logo

মানুষের শরীরের আদর্শ ওজন কত

মানুষের শরীরের আদর্শ ওজন কত

শরীরের আদর্শ ওজন সবার জন্য কখনই একরকম নয়। তবে বর্তমানে চিকিৎসকরা ওজনকে স্বাস্থ্যের একটি সূচক হিসেবে ব্যবহার করেন। একজন মানুষের জন্য ‘স্বাস্থ্যকর ওজনের পরিসর’ নির্ভর করে তার ব্যক্তিগত নানা বিষয়ের ওপর। আর এই পরিসর চিকিৎসকদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নে সাহায্য করে।

আগে ‘আদর্শ ওজন’ বলতে বোঝানো হতো এমন একটি ওজন, যেখানে মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম। তবে সময়ের সঙ্গে এই ধারণা ও হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা অর্জনের চেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন গড়ে তোলা।

আমার ওজন কত হওয়া উচিত?

ওজন একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি আপনার স্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ চিত্র না। শুধু ওজন কম বা বেশি হলেই স্বাস্থ্য ভালো বা খারাপ বলা যায় না।

যেসব বিষয় আপনার আদর্শ ওজন নির্ধারণে ভূমিকা রাখে— 

  • বয়স
  • জিনগত বৈশিষ্ট্য
  • শারীরিক অবস্থা ও রোগব্যাধি
  • জীবনযাত্রা

যে বিষয়গুলো আদর্শ ওজনকে প্রভাবিত করে

বয়স: বয়স বাড়ার সঙ্গে মেটাবলিজম ধীর হয় এবং হরমোনের পরিবর্তন ঘটে, যা ওজনকে প্রভাবিত করে।

লিঙ্গ: সাধারণত পুরুষদের হাড় ও পেশি বেশি হওয়ায় তাদের ওজন তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

উচ্চতা: উচ্চতা যত বেশি, স্বাস্থ্যকর ওজনের পরিসরও তত বেশি হয়।

রোগ ও ওষুধ: কিছু রোগ বা ওষুধের কারণে ওজন বাড়তে বা কমতে পারে। যেমন স্ট্রেস, ঘুমের অভাব, গর্ভাবস্থা বা কিছু ওষুধ ওজন বাড়াতে পারে।

শরীরের গঠন: কারও শরীরে পেশি বেশি থাকলে তার ওজন বেশি হলেও তা স্বাস্থ্যকর হতে পারে, কারণ পেশির ওজন চর্বির চেয়ে বেশি।

জিনগত প্রভাব: আপনার ক্ষুধা, শক্তি খরচ এবং ওজন বাড়া বা কমার প্রবণতা জিন দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।

আদর্শ ওজন মাপার পদ্ধতি

বডি মাস ইনডেক্স বা BMI

বডি মাস ইনডেক্স হলো একটি প্রচলিত পদ্ধতি, যেখানে ওজন ও উচ্চতার অনুপাত হিসেব করা হয়।

৩০ বা তার বেশি: স্থূলতা
২৫ - ২৯.৯: অতিরিক্ত ওজন
১৮.৫ - ২৪.৯: স্বাভাবিক
১৮.৫ এর নিচে: কম ওজন

বডি মাস ইনডেক্স আপনাকে একটি ধারণা দেয়, কিন্তু এটি শরীরের চর্বির পরিমাণ সরাসরি মাপে না।

এক্ষেত্রে যেসব সীমাবদ্ধতা আছে—

  • পেশি ও চর্বির পার্থক্য বোঝা যায় না
  • বয়স্কদের ক্ষেত্রে ভুল ধারণা দিতে পারে
  • শরীরের কোন অংশে চর্বি বেশি তা জানা যায় না

তাই বডি মাস ইনডেক্স একমাত্র সূচক নয়।

কোমরের মাপ

পেটের চর্বি স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

সাধারণ নির্দেশনা

পুরুষ: কোমর ৪০ ইঞ্চির বেশি নয়
নারী: কোমর ৩৫ ইঞ্চির বেশি নয়

মাপার নিয়ম

  • সোজা দাঁড়ান
  • কোমরের চারপাশে ফিতা দিন
  • খুব চাপ দেবেন না
  • শ্বাস ছাড়ার পর মাপ নিন

কোমর-নিতম্ব অনুপাত (WHR)

কোমরের মাপকে নিতম্বের মাপ দিয়ে ভাগ করলে এই অনুপাত পাওয়া যায়।

এটি পেটের চর্বির ঝুঁকি বোঝাতে সাহায্য করে এবং অনেক ক্ষেত্রে BMI-এর চেয়ে বেশি কার্যকর।

কোমর-উচ্চতা অনুপাত (WHR)

কোমরের মাপকে উচ্চতা দিয়ে ভাগ করা হয়।

  • ০.৫-এর কম: ঝুঁকি কম
  • ০.৫-০.৫৯: ঝুঁকি বাড়ছে
  • ০.৬ বা বেশি: উচ্চঝুঁকি

সহজ নিয়ম: কোমর যেন উচ্চতার অর্ধেকের বেশি না হয়।

শরীরের গঠন বিশ্লেষণ

বিশেষ স্ক্যানের মাধ্যমে শরীরে চর্বি, পেশি ও হাড়ের পরিমাণ জানা যায়।

এতে মোট চর্বির পরিমাণ, পেশির পরিমাণ, হাড়ের ঘনত্ব ও শরীরের কোথায় চর্বি জমছে জানা যায়। এটি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে কার্যকর হলেও সাধারণত সবার জন্য সহজলভ্য নয়।

কীভাবে স্বাস্থ্যকর ওজনে পৌঁছাবেন?

ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু ডায়েট নয়, জীবনযাত্রার পরিবর্তন জরুরি।

পুষ্টিকর খাবার খান

  • ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
  • বেশি করে ফল, সবজি ও প্রাকৃতিক খাবার খান
  • পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার নিন

নিয়মিত নড়াচড়া করুন

  • হাঁটা, ব্যায়াম বা খেলাধুলা বাড়ান
  • প্রতিদিনের ছোটখাটো নড়াচড়াও গুরুত্বপূর্ণ

ওজন কমাতে করণীয়

  • প্রতিদিন যত ক্যালোরি খরচ হয়, তার চেয়ে কম ক্যালোরি গ্রহণ করুন
  • ধীরে ধীরে ওজন কমান, সপ্তাহে আধা থেকে এক কেজি কমানো স্বাভাবিক
  • খুব কম ক্যালোরি গ্রহণ করলে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে

ওজন বাড়াতে করণীয়

যারা কম ওজনের তারা

  • পুষ্টিকর বেশি ক্যালোরিযুক্ত খাবার খান
  • বারবার অল্প অল্প করে খান
  • প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি বাড়ান
  • শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করুন

দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনই আসল

দ্রুত ওজন কমানোর প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাস্তবসম্মত নয়। টেকসই ফল পেতে ধীরে ধীরে অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।

  • সপ্তাহে অন্তত ২.৫ ঘণ্টা ব্যায়াম
  • নিয়মিত পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম
  • দৈনন্দিন জীবনে বেশি চলাফেরা

আদর্শ শরীরের ওজন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়। এটি নির্ভর করে আপনার বয়স, উচ্চতা, লিঙ্গ, জিন, শরীরের গঠন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।

বডি মাস ইনডেক্স, কোমরের মাপ বা অন্যান্য পদ্ধতি আপনাকে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু এগুলোর কোনোটিই একা পুরো চিত্র তুলে ধরে না।

সুস্থ থাকতে সবচেয়ে জরুরি হলো দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস গড়ে তোলা সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিজের জন্য উপযুক্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করাই সবচেয়ে ভালো পথ।

সূত্র : ওয়েব এমডি