বুকব্যথা ছাড়াও নারীদের হার্ট অ্যাটাকের যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে

হার্ট অ্যাটাকের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তীব্র বুকব্যথা, বুকে চাপ এবং হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ছবি। কিন্তু সব সময় হার্ট অ্যাটাক এতটা স্পষ্টভাবে ধরা দেয় না। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা ঘাড়, চোয়াল, পিঠ বা কাঁধে ব্যথার মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। ফলে অনেকেই এসবকে গ্যাস, বদহজম, ক্লান্তি বা অন্য কোনো সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান।
এ কারণেই নারীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে।
নারীদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কি আলাদা?
পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি। তবে নারীদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে আরও কিছু তুলনামূলক কম পরিচিত লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন-
- শ্বাসকষ্ট
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- ঠান্ডা ঘাম
- মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা
- ঘাড়, চোয়াল, পিঠ, কাঁধ বা এক বা দুই হাতে ব্যথা বা অস্বস্তি
- পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি
- বদহজমের মতো অনুভূতি
- বুক ধড়ফড় করা
সব নারীর একই ধরনের লক্ষণ হবে, এমন নয়। কারও ক্ষেত্রে বুকের অস্বস্তি প্রধান লক্ষণ হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিই বেশি স্পষ্ট হতে পারে।
বুকব্যথা না থাকলেও কি হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?
হ্যাঁ, তীব্র বুকব্যথা না থাকলেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের কিছু লক্ষণ তুলনামূলক অস্পষ্ট হতে পারে।
ধরা যাক, হঠাৎ অস্বাভাবিক দুর্বল লাগছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, ঘাম হচ্ছে বা বমি বমি ভাব হচ্ছে। এর সঙ্গে ঘাড়, পিঠ বা চোয়ালে অস্বস্তিও থাকতে পারে। এসব লক্ষণকে শুধু গ্যাস বা ক্লান্তি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থাকলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
কেন নারীরা লক্ষণগুলো বুঝতে দেরি করেন?
হার্ট অ্যাটাকের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে অনেকেই শুধু তীব্র বুকব্যথাকে মিলিয়ে দেখেন। ফলে শ্বাসকষ্ট, বদহজম, বমি বমি ভাব বা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো লক্ষণকে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয় না।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, নারীরা অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণকে বদহজম, ফ্লু বা স্বাভাবিক ক্লান্তির মতো সাধারণ সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারেন। এতে চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে।
মেনোপজের পর ঝুঁকি বাড়তে পারে
বয়স বাড়ার সঙ্গে নারীদের হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে মেনোপজের পর এই ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ সময় শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি ও ওজন বেড়ে যাওয়ার মতো হৃদ্রোগের ঝুঁকিগুলোও দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু মেনোপজ হয়েছে বলেই হার্ট অ্যাটাক হবে, এমন নয়। বরং এই সময় থেকে রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ওজন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
যেসব কারণে নারীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না। বেশ কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও জীবনযাপনের অভ্যাস এর সঙ্গে যুক্ত।
উচ্চ রক্তচাপ: দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর চাপ বাড়ে। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিস হৃদ্রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর একটি। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে।
উচ্চ কোলেস্টেরল: রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল থাকলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে প্লাক তৈরি হতে পারে। এতে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ধূমপান: ধূমপান হৃদ্রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। ধূমপান করলে হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে তা বন্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত ওজন ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: অতিরিক্ত ওজন, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব সমস্যার মাধ্যমে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই এমন পারিবারিক ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভাবস্থার কিছু সমস্যাও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত
নারীদের হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান স্বাস্থ্য নয়, আগের গর্ভাবস্থার ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মতো কিছু গর্ভকালীন জটিলতা ভবিষ্যতে হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
তাই গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মতো সমস্যা হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে হৃদ্স্বাস্থ্যের বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে অপেক্ষা করা উচিত নয়। লক্ষণ কমে যায় কি না, তা দেখার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
বুকে চাপ বা অস্বস্তির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। নিশ্চিত না হলেও চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেয়ে স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা সেবায় যোগাযোগ করা নিরাপদ। জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা পথেই প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করতে পারেন।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
সব ধরনের হৃদ্রোগ বা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে বেশ কিছু ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। দ্রুত হাঁটা এর একটি সহজ উদাহরণ।
স্বাস্থ্যকর খাবার খান: খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখুন। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, লবণ ও বাড়তি চিনি কমানো ভালো।
ধূমপান বন্ধ করুন: ধূমপান না করা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন: উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা ও ওষুধ গ্রহণ করুন।
কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন: বিশেষ করে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা দরকার হতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন: দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও অনিয়মিত জীবনযাপনও সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ডায়াবেটিসের মতো অনেক ঝুঁকি শুরুতে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও দিতে পারে। ফলে নিজেকে সুস্থ মনে হলেও এসব সমস্যা থাকতে পারে।
তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারেন।
নারীদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সব সময় তীব্র বুকব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা কাঁধে ব্যথার মতো লক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিশেষ করে মেনোপজের পর হৃদ্স্বাস্থ্যের বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া দরকার। তবে বয়স যাই হোক, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন বা পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে এটিকে গ্যাস, বদহজম বা সাধারণ ক্লান্তি ভেবে অপেক্ষা না করা। হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।
সূত্র: এই সময় অনলাইন



-d3fec2.jpg)