কোলেস্টেরল বাড়লে শরীরে কী পরিবর্তন হয়, যে ৭ লক্ষণ অবহেলা করবেন না

রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে অনেক সময়ই শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। অর্থাৎ, বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকতে পারে। সমস্যা হলো, দীর্ঘদিন ধরে কোলেস্টেরল বেশি থাকলে রক্তনালির ভেতরে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমা হয় এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে আমাদের শরীরে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
মজার বিষয় হলো, কোলেস্টেরল আসলে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি চর্বিজাতীয় পদার্থ। কোষের গঠন, হরমোন তৈরি এবং শরীরের বিভিন্ন কাজে এর ভূমিকা আছে। তবে রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতের নারায়ণা হেলথের এক প্রতিবেদনে উচ্চ কোলেস্টেরলের সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, উচ্চ কোলেস্টেরল সাধারণত নিজে থেকে কোনো লক্ষণ তৈরি করে না। তাই শুধু শরীরের পরিবর্তন দেখে কোলেস্টেরল বেড়েছে কি না, তা নিশ্চিত বোঝা যায় না। তাই এর জন্য রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হয়।
কোলেস্টেরল কী এবং কেন বাড়ে
কোলেস্টেরল হলো মোমের মতো একটি চর্বিজাতীয় পদার্থ। এটি শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজন হয়। শরীর নিজেই প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বেশির ভাগ তৈরি করে নেয়। অন্যদিকে, খাবার থেকেও কিছু কোলেস্টেরল পাওয়া যায়।
রক্তে কোলেস্টেরল পরিবহনের সঙ্গে প্রধানত দুটি ধরনের লাইপোপ্রোটিনের সম্পর্ক রয়েছে।
এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল: রক্তে এলডিএলের মাত্রা বেশি থাকলে ধমনির দেয়ালে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে প্লাক তৈরি হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই প্লাক রক্তনালি সরু করে দিতে পারে।
এইচডিএল বা উপকারী কোলেস্টেরল: এটি রক্ত থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল যকৃতে ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করে। তবে শুধু এইচডিএলের মাত্রা বেশি হলেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
এ দুই ধরনের কোলেস্টেরল ছাড়াও ট্রাইগ্লিসারাইড নামের আরেক ধরনের চর্বিও রক্তে থাকে। ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি এবং এইচডিএল কম বা এলডিএল বেশি থাকলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে।
কোলেস্টেরল বাড়ার পেছনে অতিরিক্ত সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, ডায়াবেটিস, বয়স এবং বংশগত কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে যে ৭টি লক্ষণ দেখা যেতে পারে
প্রথমেই মনে রাখা দরকার, নিচের লক্ষণগুলোর বেশির ভাগই উচ্চ কোলেস্টেরলের সরাসরি কোনো লক্ষণ নয়। কোলেস্টেরল অনেক বেড়ে গেলে কিছু মানুষের শরীরে বিশেষ ধরনের চিহ্ন দেখা যেতে পারে। আবার দীর্ঘদিন কোলেস্টেরল বেশি থাকার কারণে ধমনিতে বাধা তৈরি হলে তার জটিলতার লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
চোখের পাতায় হলুদাভ চর্বির মতো গুটি
চোখের পাতার ভেতরের দিকে বা আশপাশে হলুদাভ, নরম গুটি দেখা দিলে তা জ্যানথেলাজমা হতে পারে। এটি ত্বকের নিচে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমার কারণে তৈরি হয়।
কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ কোলেস্টেরলের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তবে জ্যানথেলাজমা থাকলেই রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, এমন নয়। আবার কোলেস্টেরল বেশি থাকলেও অনেকের চোখের পাতায় এ ধরনের গুটি হয় না।
এমন গুটি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
ত্বকের নিচে চর্বিজাতীয় গুটি
কনুই, হাঁটু, আঙুলের গাঁট, হাতের তালু বা গোড়ালির টেন্ডনের আশপাশে হলুদাভ বা চর্বির মতো গুটি দেখা দিতে পারে। এগুলোকে জ্যানথোমা বলা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে রক্তে কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকলে এ ধরনের গুটি তৈরি হয়। বিশেষ করে কম বয়সে এমন গুটি দেখা দিলে বংশগতভাবে কোলেস্টেরল বেশি থাকার সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ত্বকের সব গুটিই কোলেস্টেরলের কারণে হয় না। তাই নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
চোখের কর্নিয়ার চারপাশে সাদা বা ধূসর বলয়
চোখের কালো অংশের চারপাশে সাদা বা ধূসর রঙের বলয় দেখা গেলে তাকে কর্নিয়াল আর্কাস বলা হয়। এটি কর্নিয়ার প্রান্তে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমার কারণে তৈরি হতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেকের চোখে এই বলয় দেখা যায় এবং তা সব সময় রোগের লক্ষণ নয়। তবে অল্প বয়সে এমন বলয় দেখা দিলে, বিশেষ করে পরিবারে উচ্চ কোলেস্টেরলের ইতিহাস থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানো ভালো।
শুধু চোখের এই পরিবর্তন দেখে কোলেস্টেরলের মাত্রা নির্ধারণ করা যায় না।
হাঁটাচলার সময় পায়ে ব্যথা
হাঁটতে গেলে পায়ের পেশিতে ব্যথা বা টান ধরতে পারে, যা বিশ্রাম নিলে কমে যায়। ধমনিতে রক্ত চলাচল কমে গেলে এমন সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ইন্টারমিটেন্ট ক্লডিকেশন বলা হয়।
দীর্ঘদিন উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলে ধমনিতে প্লাক জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর ফলে পায়ের ধমনিতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে হাঁটতে গেলে পায়ে ব্যথার পেছনে পেশি, স্নায়ু বা হাড়ের সমস্যাসহ আরও অনেক কারণ রয়েছে। নিয়মিত এমন ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বুকে চাপ বা ব্যথা
রক্তে উচ্চ কোলেস্টেরল নিজে সাধারণত বুকব্যথা তৈরি করে না। তবে ধমনিতে প্লাক জমে হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ কমে গেলে বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি বা ব্যথা হতে পারে। একে এনজাইনা বলা হয়।
