logo
Advertisement

খাওয়ার পর পেট ফাঁপার সমস্যা, কখন এটি চিন্তার কারণ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
খাওয়ার পর পেট ফাঁপার সমস্যা, কখন এটি চিন্তার কারণ
ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

খাওয়ার পর পেট ভার লাগা, টানটান হয়ে যাওয়া বা অস্বস্তি হওয়া অনেকেরই পরিচিত সমস্যা। বিশেষ করে বেশি খেলে বা তাড়াহুড়ো করে খেলে এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যদি প্রায় প্রতিবার খাবার পরই পেট ফুলে যায়, তাহলে বিষয়টি শুধু খাবারের পরিমাণ বা গ্যাসের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

Advertisement

কারণ নিয়মিত পেট ফাঁপার পেছনে খাবারে অসহিষ্ণুতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অম্লতা, ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমসহ বিভিন্ন হজমের সমস্যা থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এই সমস্যা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।

পেট ফাঁপা কেন হয়?

পেট ফাঁপার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো পরিপাকতন্ত্রে অতিরিক্ত গ্যাস জমা। খাবার খাওয়ার সময় খুব দ্রুত খেলে বা কথা বলতে বলতে খেলে বেশি বাতাস পেটে ঢুকতে পারে। কোমল পানীয় বা অন্য কার্বনেটেড পানীয় পান করলেও পেটে গ্যাস বাড়তে পারে।

একবারে অনেকটা খাবার খাওয়াও পেট ফাঁপার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে খাবার ভালোভাবে না চিবিয়ে দ্রুত খেলে অস্বস্তি বাড়তে পারে।

কিছু খাবারেও হতে পারে সমস্যা: সব মানুষের ক্ষেত্রে একই খাবার পেট ফাঁপার কারণ হয় না। কারও ক্ষেত্রে ডাল বা কিছু সবজি খেলে সমস্যা হতে পারে। আবার দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস বা পেটের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকলে।

কিছু কৃত্রিম মিষ্টি দেওয়া খাবার ও পানীয়ও সংবেদনশীল ব্যক্তির পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই কোন খাবার খাওয়ার পর সমস্যা বেশি হচ্ছে, তা খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু খাবারের কারণে নয়: অনেকেই পেট ফুললেই ধরে নেন, আগের খাবারটি ঠিকমতো হজম হয়নি। কিন্তু নিয়মিত এমন হলে অন্য কারণও থাকতে পারে।

খাবারে অসহিষ্ণুতা: কোনো নির্দিষ্ট খাবার শরীর ঠিকমতো সহ্য করতে না পারলে সেটি খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা বা পায়খানার পরিবর্তন হতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্য: কয়েক দিন ঠিকমতো পায়খানা না হলে অন্ত্রে মল জমে থাকতে পারে। এর ফলে পেটে চাপ, ভারী লাগা এবং ফাঁপাভাব দেখা দিতে পারে।

অম্লতা ও জিইআরডি: পেটের অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে এলে বুকজ্বালা, টক ঢেকুরের পাশাপাশি পেটের অস্বস্তিও হতে পারে। যাঁদের নিয়মিত এমন সমস্যা হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা জিইআরডির মতো সমস্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম: ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা আইবিএসের ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা, পেটব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা বারবার দেখা দিতে পারে। খাবারের পর উপসর্গ বাড়তেও পারে।

কখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন?

মাঝেমধ্যে ভারী খাবার খাওয়ার পর পেট ফুলে গেলে সাধারণত চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু সমস্যা যদি নিয়মিত হতে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তখন কারণ খুঁজে দেখা দরকার।

বিশেষ করে পেট ফাঁপার সঙ্গে নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-

  • কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
  • বারবার বমি হওয়া
  • পায়খানায় রক্ত দেখা
  • তীব্র বা ক্রমশ বাড়তে থাকা পেটব্যথা
  • খাবার গিলতে সমস্যা হওয়া
  • দীর্ঘদিন পায়খানার অভ্যাস বদলে যাওয়া
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া
  • দীর্ঘদিন ধরে পেট ফাঁপা থাকা

এসব লক্ষণ থাকলেই গুরুতর রোগ হয়েছে, এমন নয়। তবে কারণ না জেনে শুধু গ্যাসের ওষুধ খেয়ে সমস্যা চাপা দেওয়াও ঠিক নয়।

কীভাবে বুঝবেন কোন খাবারে সমস্যা হচ্ছে?

