শরীরে ম্যাগনেশিয়াম কমে যাওয়ার নীরব লক্ষণগুলো জেনে রাখুন

সারাদিন কাজ করার পর ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। আবার রাতে হঠাৎ পায়ের পেশিতে টান ধরলেও অনেকেই সেটিকে সাধারণ সমস্যা বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু ক্লান্তি, দুর্বলতা বা বারবার পেশিতে টান ধরার মতো কিছু উপসর্গ শরীরে প্রয়োজনীয় কোনো খনিজের ঘাটতির ইঙ্গিতও হতে পারে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো ম্যাগনেশিয়াম।
ম্যাগনেশিয়াম শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজ থেকে শুরু করে শক্তি উৎপাদন, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং স্বাভাবিক হৃদ্স্পন্দন বজায় রাখতে এটি ভূমিকা রাখে। শরীরে ৩০০টিরও বেশি এনজাইম ব্যবস্থার কাজে ম্যাগনেশিয়াম প্রয়োজন হয়।
তবে শুধু ক্লান্তি বা পেশিতে টান ধরলেই যে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি হয়েছে, এমন নয়। ঘুমের ঘাটতি, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, পানিশূন্যতা কিংবা আরও অনেক কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গ দেখে নিজে থেকে ম্যাগনেশিয়ামের ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়।
শরীরে ম্যাগনেশিয়াম কেন গুরুত্বপূর্ণ
ম্যাগনেশিয়াম শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নেয়। পেশির সংকোচন ও শিথিলতা, স্নায়ুর কার্যক্রম এবং শরীরে শক্তি তৈরির প্রক্রিয়ায় এর ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রোটিন তৈরিতে, হাড়ের গঠন এবং স্বাভাবিক হৃদ্স্পন্দন বজায় রাখতেও সাহায্য করে।
শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি হলে এসব স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তবে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক দিন খাবারে ম্যাগনেশিয়াম কিছুটা কম থাকলেই সাধারণত গুরুতর ঘাটতি তৈরি হয় না। কারণ কিডনি প্রস্রাবের সঙ্গে ম্যাগনেশিয়াম বের হওয়ার পরিমাণ কমিয়ে শরীরে এর মাত্রা ধরে রাখার চেষ্টা করে।
ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতির শুরুতে যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে
ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি ধীরে ধীরে তৈরি হলে প্রথম দিকে লক্ষণ খুব স্পষ্ট নাও হতে পারে। তবে কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
সবসময় ক্লান্ত লাগা
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি নিয়মিত ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভূত হয়, তাহলে বিষয়টি খেয়াল করা দরকার। ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতিতে ক্লান্তি ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। তবে এই দুটি উপসর্গের আরও অনেক কারণ রয়েছে।
তাই শুধু ক্লান্তি দেখে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ক্ষুধা কমে যাওয়া
ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতির শুরুর দিকের লক্ষণ হিসেবে ক্ষুধা কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে বমিভাব বা বমিও হতে পারে।
পেশিতে টান বা খিঁচুনি
শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে পেশিতে সংকোচন, টান বা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। কারও কারও পেশি কাঁপাও হতে পারে।

তবে বারবার পেশিতে টান ধরার একমাত্র কারণ ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি নয়। অতিরিক্ত ব্যায়াম, পানিশূন্যতা, অন্যান্য ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা এবং কিছু ওষুধের কারণেও এমন হতে পারে।
হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি আরও বাড়লে হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের উপসর্গ বারবার হলে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
ঘাটতি বেশি হলে কী হতে পারে
ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা খুব কমে গেলে সমস্যা গুরুতর হতে পারে। পেশিতে তীব্র সংকোচন বা খিঁচুনি, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, খিঁচুনি বা স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর অবস্থায় হৃদ্স্পন্দনও অনিয়মিত হতে পারে।
ম্যাগনেশিয়ামের গুরুতর ঘাটতির সঙ্গে রক্তে ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার ঘটনাও দেখা দিতে পারে।
হৃদ্স্পন্দন অনিয়মিত হওয়ার সঙ্গে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, কিংবা খিঁচুনি হলে বিষয়টি জরুরি চিকিৎসার আওতায় পড়ে। এ অবস্থায় শুধু ম্যাগনেশিয়ামের সাপ্লিমেন্ট খেয়ে অপেক্ষা করা উচিত নয়।
কেন শরীরে ম্যাগনেশিয়াম কমে যেতে পারে
শুধু খাবারে ম্যাগনেশিয়াম কম থাকলেই এর ঘাটতি হয় না। শরীর ঠিকমতো ম্যাগনেশিয়াম শোষণ করতে না পারলেও সমস্যা হতে পারে।
দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া, অন্ত্রের কিছু রোগ এবং শরীরে পুষ্টি শোষণের সমস্যা ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কিছু ওষুধের কারণেও শরীর থেকে বেশি ম্যাগনেশিয়াম বের হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে কিছু ধরনের প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ বা ডাইইউরেটিক এবং দীর্ঘদিন ব্যবহৃত কিছু প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর বা PPI রয়েছে, যেগুলো অ্যাসিডিটি ও বুকজ্বালার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রেসক্রিপশন ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
কোন খাবারে ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়
ম্যাগনেশিয়াম পেতে সব সময় সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না। দৈনন্দিন খাবার থেকেই পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া সম্ভব।
ম্যাগনেশিয়ামের ভালো উৎসের মধ্যে রয়েছে ডাল ও বিভিন্ন ধরনের শিম, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার, বাদাম, বিভিন্ন বীজ, শস্য, সবুজ পাতাযুক্ত সবজি, কিছু ফোর্টিফায়েড বা পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার এবং দুধ ও দইয়ের মতো কিছু দুগ্ধজাত খাবার।

