হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি জানতে কোলেস্টেরলের বাইরেও যে পরীক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ

হার্ট অ্যাটাকের কথা উঠলেই কোলেস্টেরলের কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে রক্ত পরীক্ষায় কোলেস্টেরল বেশি এসেছে কি না, তা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত থাকেন। আবার রিপোর্টে কোলেস্টেরল স্বাভাবিক দেখালে অনেকে ধরে নেন, হৃদ্যন্ত্রও নিশ্চয় নিরাপদ।
কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকলেও একজন মানুষের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকতে পারে। কারণ হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা নির্ভর করে শুধু কোলেস্টেরলের ওপর নয়। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, কম শারীরিক পরিশ্রম, ঘুমের সমস্যা, পারিবারিক ইতিহাস এবং কিছু বিশেষ রক্তের উপাদানও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞরা সাম্প্রতিক এমন সাতটি বিষয় তুলে ধরেছেন, যেগুলো সাধারণ কোলেস্টেরল পরীক্ষার বাইরে থেকেও হৃদ্রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ
রক্তচাপ বেশি থাকলেও অনেকের কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই একজন মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করলেও তার রক্তচাপ দীর্ঘদিন ধরে বেশি থাকতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ ধীরে ধীরে রক্তনালির দেয়ালে চাপ তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে এতে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃত।
তাই শুধু কোলেস্টেরল পরীক্ষা করলেই হবে না। নিয়মিত রক্তচাপ মাপাও গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তে শর্করা ও ডায়াবেটিস
রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শুধু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নয়, হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে রক্তনালির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। অনেকের ডায়াবেটিস ধরা পড়ার আগেই শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধের মতো বিপাকীয় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাই কোলেস্টেরল স্বাভাবিক হলেও রক্তে শর্করা কেমন, তা জানা জরুরি।
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি
শরীরের ওজন স্বাভাবিক সীমার বাইরে চলে গেলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে শুধু ওজনের সংখ্যা দেখলেই পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি, শরীরে চর্বির বণ্টন এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্থূলতার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অস্বাভাবিক রক্তের চর্বির মতো একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে থাকতে পারে।
তাই শুধু ওজন কম বা বেশি, সেটি নয়, কোমরের মাপ এবং সামগ্রিক জীবনযাপনও বিবেচনায় রাখা দরকার।
ধূমপান
কোলেস্টেরল স্বাভাবিক হলেও ধূমপান হৃদ্যন্ত্রকে ঝুঁকিমুক্ত করে না।
তামাকের ধোঁয়ার বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ধূমপানকে হৃদ্রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে ধরা হয়।
এমনকি নিয়মিত ধূমপান না করলেও অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে ধূমপান থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরচর্চার অভাব
সারাদিন বসে কাজ করা, গাড়িতে যাতায়াত এবং অবসর সময়ও মোবাইল বা টেলিভিশনের সামনে কাটানোর কারণে অনেকের দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম খুব কমে গেছে।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। নিয়মিত শরীরচর্চা রক্তচাপ, ওজন, রক্তে শর্করা এবং সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
তাই প্রতিদিন জিমে যেতেই হবে, এমন নয়। নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সিঁড়ি ব্যবহার কিংবা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শরীরচর্চার অভ্যাসও উপকারী হতে পারে।
ঘুমের সমস্যা
ঘুমকে অনেকেই হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেন না। কিন্তু পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত কম ঘুম, অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি বা ঘুমের অন্যান্য সমস্যা থাকলে উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বৃদ্ধি এবং বিপাকীয় সমস্যার মতো হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো তৈরি হতে পারে।
তাই শুধু খাবার ও ব্যায়ামের দিকে নজর দিলেই হবে না। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখা দরকার।
পারিবারিক ইতিহাস
কারও বাবা, মা, ভাই বা বোনের অল্প বয়সে হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বয়স ও পারিবারিক ইতিহাসের মতো কিছু ঝুঁকি নিজের ইচ্ছায় পরিবর্তন করা যায় না। তবে এগুলো জানা থাকলে অন্য পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে আরও সতর্ক হওয়া সম্ভব।
অর্থাৎ পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে কোলেস্টেরল স্বাভাবিক দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়ার কারণ নেই।
সাধারণ কোলেস্টেরল পরীক্ষায় আর কী বাদ যেতে পারে?
