হার্ট অ্যাটাক আর হার্ট ফেইলিওর এক নয়, জেনে নিন গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য

হার্ট অ্যাটাক আর হার্ট ফেইলিওরকে অনেকেই একই সমস্যা মনে করেন। কারণ দুটিই হৃদ্যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং উভয় ক্ষেত্রেই দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিকিৎসাজনিত অবস্থা। হার্ট অ্যাটাক হয় যখন হৃৎপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ বাধাগ্রস্ত হয়ে হৃদ্পেশির ক্ষতি শুরু হয়। অন্যদিকে হার্ট ফেইলিওর হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা, যেখানে হৃৎপিণ্ড শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের পর কারও কারও হার্ট ফেইলিওর হতে পারে, তবে হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও নানা কারণে হার্ট ফেইলিওর দেখা দিতে পারে। তাই দুটি সমস্যার লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসার পার্থক্য জানা জরুরি।
চলুন জেনে নিই গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগওলো।
হার্ট অ্যাটাক
হার্ট অ্যাটাক হয় যখন হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনির একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত ধমনিতে চর্বি জমে তৈরি হওয়া প্লাক ফেটে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধলে এমনটি ঘটে। এতে হৃদ্পেশির একটি অংশ পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না এবং দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হৃদ্পেশির স্থায়ী ক্ষতি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
হার্ট ফেইলিওর
হার্ট ফেইলিওর মানে এই নয় যে হৃদ্যন্ত্র পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এর অর্থ হলো, হৃদ্যন্ত্র শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারছে না।
এটি সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘদিনের হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাকের কারণে হৃদ্পেশির ক্ষতি, হার্টের ভালভের সমস্যা বা কিছু অন্যান্য রোগের কারণে এমন হতে পারে।
দুই সমস্যার প্রধান পার্থক্য
হার্ট অ্যাটাক একটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা। অন্যদিকে হার্ট ফেইলিওর একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা।
হার্ট অ্যাটাকে মূল সমস্যা হলো রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া। আর হার্ট ফেইলিওরে সমস্যা হলো হৃদ্যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়া।
হার্ট অ্যাটাকে দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হার্ট ফেইলিওরের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ, জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
- বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা বা চাপ অনুভব হওয়া
- ব্যথা কাঁধ, বাহু, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া
- শ্বাসকষ্ট
- অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- বমি বমি ভাব বা বমি
- মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি
সব মানুষের ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে।
হার্ট ফেইলিওরের লক্ষণ
হার্ট ফেইলিওরের উপসর্গ সাধারণত ধীরে ধীরে বাড়ে। এর মধ্যে রয়েছে
- অল্প কাজেই শ্বাসকষ্ট
- শুয়ে থাকলে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া
- পা, গোড়ালি বা পায়ের পাতায় ফোলাভাব
- দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন
- দীর্ঘদিন ধরে কাশি বা শ্বাসকষ্ট
- শরীরে পানি জমার কারণে ওজন বেড়ে যাওয়া
হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও কি হার্ট ফেইলিওর হতে পারে?
হ্যাঁ। অনেকেই মনে করেন, হার্ট ফেইলিওর মানেই আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। এটি ঠিক নয়।
যদিও হার্ট অ্যাটাক হার্ট ফেইলিওরের অন্যতম বড় কারণ, তবে দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্পেশির রোগ, হার্টের ভালভের সমস্যা, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, থাইরয়েডের সমস্যা, কিছু ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের কারণেও হার্ট ফেইলিওর হতে পারে।
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন?
হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
- ধূমপান ছেড়ে দিন।
- রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- প্রতিদিন নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
- ফল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান।
- অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার কম খান।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে।
হার্ট অ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলিওর এক নয়। হার্ট অ্যাটাক একটি আকস্মিক জরুরি অবস্থা, আর হার্ট ফেইলিওর হলো হৃদ্যন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা। দুটি রোগের লক্ষণ, কারণ এবং চিকিৎসা আলাদা হলেও একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক থাকতে পারে।
তাই বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো উপসর্গকে কখনোই অবহেলা করবেন না। দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে গুরুতর জটিলতা এড়ানো এবং জীবন বাঁচানো সম্ভব।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
.png)






