পানি খেলেও মুখ, গলা ও চোখ শুকিয়ে যায়, হতে পারে যে রোগের লক্ষণ

গরমে বা বেশি সময় পানি না খেলে মুখ শুকিয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে শ্বাস নিলেও সকালে গলা শুকনো লাগতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি পান করার পরও যদি দিনের পর দিন মুখ ও গলা শুকিয়ে থাকে, বারবার পানি খেতে হয় এবং একই সঙ্গে চোখেও শুষ্কতা অনুভূত হয়, তাহলে বিষয়টি একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
কারণ দীর্ঘদিনের মুখ ও চোখের শুষ্কতা কখনো কখনো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অটোইমিউন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এমন একটি রোগ হলো সজোগ্রেন রোগ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে অশ্রু ও লালা তৈরি করা গ্রন্থিগুলোকে আক্রমণ করে। ফলে চোখে অশ্রু এবং মুখে লালা কমে যায়।
তবে মুখ বা চোখ শুকিয়ে গেলেই সজোগ্রেন রোগ হয়েছে, এমন নয়। পানিশূন্যতা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, কিছু ওষুধসহ আরও অনেক কারণেও এমন হতে পারে। তাই লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে কারণটি পরীক্ষা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
সজোগ্রেন (Sjogren Syndrome) রোগ কী?
সজোগ্রেন একটি দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন রোগ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের শরীরের সুস্থ কোষ ও টিস্যুকে ভুল করে আক্রমণ করে। সাধারণত চোখ ও মুখের আর্দ্রতা তৈরি করা গ্রন্থি বেশি আক্রান্ত হয়।
এই রোগের সবচেয়ে পরিচিত দুটি লক্ষণ হলো চোখ শুকিয়ে যাওয়া এবং মুখ শুকিয়ে যাওয়া। তবে এর প্রভাব শুধু চোখ ও মুখেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ক্লান্তি, জয়েন্টে ব্যথা, ত্বক শুষ্ক হওয়া, শুকনো কাশি কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশে অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।
কীভাবে বুঝবেন চোখ অস্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে?
চোখ শুকিয়ে গেলে শুধু চোখে পানি কম আসবে এমন নয়। অনেক সময় চোখে জ্বালা বা চুলকানি হতে পারে। মনে হতে পারে চোখের মধ্যে যেন বালি বা ধুলা ঢুকে আছে। চোখ লাল হতে পারে, আলো সহ্য করতে কষ্ট হতে পারে এবং কখনো ঝাপসা দেখাও যেতে পারে।
কম্পিউটার বা মোবাইলের দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকলেও চোখ শুকিয়ে যেতে পারে। তাই শুধু চোখ শুকানোর কারণে সজোগ্রেন রোগের কথা ভাবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু চোখের শুষ্কতার সঙ্গে যদি দীর্ঘদিন ধরে মুখ ও গলাও শুকিয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা ভালো।
মুখ ও গলা শুকিয়ে গেলে কী কী সমস্যা হতে পারে?
মুখে লালা শুধু মুখ ভেজা রাখে না, দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লালা কমে গেলে মুখ শুকনো লাগতে পারে, কথা বলতে বা খাবার চিবিয়ে গিলতে কষ্ট হতে পারে। স্বাদ বোঝার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।
দীর্ঘদিন মুখ শুকিয়ে থাকলে দাঁতে ক্ষয় বা গর্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। মুখে ছত্রাকের সংক্রমণও হতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী মুখের শুষ্কতাকে শুধু পানি কম খাওয়ার সমস্যা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
গলাও শুকিয়ে যেতে পারে
মুখে লালা কমে গেলে তার প্রভাব গলাতেও পড়তে পারে। গলা শুকনো লাগা, খাবার গিলতে অস্বস্তি কিংবা শুকনো কাশি হতে পারে। সজোগ্রেন রোগে নাক ও গলার ভেতরের অংশও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।
তবে গলা শুকানোর আরও সাধারণ কারণ আছে। যেমন ঘুমের সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল না খাওয়া কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তাই শুধু এই একটি লক্ষণ দেখে কোনো রোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সব সময় পানি খেতে ইচ্ছে করে?