একটি সাধারণ কোলেস্টেরল পরীক্ষায় সাধারণত এলডিএল, এইচডিএল, ট্রাইগ্লিসারাইডসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মান দেখা হয়। কিন্তু হৃদ্রোগের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে আরও কিছু বিশেষ রক্তের উপাদান বিবেচনা করা যেতে পারে।
এর মধ্যে লিপোপ্রোটিন(এ) বা Lp(a) এবং অ্যাপোলিপোপ্রোটিন বি বা ApoB বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
লিপোপ্রোটিন(এ): লিপোপ্রোটিন(এ) একটি রক্তের কণা, যার মাত্রা অনেকাংশে জিনগতভাবে নির্ধারিত। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি বেশি থাকতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আগ্রহ রয়েছে। তাই পারিবারিকভাবে হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে এই পরীক্ষার কথা বিবেচনা করতে পারেন।
অ্যাপোলিপোপ্রোটিন বি: সাধারণ কোলেস্টেরল পরীক্ষায় রক্তে বিভিন্ন ধরনের কোলেস্টেরলের পরিমাণ দেখা হয়। ApoB কিছুটা ভিন্ন তথ্য দেয়। এটি রক্তে থাকা নির্দিষ্ট ধরনের ক্ষতিকর লিপোপ্রোটিন কণার সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব বেশি না হলেও ক্ষতিকর কণার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ApoB অতিরিক্ত তথ্য দিতে পারে।
তবে এই পরীক্ষা সবার জন্য নিয়মিত করা প্রয়োজন, এমন নয়। কার পরীক্ষা দরকার হবে, তা ব্যক্তির বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে।
কোলেস্টেরল স্বাভাবিক মানেই হৃদ্যন্ত্র নিরাপদ নয়
এখানে মূল বিষয়টি হলো, কোলেস্টেরল হৃদ্রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলেও এটি একমাত্র ঝুঁকি নয়।
ধরা যাক, একজন মানুষের কোলেস্টেরল স্বাভাবিক। কিন্তু তার রক্তচাপ অনেক বেশি, তিনি ধূমপান করেন, শরীরচর্চা করেন না এবং পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে। তার ক্ষেত্রে শুধু কোলেস্টেরলের রিপোর্ট দেখে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কম বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
আবার কারও কোলেস্টেরল কিছুটা বেশি থাকলেও সামগ্রিক ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য বয়স, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, পারিবারিক ইতিহাসসহ আরও অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
প্রয়োজনে আরও পরীক্ষা করা যায়
কোনো ব্যক্তির হৃদ্রোগের ঝুঁকি নিয়ে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত পরীক্ষা করতে পারেন।
এর মধ্যে করোনারি আর্টারি ক্যালসিয়াম বা CAC স্কোরিং একটি পদ্ধতি। সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে করোনারি ধমনিতে ক্যালসিয়াম জমার পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে যখন একজন ব্যক্তির ঝুঁকি কতটা, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়, তখন চিকিৎসক এই পরীক্ষাটি বিবেচনা করতে পারেন।
তবে সব মানুষের জন্য এমন পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। বয়স, উপসর্গ ও সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
শরীরের কিছু সংকেতও উপেক্ষা করবেন না
কখনো কখনো মানুষ মনে করেন, কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকলে বুকে অস্বস্তি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ অন্য কোনো কারণে হচ্ছে।
এটি বিপজ্জনক হতে পারে। বুকে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে কোলেস্টেরলের রিপোর্ট স্বাভাবিক হলেও তা অবহেলা করা উচিত নয়।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব মানুষের ক্ষেত্রে একই রকম নাও হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বুকের ব্যথার পাশাপাশি ক্লান্তি, বমি বমি ভাব বা শরীরের অন্য অংশে অস্বস্তির মতো তুলনামূলক ভিন্ন উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
হঠাৎ তীব্র বা নতুন ধরনের বুকের অস্বস্তি হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
তাহলে হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে কী করবেন?
হৃদ্রোগের সব ঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়। বয়স ও পারিবারিক ইতিহাসের মতো বিষয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্রথমেই ধূমপান বাদ দিতে হবে। নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চার অভ্যাস করতে হবে। রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবারের অভ্যাসও জরুরি।
শুধু একটি রিপোর্ট ভালো এসেছে বলে অন্য বিষয়গুলো উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে কোলেস্টেরল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিই পুরো গল্প নয়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ঘুমের সমস্যা ও পারিবারিক ইতিহাসও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে Lp(a) বা ApoB-এর মতো বিশেষ পরীক্ষাও হৃদ্রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে বাড়তি তথ্য দিতে পারে। তবে নিজের ইচ্ছায় একের পর এক পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করাই ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোলেস্টেরল স্বাভাবিক মানেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি নেই, এমন নয়। হৃদ্যন্ত্রের যত্ন নিতে হলে একটি রিপোর্টের বদলে পুরো স্বাস্থ্যচিত্রের দিকে নজর দিতে হবে।
সূত্র:টাইমস অব ইন্ডিয়া



