স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরেও হতে পারে প্রোস্টেট ক্যানসার, জেনে নিন কারণ

আমরা অনেকেই মনে করি, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করছি মানে বড় কোনো অসুখ-বিসুখ হবে না। কিন্তু আমাদের শরীর সবসময় প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলে না।
নিয়মিত ব্যায়াম, শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া কিংবা নেশাজাতীয় দ্রব্য এড়িয়ে চলা- সবকিছু নিখুঁতভাবে করার পরও অনেক সময় আমাদের শরীরে জেঁকে বসতে পারে মরণব্যাধি প্রস্টেট ক্যানসার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকরা সেখানকার বাসিন্দা রান্ডির জীবনের গল্প দিয়ে আমাদের সামনে সেই কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরেন।
জীবনের নিয়ম মেনে চলেও হঠাৎ ছন্দপতন
রান্ডি সারাজীবন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ ছিলেন। প্রতিদিন নিয়ম করে জিম করা, স্বস্থ্যকর অভ্যাস মেনে চলা, অতিরিক্ত চিনি বা লবণ এড়িয়ে চলা- কোনো কিছুতেই তার গাফিলতি ছিল না। কিন্তু হঠাৎই একদিন তার পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়।
অনেকেই এরকম পরিস্থিতিতে ভাবতেন যে, পেশিতে টান লেগেছে বা হয়তো একটু ম্যাসাজ কিংবা ফিজিওথেরাপি করলেই সেরে যাবে। রান্ডিও কাইরোপ্র্যাক্টর আর ম্যাসাজ থেরাপিস্টের কাছে দৌড়াদৌড়ি করলেন মাসের পর মাস। পরে জানা গেল তার শরীরে মরণব্যাধি প্রস্টেট ক্যানসার বাঁসা বেধেছে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, এত নিয়ম মেনে জীবনযাপন করার পরও কেন এ রকম হয়! স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পরেও কেন প্রোস্টেট ক্যানসার হতে পারে চলুন জেনে নিই-
পুরুষদের প্রোস্টেট গ্রন্থির ক্যান্সারকেই প্রস্টেট ক্যানসার বলে। পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়স হলে পুরুষদের মধ্যে এই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে থাকে।
জেনেটিক্স বা বংশগত প্রভাব
আমরা দৈনন্দিন জীবনে কী খাচ্ছি বা কতটা শরীরচর্চা করছি, নেশাজাতীয় দ্রব্য এড়িয়ে চলছি কি না তা কিন্তু আমাদের শরীরের ডিএনএ পরিবর্তন করতে পারে না। পরিবারের কোনো সদস্যের যদি আগে প্রোস্টেট ক্যানসারের ইতিহাস থাকে, তবে আপনার এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। কিছু নির্দিষ্ট বংশগত বা জিনগত প্রভাব থাকলে খুব সচেতন থাকার পরও এই ক্যানসার দেখা দিতে পারে।
বয়স বেড়ে যাওয়া
প্রোস্টেট ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বয়স। পুরুষদের বয়স যত বাড়ে, প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ৫০ বছর বয়সের পর থেকে এই ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। আপনি যতই ফিট থাকুন না কেন, বয়সের সঙ্গে কোষের স্বাভাবিক ক্ষয় ও মিউটেশন থামানো সম্ভব হয় না।
হরমোনের স্বাভাবিক প্রভাব
আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক হরমোন, বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন এবং ডিএইচটি প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। সুস্থ জীবনযাপন করলেও শরীরে হরমোনের মাত্রা বা এর প্রতি কোষের সংবেদনশীলতায় তারতম্য ঘটতে পারে। পুরুষালী এই হরমোনগুলোর প্রভাবেই অনেক সময় কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই প্রোস্টেটের কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে।
পরিবেশগত কারণ
আপনি যত স্বাস্থ্যকর খাবারই খান না কেন, প্রাত্যহিক জীবনে এমন অনেক রাসায়নিক এবং পরিবেশগত উপাদান রয়েছে যা আমাদের অজান্তেই শরীরে প্রভাব ফেলে। যেমন: প্রসেসড জিনিসপত্রের প্রচ্ছন্ন প্রভাব, প্লাস্টিক বা কারখানার সূক্ষ্ম কেমিক্যাল ইত্যাদি। দীর্ঘদিন ধরে এগুলোর সংস্পর্শে থাকলে কোষের ভেতর মিউটেশন ঘটায়, যা আমরা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন দিয়ে সবসময় আটকাতে পারি না।
নীরব উপসর্গ ও দেরিতে ধরা পড়া
প্রোস্টেট ক্যানসারের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়ে না। কোনো ব্যথা বা বড় ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে না। তাই সুস্থ-সবল একজন মানুষ হয়তো ভাবেনই না যে তার ভেতরে কোনো রোগ বাসা বাঁধছে। ফলে জীবনযাপন ভালো থাকা সত্ত্বেও রোগটি ভেতরে ভেতরে বেড়ে গিয়ে হঠাৎ করেই ধরা পড়ে।
লাইফস্টাইল ভালো হলেও যে বিষয়ে খেয়াল রাখবেন
• নিয়মিত পিএসএ টেস্ট: ৪০ বা ৫০ পার হলেই বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের পরামর্শে পিএসএ স্ক্রিনিং করানো উচিত।
• লক্ষণ অবহেলা না করা: প্রস্রাবে কোনো পরিবর্তন (যেমন: ঘন ঘন হওয়া, চাপ ধরে রাখতে না পারা, কম চাপ হওয়া) কিংবা কোমর ও পিঠে দীর্ঘদিনের অস্পষ্ট ব্যথা থাকলে তা এড়িয়ে না গিয়ে পরীক্ষা করানো।
• পারিবারিক ইতিহাস জানা: পরিবারে কারো ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে অল্প বয়স থেকেই সচেতন হওয়া।
সুস্থ জীবনযাপন আপনাকে অনেক রোগ থেকে রক্ষা করবে ঠিকই, তবে তার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে। সচেতন না হয়ে শুধু জীবনযাত্রা দিয়ে আপনি প্রোস্টেট ক্যানসারের মতো নীরব ব্যাধি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকতে পারবেন না।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম কিউরটুডে-তে ‘Why Healthy Lifestyles Can Still Lead to Metastatic Prostate Cancer’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম শুচি।