বাংলাদেশের সাধারণ খাবারের তালিকাতেই তাই ম্যাগনেশিয়ামের বেশ কিছু ভালো উৎস রয়েছে। নিয়মিত ডাল, ছোলা, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ পরিমিত পরিমাণে খেলে খাদ্যতালিকায় ম্যাগনেশিয়াম যোগ করা যায়।
প্রতিদিন কতটা ম্যাগনেশিয়াম প্রয়োজন
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের সাধারণত দিনে প্রায় ৪০০ থেকে ৪২০ মিলিগ্রাম এবং প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ৩১০ থেকে ৩২০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম প্রয়োজন। গর্ভাবস্থা ও বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনের পরিমাণ পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে প্রয়োজন মেটাতে সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে খাবারের দিকে নজর দেওয়া ভালো। খাদ্য থেকে পাওয়া ম্যাগনেশিয়াম সাধারণত সুস্থ মানুষের জন্য নিরাপদ।
ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্ট কি নিজে থেকে খাওয়া যায়
শরীরে ঘাটতি আছে সন্দেহ হলেই ম্যাগনেশিয়ামের ট্যাবলেট বা পাউডার শুরু করা উচিত নয়। কারণ অতিরিক্ত ম্যাগনেশিয়াম, বিশেষ করে সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধ থেকে বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে ডায়রিয়া, বমিভাব এবং পেটব্যথা হতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে খাবারের বাইরে সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধ থেকে প্রতিদিন ৩৫০ মিলিগ্রামের বেশি ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যদি না চিকিৎসক অন্যভাবে পরামর্শ দেন। এই সীমা খাবারে স্বাভাবিকভাবে থাকা ম্যাগনেশিয়ামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
বিশেষ করে কিডনির কার্যকারিতা কম থাকলে অতিরিক্ত ম্যাগনেশিয়াম শরীর থেকে বের করে দেওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে সাপ্লিমেন্ট থেকে অতিরিক্ত ম্যাগনেশিয়াম বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
শুধু উপসর্গ দেখে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি বোঝা যায় না
ক্লান্তি, দুর্বলতা, পেশিতে টান বা ঝিনঝিনি দেখা দিলেই শরীরে ম্যাগনেশিয়াম কমে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। একই উপসর্গের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি নির্ণয়ের জন্য শুধু উপসর্গের তালিকা যথেষ্ট নয়। রোগীর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ ব্যবহারের ইতিহাস এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বিবেচনা করতে হয়।
তাই দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, দুর্বলতা বা পেশিতে বারবার টান ধরলে নিজের ইচ্ছায় সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে
পেশিতে সামান্য টান বা কয়েক দিনের ক্লান্তি সাধারণত জরুরি পরিস্থিতি নয়। কিন্তু উপসর্গ তীব্র হলে অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে খিঁচুনি, অস্বাভাবিক হৃদ্স্পন্দন, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তীব্র দুর্বলতা বা গুরুতর স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ম্যাগনেশিয়াম শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে কোনো অলৌকিক খনিজ হিসেবে দেখার কারণ নেই। নিয়মিত ও বৈচিত্র্যময় খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নেওয়াই প্রথম পদক্ষেপ। আর শরীরে সত্যিই ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি থাকলে শুধু ম্যাগনেশিয়াম বাড়ানো নয়, কেন ঘাটতি তৈরি হয়েছে সেটিও খুঁজে বের করা জরুরি।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



