logo
Advertisement

যেভাবে পাঁচ বছর আগেই ধরা পড়তে পারে ফুসফুসের ক্যানসার

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
যেভাবে পাঁচ বছর আগেই ধরা পড়তে পারে ফুসফুসের ক্যানসার
ছবি : সংগৃহীত

ফুসফুসের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি অনেক দেরিতে ধরা পড়ে। তখন ক্যানসার শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা আশার আলো দেখাচ্ছে।

Advertisement

বিজ্ঞানীরা এমন একটি বিশেষ রক্ত পরীক্ষার তথ্য প্রকাশ করেছেন, যা রোগ ধরা পড়ার পাঁচ বছরেরও বেশি সময় আগে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল সেল (Cell)-এ। গবেষকদের মতে, রক্তে থাকা ১৪ ধরনের বিশেষ প্রোটিনের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ফুসফুসের ক্যানসারের সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম সংকেত দিতে পারে। অর্থাৎ শরীরে টিউমার দৃশ্যমান হওয়ার আগেই কিছু জৈবিক পরিবর্তন শুরু হয়, যা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

কেন আগেভাগে রোগ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ফুসফুসের ক্যানসার সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর কারণ হওয়া ক্যানসারগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটি যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তাহলে চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শুরুর দিকে শনাক্ত হওয়া রোগীদের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ৬০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। কিন্তু ক্যানসার ছড়িয়ে গেলে সেই হার অনেক কমে যায়।

সমস্যা হলো, অধিকাংশ মানুষ তখনই চিকিৎসকের কাছে যান যখন দীর্ঘদিনের কাশি, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ ওজন কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এর আগ পর্যন্ত রোগটি অনেক সময় নীরব থাকে।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে

অস্ট্রেলিয়ার Walter and Eliza Hall Institute of Medical Research-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় প্রায় ৪৮ হাজার রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।

বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, কিছু নির্দিষ্ট প্রোটিনের মাত্রা ও বিন্যাস ভবিষ্যতে ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রোটিনগুলো সরাসরি কোনো টিউমারের উপস্থিতি বোঝাচ্ছিল না। বরং শরীরে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা কিছু প্রদাহজনিত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, যা ভবিষ্যতে ক্যানসারের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

প্রদাহের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক

বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই মনে করেন, শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

প্রদাহ সাধারণত শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তবে এটি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে কোষের ক্ষতি হতে পারে এবং অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

নতুন গবেষণায় যে ১৪ প্রোটিনের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে, তা বিশেষ করে IL-1b নামের একটি প্রদাহজনিত সংকেতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। এই উপাদান আগে থেকেই ক্যানসার তৈরির ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত বলে ধরা হয়।

ভবিষ্যতে কি স্ক্রিনিং সহজ হবে

বর্তমানে ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তে প্রধানত লো-ডোজ সিটি স্ক্যান ব্যবহার করা হয়। সাধারণত দীর্ঘদিন ধূমপান করেছেন এমন মানুষদেরই স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়।

কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষ আছেন, যাদের ধূমপানের ইতিহাস খুব বেশি নয় বা নেই, তারপরও তারা ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হন।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের রক্ত পরীক্ষা চালু হলে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এতে স্ক্রিনিং আরও নির্ভুল হতে পারে এবং রোগ আগেভাগে ধরা পড়ার সুযোগ বাড়বে।

ক্যানসার প্রতিরোধেও কাজে লাগতে পারে

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি ভবিষ্যতে ক্যানসার প্রতিরোধের পথও খুলে দিতে পারে।

গবেষকরা আগের কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যেসব মানুষের রক্তে এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রোটিনের মাত্রা বেশি ছিল, তারা প্রদাহ কমানোর বিশেষ ওষুধ গ্রহণের পর তুলনামূলক কম হারে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।

যদিও এটি এখনও নিশ্চিত প্রমাণ নয়, তবুও বিজ্ঞানীরা মনে করছেন ভবিষ্যতে ঝুঁকিভিত্তিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখনও কেন সতর্ক থাকা জরুরি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রক্ত পরীক্ষা এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। এটি এখনই সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়।

এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত হওয়া বাকি রয়েছে। যেমন-

এই পরীক্ষার নির্ভুলতা আরও বড় জনগোষ্ঠীতে যাচাই করতে হবে।

ভুলভাবে ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তা জানতে হবে।

বর্তমান স্ক্রিনিং ব্যবস্থার সঙ্গে এটি কীভাবে যুক্ত করা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।

আগাম শনাক্তের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব কি না, সেটিও আরও গবেষণার বিষয়

বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

দক্ষিণ এশিয়ায় ধূমপান, বায়ুদূষণ, শিল্পকারখানার দূষণ এবং রান্নার ধোঁয়ার কারণে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক বেশি।

অনেক এলাকায় উন্নত স্ক্যানিং সুবিধা সীমিত। সেক্ষেত্রে সহজ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ শনাক্ত করা গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার এখনও প্রাথমিক ধাপে থাকলেও এটি ভবিষ্যতের ক্যানসার শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমন একটি রোগ, যা এখনও বিশ্বে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যানসার হিসেবে পরিচিত, তার ঝুঁকি কয়েক বছর আগেই শনাক্ত করা গেলে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি