অন্তর্বর্তী সরকারকে হামের টিকা নিয়ে ১০ বার সতর্ক ও ৫ বার চিঠি দেওয়া হয়েছিল

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে হামের রুটিন টিকার সংকট ছিল বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। এ বিষয়ে ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারকে সতর্ক করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইউনিসেফের দাবি, বিগত সরকারকে (অন্তর্বর্তী সরকার) টিকার সংকট নিয়ে অন্তত ১০ বার বৈঠকে এবং পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকার ছিল, তবে পর্যাপ্ত ছিল না।
বুধবার (২০ মে) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশ কার্যালয়ের জেপিজি কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম’ বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, বাংলাদেশে দুই ডোজ মিলে (এমআর১ ও এমআর২) প্রতিবছর হামের ৭ কোটি টিকার চাহিদা রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ১ কোটি ৭৮ লাখ (১৭.৮ মিলিয়ন) ডোজ হামের টিকা আসে, যা দেশের মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় রুটিন টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয় এবং বহু শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। তবে টিকার এই ঘাটতি নতুন কিছু নয়।
তিনি জানান, টিকার ঘাটতি নিয়ে ২০১৯ সালের পর থেকেই সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কারণ, কোনো মহামারি রাতারাতি ঘটে না। বিশেষ করে টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সতর্ক সংকেত থাকে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টিকা সরবরাহের বিষয়টি একটি নিয়মতান্ত্রিক ঘটনা। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের তিন বছরের চুক্তি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্তের কারণে ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছিল। আমার মনে হয় না এর আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও ভালো বলতে পারবে।
রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউনিসেফ পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠায়, যার মধ্যে শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক দুই দিন আগে (১০ ফেব্রুয়ারি) পাঠানো হয়েছিল। আমরা আশা করেছিলাম, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির ডেস্কে চিঠিটি থাকবে। আমি এবং আমার সহকর্মীরা অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বার বৈঠক করেছি। প্রতিবারই আমরা বলেছি যে আমরা উদ্বিগ্ন এবং দেশে টিকার সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, দীর্ঘদিন রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে চলতি বছরের মে মাসে আবার দেশে হামের রুটিন টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে। এখন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা, আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদারে কাজ করছে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, টিকা সরবরাহের বিষয়টি একটি নিয়মতান্ত্রিক ঘটনা। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের তিন বছরের চুক্তি ছিল। সে অনুযায়ী হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকাদানে কোনো ধরনের বিঘ্ন হওয়া উচিত নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
টিকা কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি জানান, টিকা একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য হওয়ায় শুধু কম দামের বিষয়টি বিবেচনা করা যায় না। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে টিকাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত, কার্যকর এবং নিরাপদ। ইউনিসেফ বহু বছর ধরেই বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পক্ষে টিকা সংগ্রহ করে আসছে। বড় পরিসরে কেনাকাটা করার কারণে আমরা তুলনামূলক কম দামে মানসম্মত টিকা সরবরাহ করতে পারি। বাংলাদেশ সরকার যদি মনে করে আমাদের কাছ থেকে না নিলেও আরও কম দামে মানসম্মত টিকা পাবে, তাহলে সেটি যেকোনো দেশই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই।
