Advertisement

গাছপালায় ঘেরা বাড়ি কি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
গাছপালায় ঘেরা বাড়ি কি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়

বাড়ির আশপাশে বেশি গাছপালা, বড় বাগান কিংবা হাঁটার জন্য কাছাকাছি সবুজ জায়গা থাকলে শুধু পরিবেশই সুন্দর হয় না, এর সঙ্গে স্বাস্থ্যেরও একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়িতে বড় বাগান থাকা এবং বসবাসের এলাকার কাছাকাছি একাধিক পার্ক বা সবুজ জায়গা থাকার সঙ্গে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কম ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।

Advertisement

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যুক্তরাজ্যের ১৯ হাজারের বেশি মানুষের স্বাস্থ্য ও বসবাসের এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তবে গবেষণার ফলাফলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই যে শুধু বাড়িতে গাছপালা থাকলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।

গবেষকদের মতে, সবুজ পরিবেশ মানুষকে বেশি হাঁটাচলা ও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে উৎসাহিত করতে পারে। পাশাপাশি প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমানো এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তাই বাড়ির আশপাশের সবুজ পরিবেশকে শুধু সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি সম্ভাব্য সহায়ক উপাদান হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বাড়িতে বাগান থাকলে ঝুঁকি কতটা কমেছে?

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষের বাড়িতে তুলনামূলক বড় বাগান ছিল, তাদের টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাগান না থাকা মানুষের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কম ছিল।

অন্যদিকে, বাড়ির ৮০০ মিটারের মধ্যে একাধিক পার্ক থাকা মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা যুক্তরাজ্যের একটি বড় স্বাস্থ্যভিত্তিক তথ্যভান্ডারে থাকা ১৯ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে এই বিশ্লেষণ করেন। তাদের বাড়ির আশপাশে কতটা সবুজ জায়গা, ব্যক্তিগত বাগান এবং পার্ক রয়েছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তবে গবেষণাটি মূলত একটি সম্পর্ক বা যোগসূত্র দেখিয়েছে। অর্থাৎ সবুজ জায়গা থাকার কারণেই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমেছে, এমন সরাসরি কারণ-ফল প্রমাণ করেনি।

সবুজ জায়গা কীভাবে উপকার করতে পারে?

প্রশ্ন হলো, কয়েকটি গাছ বা একটি পার্ক কীভাবে ডায়াবেটিসের মতো রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে?

এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

হাঁটাচলা বাড়ে

বাড়ির কাছে পার্ক বা খোলা সবুজ জায়গা থাকলে সেখানে হাঁটতে যাওয়া সহজ হয়। কেউ সকালে হাঁটতে পারেন, কেউ বিকেলে কিছুক্ষণ বাইরে সময় কাটাতে পারেন।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীর সক্রিয় থাকলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সুবিধা হতে পারে।

অর্থাৎ সবুজ জায়গা হয়তো সরাসরি রক্তে শর্করা কমায় না, কিন্তু মানুষকে বেশি হাঁটতে ও সক্রিয় থাকতে উৎসাহিত করতে পারে।

মানসিক চাপও কমতে পারে

শহরের কোলাহল, যানজট, কাজের চাপ এবং সারাক্ষণ ঘরের ভেতরে থাকার কারণে অনেকের মানসিক চাপ বাড়তে পারে।

গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু সময় কাটানো মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। গবেষকেরা মনে করছেন, সবুজ জায়গার সঙ্গে মানসিক সুস্থতার এই সম্পর্কও ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে যোগ থাকতে পারে।

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ঘুম, খাবারের অভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম এবং ওজনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মানসিকভাবে ভালো থাকা সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ।

রোদে যাওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে

সবুজ জায়গায় সময় কাটানোর অর্থ সাধারণত কিছুটা সময় ঘরের বাইরে থাকা। এর ফলে সূর্যের আলো পাওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে।

গবেষকেরা ভিটামিন ডির মাত্রার সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন।

তবে শুধু ভিটামিন ডির জন্য দীর্ঘ সময় রোদে থাকার প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত সূর্যালোক ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বাইরে থাকার ক্ষেত্রে সময়, আবহাওয়া এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন বিবেচনা করা জরুরি।

মাটির জীবাণুরও কি কোনো ভূমিকা আছে?

গবেষণাটিতে আরও একটি সম্ভাব্য বিষয় উঠে এসেছে। গাছপালা, মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষের বিভিন্ন ধরনের অণুজীবের সংস্পর্শে আসার সুযোগ থাকে।

গবেষকেরা মনে করছেন, প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় অণুজীবের সংস্পর্শ অন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তবে এই বিষয়টি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। তাই বাগানের মাটি বা গাছপালার সংস্পর্শে এলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

শুধু বাগান থাকলেই ডায়াবেটিস ঠেকানো সম্ভব?