পেট ফাঁপার কারণ খুঁজে বের করার একটি সহজ উপায় হলো খাবার ও উপসর্গের তালিকা রাখা।

কোন দিনে কী খেয়েছেন, কখন পেট ফুলেছে এবং কতক্ষণ পর সমস্যা শুরু হয়েছে, তা লিখে রাখতে পারেন। একই সঙ্গে পেটব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব বা ক্ষুধার পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেটিও লিখে রাখুন।

কিছুদিন পর তালিকাটি দেখলে নির্দিষ্ট কোনো খাবারের সঙ্গে সমস্যার সম্পর্ক আছে কি না, তা বোঝা সহজ হতে পারে।

খাবারের অভ্যাসে যে পরিবর্তন আনতে পারেন

পেট ফাঁপা কমাতে প্রথমেই খাবারের ধরন বদলে ফেলতে হবে, এমন নয়। খাওয়ার অভ্যাসেও কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে।

ধীরে খাবার খান: তাড়াহুড়ো করে খেলে বেশি বাতাস পেটে ঢুকতে পারে।

ভালোভাবে চিবিয়ে খান: খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেলে হজমের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।

একবারে বেশি খাবেন না: বড় মিলের বদলে পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে খাওয়া অনেকের ক্ষেত্রে অস্বস্তি কমাতে পারে।

কোমল পানীয় কমান: কার্বনেটেড পানীয় পেটে গ্যাস বাড়াতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন: পর্যাপ্ত পানি পান করা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।

নিয়মিত হাঁটুন: শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

সব খাবার একসঙ্গে বাদ দেবেন না

পেট ফাঁপা শুরু হলেই অনেকেই দুধ, ডাল, সবজি, ফলসহ একের পর এক খাবার তালিকা থেকে বাদ দিতে শুরু করেন। এটি সব সময় ভালো সিদ্ধান্ত নয়।

কোন খাবারে সমস্যা হচ্ছে, তা না বুঝে অনেক খাবার দীর্ঘদিন বাদ দিলে খাদ্যতালিকা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমিত হয়ে যেতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট খাবারের সঙ্গে বারবার সমস্যা হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে কারণটি বোঝা ভালো।

ওষুধ খেয়ে বারবার সমস্যা চাপা দেবেন না

পেট ফাঁপলে অনেকে নিজের মতো করে গ্যাসের ওষুধ বা হজমের ওষুধ খেয়ে নেন। মাঝে মাঝে সাধারণ অস্বস্তিতে এতে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন বা প্রায় প্রতিবার খাবারের পর এমন সমস্যা হলে শুধু ওষুধ খেয়ে যাওয়ার বদলে কারণটি খুঁজে বের করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ পেট ফাঁপা নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়। এটি বিভিন্ন হজমের সমস্যা বা খাবারে অসহিষ্ণুতার একটি উপসর্গ হতে পারে।

প্রতিবার খাবারের পর পেট ফুললে কী করবেন?

প্রথমে লক্ষ্য করুন সমস্যাটি কতদিন ধরে হচ্ছে এবং কোন পরিস্থিতিতে বাড়ছে। খাবারের পরিমাণ, খাওয়ার গতি এবং নির্দিষ্ট খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না, তা দেখুন।

কিছুদিন খাবার ও উপসর্গের তালিকা রাখুন। একই সঙ্গে ধীরে খাবার খাওয়া, ভালোভাবে চিবানো, কোমল পানীয় কমানো, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত হাঁটার মতো অভ্যাস গড়ে তুলুন।

তবুও যদি সমস্যা থেকে যায়, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে পরবর্তী পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারেন।

মাঝেমধ্যে ভারী খাবারের পর পেট ফাঁপা খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু প্রায় প্রতিবার খাবারের পর একই সমস্যা হলে সেটিকে শুধু গ্যাস বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

কোন খাবারে সমস্যা হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করুন, খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন আনুন এবং পর্যাপ্ত পানি ও শারীরিক কার্যক্রমের দিকে নজর দিন। আর পেট ফাঁপার সঙ্গে ওজন কমে যাওয়া, পায়খানায় রক্ত, বারবার বমি, তীব্র পেটব্যথা বা দীর্ঘদিন পায়খানার অভ্যাস বদলে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পেট বারবার একই সংকেত দিলে শুধু উপসর্গ কমানোর চেষ্টা না করে এর কারণ খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া