logo

হলুদ কি সত্যিই শরীরের জন্য উপকারী, গবেষণায় মিলেছে যে তথ্য

হলুদ কি সত্যিই শরীরের জন্য উপকারী, গবেষণায় মিলেছে যে তথ্য
ছবি: হারভার্ড হেল্থ

বাংলাদেশের মাছের ঝোল, ভারতের চিকেনকারি বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন পদের খাবার, হলুদ ছাড়া এসব রান্নার কথা ভাবাই কঠিন। খাবারের রং ও স্বাদ বাড়াতে বহুল ব্যবহৃত এই মসলা দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া চিকিৎসাতেও জায়গা করে নিয়েছে। সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে শরীরের প্রদাহ কমানো, হাড় ও জোড়ার সুস্থতা বজায় রাখা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, হলুদের এমন নানা উপকারের কথা প্রচলিত আছে।

হলুদের এসব গুণের পেছনে রয়েছে কারকিউমিন নামের একটি রাসায়নিক যৌগ। বিভিন্ন গবেষণায় এই উপাদানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে হলুদ খেলে সত্যিই এসব উপকার পাওয়া যায় কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন আছে।

বিশেষ করে হলুদের নির্যাস থেকে তৈরি সাপ্লিমেন্ট কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে এখনও পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

হাজার বছরের ঐতিহ্য হলুদ

হলুদ শুধু রান্নার মসলা না, দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতীয় উপমহাদেশে বহু শতাব্দী ধরে খাবার, ধর্মীয় আচার, বিয়ের অনুষ্ঠান এবং প্রচলিত চিকিৎসায়ও এর ব্যবহার আছে।

খাদ্যবিষয়ক গবেষক ও পডকাস্টার রাগিনি কাশ্যপ বিবিসির ফুড চেইন অনুষ্ঠানে বলেন, তার পরিবারের শিকড় ভারতের পাঞ্জাবে। হলুদ ছাড়া তিনি কোনো খাবারের কথা ভাবতেই পারেন না।

তার মতে, অসুস্থ হলে এখনও হলুদ ব্যবহারের কথা মনে পড়ে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বস্তি, ঘরোয়া চিকিৎসা এবং শৈশবের স্মৃতি।

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও হলুদের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে বহু আগেই। অভিবাসীদের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন রান্নায় এই মসলা জায়গা করে নিয়েছে।

হলুদের ঔষধি গুণ নিয়ে মানুষের আগ্রহও দীর্ঘদিনের। তবে কোনো উপাদান বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই তার সব ধরনের চিকিৎসাগত কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, এমনটি বলা যায় না।

হলুদের উপকারিতা নিয়ে এত আলোচনা কেন?

হলুদের অন্যতম আলোচিত উপাদান কারকিউমিন। গবেষণাগারে পরিচালিত বিভিন্ন পরীক্ষায় এই যৌগের প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা দেখা গেছে। এ কারণে শরীরের প্রদাহ কমানো, জোড়ার ব্যথা উপশম এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় এর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

এই আগ্রহ থেকেই বাজারে হলুদের নির্যাস দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যায়। এসব পণ্যের প্রচারে কখনো কখনো হাড় ও জোড়ার সুস্থতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতির কথা বলা হয়।

তবে গবেষণাগারে কোনো উপাদানের সম্ভাব্য কার্যকারিতা দেখা যাওয়া এবং মানুষের শরীরে সেটি একইভাবে কাজ করা এক বিষয় না কখনোই। মানুষের ওপর পরিচালিত উচ্চমানের গবেষণা ছাড়া কোনো উপাদানকে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

রাগিনি কাশ্যপের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সাপ্লিমেন্ট কোম্পানির প্রচার হলুদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। বহু মানুষ কোনো উপাদানের উপকারিতা সম্পর্কে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করলে সেই ধারণা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সবসময় বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

কারকিউমিন নিয়ে বিজ্ঞানীদের আপত্তি কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় কর্মরত রসায়নবিদ ড. ক্যাথরিন নেলসন কারকিউমিন নিয়ে শতাধিক গবেষণাপত্র পর্যালোচনা করেছেন। তার মতে, এই যৌগকে ঘিরে অনেক ধরনের স্বাস্থ্যগত উপকারের দাবি করা হলেও সেসব দাবির পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।

কারকিউমিন নিয়ে গবেষণার অন্যতম সমস্যা হলো এর রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য। এটি অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল একটি যৌগ। ফলে পরীক্ষাগারে কিছু পরীক্ষার ফলাফলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে কারকিউমিন কোনো নির্দিষ্ট প্রভাব দেখাচ্ছে, যদিও বাস্তবে সেই প্রভাব চিকিৎসাগতভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো, মুখে খাওয়ার পর কারকিউমিন শরীরে খুব কম পরিমাণে শোষিত হয়। ফলে শরীরের ভেতরে এর কার্যকর মাত্রা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।

কারকিউমিনের শোষণ বাড়াতে অনেক সাপ্লিমেন্টে কালো গোলমরিচের নির্যাস থেকে পাওয়া পাইপেরিন ব্যবহার করা হয়। কিছু গবেষণায় পাইপেরিনের কারণে কারকিউমিনের শোষণ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে শোষণ বাড়লেই যে তা রোগের চিকিৎসায় কার্যকর হবে এমন নিশ্চয়তা নেই।

বড় গবেষণায় কি মিলেছে হলুদের উপকার?

কানাডার অন্টারিওর লন্ডন হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অমিত গার্গ ও তার সহকর্মীরা কারকিউমিনের কার্যকারিতা নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেছেন।

প্রথম গবেষণায় দেখা হয়েছিল, অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজমের অস্ত্রোপচার করা রোগীদের ক্ষেত্রে কারকিউমিন কিডনির ক্ষতি ও প্রদাহ কমাতে পারে কি না। অ্যাওর্টা হলো শরীরের সবচেয়ে বড় ধমনি, যা হৃৎপিণ্ড থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত বহন করে। এই ধমনির দেয়ালে অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠাকে অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম বলা হয়।

প্রায় ৬০০ রোগীকে নিয়ে পরিচালিত ওই পরীক্ষায় কারকিউমিনের উপকারী প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এরপর গবেষকেরা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর কারকিউমিনের একটি বিশেষ মাইক্রোপার্টিকল বা ক্ষুদ্র কণাভিত্তিক প্রস্তুতি পরীক্ষা করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এটি কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করতে বা রোগের অগ্রগতি ধীর করতে পারে কি না, তা যাচাই করা। কিন্তু এই গবেষণাতেও প্রত্যাশিত উপকারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক গার্গ জানান, তারা ইতিবাচক ফল পাওয়ার আশা নিয়েই গবেষণা শুরু করেছিলেন। কারকিউমিন কাজ করে না, তা প্রমাণ করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। তবে গবেষণার ফলাফল তাদের হতাশ করেছে।

এই ফলাফল থেকে অবশ্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে হলুদের কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারই নেই। বরং নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় কারকিউমিন সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

রান্নার হলুদ আর হলুদের সাপ্লিমেন্ট কি এক?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। রান্নায় ব্যবহৃত হলুদ এবং হলুদের নির্যাস থেকে তৈরি সাপ্লিমেন্ট এক জিনিস না।

রান্নার হলুদে কারকিউমিন ছাড়াও বিভিন্ন উপাদান থাকে। খাবারে এটি সাধারণত তুলনামূলক কম পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, সাপ্লিমেন্টে কারকিউমিনের ঘনত্ব অনেক বেশি হতে পারে। কিছু পণ্যে শোষণ বাড়ানোর জন্য অন্য উপাদানও যোগ করা হয়।

অধ্যাপক অমিত গার্গের মতে, কোনো প্রাকৃতিক উপাদান থেকে একটি যৌগ আলাদা করে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা এবং পুরো উপাদানটি খাবারে ব্যবহার করার মধ্যে পার্থক্য আছে।

তাই কারকিউমিন সাপ্লিমেন্টের কোনো গবেষণার ফলাফল সরাসরি রান্নায় ব্যবহৃত হলুদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক না। একইভাবে, রান্নায় হলুদ ব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাসকে সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতার প্রমাণ হিসেবেও ধরা যায় না।

হলুদের সাপ্লিমেন্ট কেনার আগে কী ভাববেন?

হলুদের সাপ্লিমেন্টের বাজার বাড়লেও এসব পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। কোনো পণ্যে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে বলেই সেটি সম্পূর্ণ নিরাপদ বা কার্যকর হবে, এমন না।

কিছু উচ্চমাত্রার কারকিউমিন সাপ্লিমেন্টে পেটের অস্বস্তি, বমি বমি ভাব বা ডায়রিয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে শোষণ বাড়ানোর জন্য তৈরি কিছু পণ্যের সঙ্গে বিরল ক্ষেত্রে যকৃতের ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া কারকিউমিন কিছু ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। তাই নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে, যকৃতের সমস্যা থাকলে বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা চললে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যায় না।

আরও একটা বিষয় বোঝা জরুরি যে, কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবেও হলুদের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করা ঠিক না।

তাহলে কি হলুদ খাওয়া বন্ধ করা উচিত

না। রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে হলুদ ব্যবহার করার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি নেই। হলুদ খাবারের স্বাদ, রং ও বৈচিত্র্য বাড়ায়। একটি সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি খাওয়া যেতে পারে।

তবে হলুদ খেলেই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে, শরীরের সব প্রদাহ কমে যাবে বা কিডনির রোগ প্রতিরোধ হবে, এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। হলুদকে অলৌকিক ওষুধ হিসেবে না দেখে রান্নার একটি পরিচিত মসলা হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।

হলুদের ঔষধি ব্যবহার নিয়ে মানুষের আগ্রহ বহু পুরোনো। আধুনিক বিজ্ঞানেও এর অন্যতম উপাদান কারকিউমিন নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রমাণ সব স্বাস্থ্যগত দাবিকে সমর্থন করে না। বিশেষ করে নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় কারকিউমিন সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও উচ্চমানের গবেষণা প্রয়োজন।

তাই খাবারে হলুদ ব্যবহার করতে পারেন স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু শুধু প্রচলিত ধারণা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি শুনে দামি সাপ্লিমেন্ট কেনার আগে এর সম্ভাব্য উপকার, ঝুঁকি এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সম্পর্কে জেনে নেওয়া জরুরি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা