পর্যাপ্ত খাবার খাচ্ছেন তো!

ব্যস্ত জীবন, কাজের চাপ কিংবা ওজন কমানোর তাড়নায় অনেকেই নিয়মিত খাবার বাদ দেন বা প্রয়োজনের তুলনায় কম খান। অনেক সময় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব না পেলেও, শরীর কিন্তু শুরু থেকেই এর সংকেত দিতে থাকে। প্রথমে হালকা মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা দিয়ে শুরু হলেও, দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে তা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
আমাদের শরীর সঠিকভাবে কাজ করতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্যালোরি ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়। যখন সেই চাহিদা পূরণ হয় না, তখন শরীর ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনে—শক্তি বাঁচাতে মেটাবলিজম কমিয়ে দেয়, রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায় এবং একসময় শরীর নিজের সঞ্চিত চর্বি ও পেশী ভাঙতে শুরু করে।
তাই সময়মতো এসব সতর্ক সংকেত বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে করে অপুষ্টি, দুর্বলতা বা গুরুতর জটিলতা হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
প্রথম দিকে যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়
যখন আপনি খাবার কম খান বা একেবারেই খান না, তখন শরীরের মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায়। অর্থাৎ শরীর শক্তি বাঁচাতে কাজ কমিয়ে দেয়।
এই অবস্থায় শরীরে গ্লুকোজ বা রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। এর ফলে দেখা দেয়—
- মাথাব্যথা
- অতিরিক্ত ক্ষুধা
- মনোযোগে সমস্যা
- ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- বমিভাব
- মাথা ঘোরা
- শরীর কাঁপা
- ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা ত্বক
- দ্রুত হৃদস্পন্দন
- খিটখিটে মেজাজ বা উদ্বেগ
- ভারসাম্য হারানো
এই লক্ষণগুলো সাধারণত খাবার খেলে দ্রুত কমে যায়, বিশেষ করে সহজ কার্বোহাইড্রেট খেলে।
দীর্ঘ সময় না খেলে শরীরে কী হয়
যদি দীর্ঘ সময় খাবার না খাওয়া হয়, তখন শরীর বিকল্প শক্তির উৎস খোঁজে। তখন চর্বি ভেঙে কিটোন তৈরি হয়, যাকে কেটোসিস বলা হয়।
এই সময় দেখা দিতে পারে—
- মাথাব্যথা
- মনোযোগ কমে যাওয়া বা ব্রেন ফগ
- ক্লান্তি
- বিরক্তি
- বমিভাব
- ঘুমের সমস্যা
- কোষ্ঠকাঠিন্য
আরও গুরুতর ক্ষেত্রে
- ঝাপসা দেখা
- জড়ানো কথা বলা
- বিভ্রান্তি
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- দুঃস্বপ্ন
- খিঁচুনি
দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টির প্রভাব
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত খাবার না খেলে অপুষ্টি দেখা দেয়। তখন শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না।
এর লক্ষণগুলো হলো—
- চুল পড়া
- ফ্যাকাশে চেহারা
- পেশী দুর্বল হয়ে যাওয়া
- সবসময় ক্লান্ত লাগা
- ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া
- মাসিক অনিয়ম বা বন্ধ হওয়া
- সহজে আঘাতের দাগ পড়া
- ঠান্ডা সহ্য করতে না পারা
- ডায়রিয়া
- ক্ষুধামন্দা
- উদাসীনতা বা খিটখিটে ভাব
বিরল কিন্তু গুরুতর কিছু লক্ষণ
সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে আরও গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে—
- চুল ও নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া
- জিহ্বা বা মুখে প্রদাহ
- শরীরে সূক্ষ্ম লোম গজানো
- ত্বক শুষ্ক বা হলদে হয়ে যাওয়া
- বন্ধ্যাত্ব
- ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া
- হাড় পাতলা হয়ে যাওয়া
- অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
- অতিরিক্ত ওজন কমে যাওয়া
কারা বেশি ঝুঁকিতে
শিশু ও বাচ্চারা: দ্রুত শক্তি খরচ হওয়ায় তাদের মধ্যে লক্ষণ দ্রুত দেখা দেয়
কিশোর-কিশোরী: বৃদ্ধি ও হরমোনে প্রভাব পড়ে
দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি: যেমন ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা অন্ত্রের রোগে ভোগা মানুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে—
- থামছে না এমন বমি বা ডায়রিয়া
- বুক ব্যথা বা দ্রুত হৃদস্পন্দন
- শ্বাস নিতে কষ্ট
- কথা জড়িয়ে যাওয়া
- বিভ্রান্তি
- খিঁচুনি
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়া শুধু ক্ষুধা নয়, এটি ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয়। তাই নিয়মিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণই সুস্থ থাকার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায়।
সূত্র : ভেরি ওয়েল হেল্থ