তীব্র ব্যথা হয়, পা লাল বা অস্বাভাবিক গরম হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ কিছু ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ রক্তনালির সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

কীভাবে পায়ে টান ধরা কমানো যায়

পায়ে টান ধরা পুরোপুরি বন্ধ করার নিশ্চয়তা নেই। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত হালকা শরীরচর্চা করা এবং দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় না থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যায়াম করলে শুরুতে হালকা ওয়ার্মআপ করা এবং শেষে পেশি স্ট্রেচ করা ভালো। গরমে বেশি ঘাম হলে শরীরে পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ঘাটতি হচ্ছে কি না সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পায়ে টান ধরাকে সব সময় শুধু পানিশূন্যতা বা ক্লান্তির সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। একবার বা দুবার এমন হওয়া সাধারণ বিষয় হতে পারে। কিন্তু বারবার হলে শরীরের অন্য কোনো সমস্যার সংকেত কি না, সেটি খুঁজে দেখা দরকার।

সূত্র:হেল্থলাইন