মুখ শুকিয়ে গেলে অনেকে স্বাভাবিকভাবেই বারবার পানি খেতে শুরু করেন। কেউ কেউ সব সময় সঙ্গে পানির বোতল রাখেন এবং কথা বলার সময়ও বারবার পানি পান করেন।
এটি যদি দীর্ঘদিনের অভ্যাস হয়ে যায় এবং মুখের শুষ্কতা পানি পান করেও পুরোপুরি না কমে, তাহলে কারণটি খুঁজে দেখা ভালো। সজোগ্রেন রোগে লালা কম তৈরি হওয়ার কারণে এমন সমস্যা হতে পারে।
তবে অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ঘন ঘন প্রস্রাবের মতো লক্ষণ থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রাসহ অন্য কারণও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
শুধু মুখ ও চোখ নয়, আরও কিছু লক্ষণ থাকতে পারে
সজোগ্রেন রোগে কারও শুধু চোখ ও মুখের সমস্যা থাকতে পারে। আবার কারও শরীরের অন্য অংশেও উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন-
- দীর্ঘদিনের ক্লান্তি
- জয়েন্টে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া বা ফোলা
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- শুকনো কাশি
- নাক ও গলা শুকিয়ে যাওয়া
- ত্বকে ফুসকুড়ি
- পেশিতে ব্যথা
- মুখ বা ঘাড়ের লালা তৈরির গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
- ঘুমের সমস্যা
- মনোযোগ ও স্মৃতির সমস্যা
এসব লক্ষণ সবার হবে এমন নয়। কারও ক্ষেত্রে রোগের লক্ষণ খুব হালকা থাকতে পারে, আবার কারও শরীরের একাধিক অংশ আক্রান্ত হতে পারে।
কী পরীক্ষা করা হয়?
সজোগ্রেন রোগ শনাক্ত করার জন্য একটি মাত্র পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক সাধারণত রোগীর লক্ষণ, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিবেচনা করেন।
রক্ত পরীক্ষায় কিছু নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি, রক্তকণিকা এবং শরীরে প্রদাহের লক্ষণ দেখা হতে পারে। চোখের শুষ্কতা বোঝার জন্য শিরমার পরীক্ষা করা হয়। এতে চোখ কতটা অশ্রু তৈরি করছে তা পরিমাপ করা হয়। চোখের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে চোখের পৃষ্ঠে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না তাও দেখা যেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে লালা তৈরির গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের ঠোঁটের ভেতর থেকে সামান্য টিস্যু নিয়ে পরীক্ষা করার প্রয়োজনও হতে পারে।
মুখ শুকিয়ে গেলে কী করবেন?
যদি মুখের শুষ্কতা সাময়িক হয়, তাহলে কয়েকটি সাধারণ অভ্যাস কাজে লাগতে পারে। সারা দিনে অল্প অল্প করে পানি পান করুন। ধূমপান এড়িয়ে চলুন। অতিরিক্ত কফি ও অ্যালকোহল মুখের শুষ্কতা বাড়াতে পারে, তাই এগুলো কমানো ভালো।
চিনি ছাড়া চুইংগাম চিবোলে লালা তৈরির পরিমাণ বাড়তে পারে। মুখের পরিচ্ছন্নতার দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে, কারণ দীর্ঘদিন মুখ শুকিয়ে থাকলে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে।
চোখ শুকিয়ে গেলে কী করবেন?
চোখের শুষ্কতা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক হলে আর্দ্রতা বাড়ানোও উপকারী হতে পারে। সরাসরি ফ্যান বা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বাতাস চোখে লাগা এড়িয়ে চলা ভালো।
চোখে ব্যথা, দৃষ্টির পরিবর্তন বা অতিরিক্ত আলো-সংবেদনশীলতা থাকলে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
মাঝে মধ্যে মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা চোখে শুষ্কতা নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু সমস্যা যদি কয়েক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে থাকে, নিয়মিত পানি খাওয়ার পরও না কমে এবং একই সঙ্গে চোখ ও মুখ দুটিই শুকিয়ে যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বিশেষ করে মুখ ও চোখের শুষ্কতার সঙ্গে যদি জয়েন্টে ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, শুকনো কাশি, গিলতে সমস্যা বা লালা গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তবে মনে রাখতে হবে, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা চোখ শুকিয়ে যাওয়া মানেই সজোগ্রেন রোগ নয়। এসব উপসর্গের পেছনে অনেক সাধারণ কারণও থাকতে পারে। কিন্তু চোখ ও মুখের শুষ্কতা যদি দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকে, তাহলে কারণটি না জেনে ফেলে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। দ্রুত কারণ শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও উপসর্গ নিয়ন্ত্রণও সহজ হয়।
সূত্র: নিউজ ১৮, মায়ো ক্লিনিক



