logo

দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমের ভাব, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমের ভাব, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
ছবি: ইন্টেগ্রিস হেলথ।

সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছেন, কর্মক্ষেত্রে চাপের মধ্য দিয়ে গেছেন কিংবা রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি; এক্ষেত্রে সারাদিন ঝিমুনি ভাব বা ক্লান্তি আসাটা একদম স্বাভাবিক। রাতে ভালো ঘুম না হলে সারাদিনই ঘুমঘুম ভাব আসতে পারে। কিন্তু এই ক্লান্তি যদি নিয়মিত চলতে থাকে কিংবা রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও দিনে ঝিমুনি আসে, তবে সেটা কিন্তু আর স্বাভাবিক থাকে না।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, দিনের বেলা অতিরিক্ত মাত্রায় ঘুম পাওয়া বা ঝিমুনি ভাব শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো বড় সমস্যার সংকেত হতে পারে। আমাদের চারপাশের অনেক মানুষই এই সমস্যায় ভোগেন।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেদেশের প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ অতিরিক্ত ঘুম বা ঝিমুনির সমস্যায় ভোগেন। আমরা বেশিরভাগ সময়ই একে কাজের ক্লান্তি ভেবে ভুল করি। অথচ এর পেছনে স্লিপ অ্যাপনিয়া কিংবা নারকোল্যাপ্সির সমস্যা থাকতে পারে। আবার, কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা জীবনযাত্রার অভ্যাসের কারণেও আপনি ক্লান্ত বোধ করতে পারেন।

এই অতিরিক্ত ঘুম বা ক্লান্তি স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। চলুন জেনে নিই, কোন লক্ষণগুলো দেখা দিলেই আপনি চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন-

মাথায় সবসময় একটা কুয়াশাভাব বা ব্রেইন ফগ কাজ করা

আপনার সঙ্গে কি কখনো এমন হয়েছে যে খুব সহজ একটা কথা বুঝতেও মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যাচ্ছে? পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে বা অতিরিক্ত ঝিমুনিতে আমাদের মস্তিষ্কে একটা জড়তা তৈরি হয়, যাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ব্রেইন ফগ’ বলা হয়।

ব্রেইন ফগ আপনার চিন্তা করার, কোনো কিছু মনে রাখার কিংবা মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকে মারাত্নকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এই অবস্থায় কোনো কিছুতে মন বসানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। একই লাইন বা প্যারাগ্রাফ বারবার পড়ার পরও মাথায় ঢোকে না যে আসলে কী পড়লেন।

এমনকি আড্ডার সময় বা কাজের আলাপ করার সময়ও মূল কথার খেই হারিয়ে ফেলেন অনেকে। এটি সাধারণত সাময়িক হয়, তবে এই অবস্থা কতদিন স্থায়ী হবে তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। সমস্যাটি যদি বেড়ে যায়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিৎ।

ছোটখাটো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং হুট করে অনুতপ্ত হওয়া

ঘুম কম হলে বা শরীর অতিরিক্ত ক্লান্ত থাকলে আমাদের মস্তিষ্কের সজাগ থাকার ক্ষমতা অনেক কমে যায়। ফলে আমরা অনেক সময় না ভেবেচিন্তেই বা তাড়াহুড়োয় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যা একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে মনে হয় আমরা কখনোই করতাম না।

কাজের জায়গায় বা ব্যক্তিগত জীবনে এই মনোযোগের অভাবে ছোটখাটো ভুল হতে থাকে। আর দিন শেষে সেই ভুলগুলোর জন্য নিজের ওপরই রাগ হয়। আপনার ভেতরের এই মনোযোগের ঘাটতি যদি ঘুম কম হওয়ার কারণে হয়, তবে তা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।

স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া

মাঝে মাঝে ছোটখাটো জিনিস ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যাটা যখন নিয়মিত হতে শুরু করে, তখন তা আর স্বাভাবিক থাকে না। আমাদের শর্ট-টার্ম মেমোরির ওপর ঘুমের ঘাটতির মারাত্মক প্রভাব পড়ে। ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র মতো সমস্যায় রাতে ঘুমের ভেতরই আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস সাময়িকভাবে আটকে যায়, যা আমরা টেরই পাই না।