কখনো ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমি বমি ভাব বা মাথা ঘোরার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
বুকে নতুন বা তীব্র চাপ কিংবা ব্যথা হলে, বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট বা ঠান্ডা ঘামের সঙ্গে দেখা দিলে, জরুরি চিকিৎসা নিন। এটিকে শুধু গ্যাস বা বদহজম ভেবে অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট
হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার মতো স্বাভাবিক কাজেই শ্বাসকষ্ট হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ কমে গেলে বা হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতায় সমস্যা হলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
তবে শ্বাসকষ্ট উচ্চ কোলেস্টেরলের সরাসরি লক্ষণ নয়। হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের রোগ, রক্তস্বল্পতা এবং অন্যান্য সমস্যার কারণেও এটি হতে পারে।
হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।
হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হওয়া
দীর্ঘদিন উচ্চ এলডিএল কোলেস্টেরল থাকলে ধমনিতে প্লাক জমে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। স্ট্রোক হলে হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, একটি হাত বা পা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা কথা বুঝতে সমস্যা হতে পারে।
কখনো হঠাৎ দৃষ্টির সমস্যা, ভারসাম্য হারানো বা তীব্র মাথা ঘোরাও দেখা দিতে পারে।
এগুলো কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার সরাসরি লক্ষণ নয়, বরং স্ট্রোকের সম্ভাব্য সতর্কসংকেত। এমন কিছু দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে, এমনকি কিছুক্ষণের মধ্যে লক্ষণ সেরে গেলেও।
কোলেস্টেরল বেশি কি না বুঝবেন কীভাবে?
উচ্চ কোলেস্টেরল শনাক্ত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো রক্তের লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সাধারণত মোট কোলেস্টেরল, এলডিএল, এইচডিএল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা দেখা হয়।
পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়নের সময় শুধু মোট কোলেস্টেরলের সংখ্যা দেখলেই হয় না। বয়স, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস, পারিবারিক ইতিহাস এবং আগে থেকে হৃদ্রোগ রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়।
পরীক্ষার আগে না খেয়ে থাকতে হবে কি না, তা পরীক্ষাকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। কিছু ক্ষেত্রে উপবাসের প্রয়োজন হতে পারে, আবার সব পরীক্ষার জন্য তা বাধ্যতামূলক নয়।
কারা কোলেস্টেরল পরীক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেবেন?
নিচের ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো উচিত-
- যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে।
- যাদের অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে।
- যারা ধূমপান করেন।
- যাদের পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরলের ইতিহাস রয়েছে।
- যাদের আগে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক বা ধমনির রোগ ধরা পড়েছে।
- যাদের আগে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে।
কত দিন পরপর পরীক্ষা করাতে হবে, তা ব্যক্তির বয়স, ঝুঁকি এবং আগের পরীক্ষার ফল অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী করবেন?
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের পাশাপাশি ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে।
খাবারে সম্পৃক্ত চর্বি কমান। চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, ঘি এবং অতিরিক্ত তেল বা ডুবোতেলে ভাজা খাবার কম খান। রান্নায় পরিমিত পরিমাণে উপযোগী উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করতে পারেন।
আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান। ওটস, ডাল, শিমজাতীয় খাবার, শাকসবজি, ফল এবং পূর্ণশস্যের খাবার খাদ্যতালিকায় রাখুন। দ্রবণীয় আঁশ এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করতে পারে।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন। সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত হাঁটা বা অন্য মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করুন। নতুন করে ব্যায়াম শুরু করার আগে হৃদ্রোগ বা অন্য জটিলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করুন।
ধূমপান বন্ধ করুন। ধূমপান হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং রক্তনালির স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
প্রয়োজনে ওষুধ নিন। চিকিৎসক কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ দিলে নিজের সিদ্ধান্তে তা বন্ধ করবেন না। শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেই সবার কোলেস্টেরল যথেষ্ট কমে না।
উচ্চ কোলেস্টেরলকে নীরব ঝুঁকি বলা যায়, কারণ এটি সাধারণত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ তৈরি করে না। চোখের পাতায় হলুদ গুটি বা ত্বকের নিচে চর্বির মতো গুটি বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে সতর্কসংকেত হতে পারে। আর বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ ধমনির জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে, যার জন্য দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
তবে কোলেস্টেরল বেড়েছে কি না, তা বোঝার জন্য লক্ষণের অপেক্ষা করা ঠিক নয়। ঝুঁকির কারণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করান। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান বর্জন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার মাধ্যমে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য পাওয়া যায়।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নারায়ণা হেলথ থেকে ‘10 Warning Signs of High Cholesterol’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।