না। এখানেই গবেষণার ফলটি সঠিকভাবে বোঝা জরুরি। বাড়ির পাশে বাগান বা পার্ক থাকা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু এটি ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কোনো একক উপায় নয়।

টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, শরীরের ওজন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম এবং আরও অনেক বিষয় ভূমিকা রাখে। তাই বাড়ির সামনে গাছ লাগানোর পাশাপাশি নিয়মিত হাঁটা, পরিমিত খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রয়োজন হলে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

শহরে গাছপালা কেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

শহর যত বড় হচ্ছে, মানুষের বসবাসের জায়গাও তত ঘন হয়ে উঠছে। অনেক এলাকায় খোলা জায়গা বা গাছপালার পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

গবেষকেরা মনে করছেন, শহর পরিকল্পনার সময় শুধু রাস্তা, ভবন বা যানবাহনের কথা ভাবলেই হবে না। মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য পার্ক, বাগান এবং অন্যান্য সবুজ জায়গাও পরিকল্পনার অংশ হওয়া দরকার।

এটি শুধু ডায়াবেটিসের জন্য নয়, হাঁটার সুযোগ, মানসিক স্বস্তি এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের শহরেও বিষয়টি প্রাসঙ্গিক

ঢাকা কিংবা অন্যান্য বড় শহরে অনেক মানুষ দিনের বড় একটি সময় ঘরের ভেতর বা যানবাহনে কাটান। যানজট, ব্যস্ততা এবং সীমিত খোলা জায়গার কারণে নিয়মিত হাঁটার সুযোগও অনেকের কম।

এই পরিস্থিতিতে বাড়ির ছাদে গাছ লাগানো, কাছের পার্কে হাঁটা, বাসার আশপাশে কিছুটা হাঁটার অভ্যাস তৈরি করা কিংবা সম্ভব হলে সবুজ জায়গায় নিয়মিত সময় কাটানো দৈনন্দিন জীবনকে কিছুটা সক্রিয় করে তুলতে পারে।

তবে শহরের পরিবেশে হাঁটার সময় বায়ুদূষণ, অতিরিক্ত গরম এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে আরও কী করা যায়?

সবুজ পরিবেশের পাশাপাশি দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

  • নিয়মিত হাঁটুন। প্রতিদিন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাঁটার অভ্যাস করুন।
  • খাবারে ভারসাম্য রাখুন। অতিরিক্ত মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয় ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্যসহ পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অতিরিক্ত ওজন টাইপ ২ ডায়াবেটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
  • দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না। কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ানো, একটু হাঁটা বা শরীর নড়াচড়া করার অভ্যাস করুন।
  • ঘুমকে গুরুত্ব দিন। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয়।

ঝুঁকি থাকলে পরীক্ষা করুন। পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে বা অন্য ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

বুজ পরিবেশের আসল উপকার হয়তো আরও বড়

সবুজ জায়গা নিয়ে এই গবেষণার ফলকে শুধু ডায়াবেটিসের দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি ছোট করে দেখা হবে।

বাড়ির কাছে একটি পার্ক থাকলে মানুষ হাঁটতে পারেন। গাছপালা থাকলে বাইরে বসার জায়গা তৈরি হয়। শিশুরা খেলতে পারে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। মানসিক চাপ কিছুটা কমতে পারে।

অর্থাৎ সবুজ পরিবেশ এমন একটি জীবনযাত্রার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি সক্রিয় এবং বাইরে থাকতে পারেন।

এ কারণেই গবেষকেরা শহর পরিকল্পনায় সবুজ জায়গাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।

বাড়ির সামনে একটি বাগান থাকা হয়তো ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জাদুকরী সমাধান নয়। কিন্তু নতুন গবেষণাটি দেখাচ্ছে, সবুজ পরিবেশে সহজ প্রবেশাধিকার এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের কম ঝুঁকির মধ্যে একটি যোগসূত্র থাকতে পারে। বাড়িতে বড় বাগান থাকা মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কাছাকাছি একাধিক পার্ক থাকা মানুষের ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কম পাওয়া গেছে।

তাই সুযোগ থাকলে বাড়ির আশপাশে গাছ লাগানো, কাছের পার্কে হাঁটা কিংবা প্রতিদিন কিছুটা সময় প্রকৃতির মধ্যে কাটানো ভালো অভ্যাস হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত সুস্থ থাকার জন্য খুব জটিল কিছু সব সময় প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত হাঁটা, পরিমিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং একটু সবুজের কাছে থাকা, এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই দৈনন্দিন জীবনকে আরও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে।

সূত্র: গালফ নিউজ