এই অবস্থা আমাদের মস্তিষ্কের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কারণ সারাদিনের ছোটখাটো ঘটনাগুলোকে আমাদের মস্তিষ্ক ঘুমের ভেতর দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে জমা করে। ঘুম যদি গভীর না হয়, তবে নতুন তথ্যগুলো মাথায় গেঁথে যাওয়ার সুযোগই পায় না। এতে করে বহু বছর আগের পুরোনো কথা দিব্যি মনে থাকলেও গতকাল কার সঙ্গে কী কথা হয়েছে তা ভুলে যেতে পারেন।

কাজের গতি কমে যাওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে বিপদের মুখে পড়া

সারাদিন যদি চোখে ঘুম লেগেই থাকে, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আপনার কাজের জায়গায়। কাজের ডেডলাইন ঠিকমতো রক্ষা করা যায় না, আবার কাজের মানও দিন দিন খারাপ হতে থাকে।

কাজের প্রতি এই উদাসীনতা একসময় আপনার চাকরি বা পেশাগত ক্যারিয়ারের জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সঠিক চিকিৎসা নিয়ে এই ঘুমের সমস্যা দূর করলে দেখবেন কাজেও আবার নতুন করে গতি ফিরে এসেছে।

গাড়ি বা বাইক চালানোর সময় চোখে ঘুম নেমে আসা

গাড়ি চালানোর সময় ঝিমুনিভাব আপনার জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলে। আপনি বাইক চালাচ্ছেন বা গাড়ির স্ট্রিয়ারিংয়ে আছেন, আর ঠিক সেই মুহূর্তে চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে- এমন অভিজ্ঞতা কিন্তু অত্যন্ত ভীতিকর।

নিয়মিত যদি এই সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তার দেখান। সবসময় এরকম হওয়া কখনোই স্বাভাবিক কোনো ক্লান্তি নয়, এটি গভীর ঘুমের ঘাটতিজনিত কোনো রোগের বড় লক্ষণ।

রাতে বিছানায় গেলে কিছুতেই ঘুম আসে না

যাদের সারাদিনে অতিরিক্ত ঘুম পায়, দেখা যায় রাতে বিছানায় শুতে গেলে তাদেরই আর ঘুম আসে না। এই যে সারাদিন ঝিমাচ্ছেন অথচ রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন- এটা কিন্তু মোটেই ম্বাভাবিক নয়।

অতিরিক্ত চা-কফি খাওয়া, মানসিক চাপ বা ডিপ্রেশন কিংবা শরীরের কোনো স্থানে দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা এর পেছনে মূল কারণ হতে পারে। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে শুধু ওষুধে কাজ হয় না, নিজের জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনতে হয়। যেমন- শোবার ঘরটা শান্ত ও আরামদায়ক রাখা, ঘরের তাপমাত্রা খুব বেশি গরম বা ঠান্ডা না করা, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা এবং বিকেলের পর ক্যাফেইন গ্রহণ না করা। তবে এগুলোর পরও যদি কাজ না হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।

রাতে অতিরিক্ত নাক ডাকা

রাতে অতিরিক্ত নাক ডাকার অভ্যাসটিই কিন্তু দিনের বেলায় আপনার এমন ঝিমিয়ে পড়ার কারণ হতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়া নামক এক ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন রাতে ঘুমান, তখন তাদের শ্বাসনালী সংকুচিত হয়ে বাতাস চলাচলে বাধা পায়। এর ফলে ঘুমের ভেতর বারবার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

এই সমস্যায় আক্রান্তরা অনেকেই জানেন না যে রাতে তাদের ঘুম কতবার ভেঙেছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তাদের অনেক ক্লান্ত মনে হয় যেন সারারাত ভারী কোনো পরিশ্রম করেছেন। স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঠিক চিকিৎসা করালে দিনের বেলার ঘুম দূর হয় এবং এর সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো মারাত্মক সব ঝুঁকিও কমানো যায়।

এই লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে সারাদিন ঝিমুনি বা ঘুমঘুম ভাবকে আর স্বাভাবিক ভাববেন না। নিজের শরীরের এই ছোটখাটো সংকেতগুলোকে এড়িয়ে না গিয়ে একজন ভালো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হেলথলাইনে ‘Excessive Daytime Sleepiness: When to Talk with Your Doctor’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম।