অপুষ্ট শিশুদের হামে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি

চলতি বছর পাঁচ বছরের যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, তাতে টিকার পাশাপাশি বড় কারণ পুষ্টির ঘাটতি। অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে যারা হামে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেশি বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সোমবার (১৮ মে) বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) এক সেমিনারে উপস্থাপন হওয়া গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ সময় মায়ের বুকের দুধ, চিকিৎসা ও আক্রান্তদের আইসোলেশন ও টিকার ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।
সেমিনারে বিএমইউয়ের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেসমিন মোর্শেদ তার উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলেন, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ কিন্তু টিকা ঘাটতির কারণে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ৫ বছরের কম বয়সী ও অপুষ্ট শিশুদের ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও দ্রুত চিকিৎসাই হাম নিয়ন্ত্রণের মূল উপায়।
ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, একসময় বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে হাম রোগ নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যাপক টিকাদান, গণসচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বহু দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেসে। বাংলাদেশেও ইপিআই কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিশুর টিকাদান বৃদ্ধি পাওয়ায় হামজনিত মৃত্যু ও জটিলতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও বিভিন্ন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। টিকা গ্রহণে অনীহা, করোনার সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া, অপুষ্টি, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অভিবাসন ইত্যাদি কারণে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সমাজে হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, হাম শুধু একটি সাধারণ জ্বর-র্যাশের রোগ নয়। এটি নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, ডায়রিয়া ও ইমিউন এ্যামনেশিয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত হামে আক্রান্ত অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমান পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয়, হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু টিকা আবিষ্কার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সবার জন্য সমান টিকাদান নিশ্চিত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা। নির্মূলের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতেই হবে।
ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম রাশেদ উল ইসলাম তার প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় হাম সংক্রমণ চলছে এবং টিকাদান ঘাটতি ও বিলম্বিত ইপিআই ডোজের কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। যার ফলে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া (প্রায় ৩৯ শতাংশ), ডায়রিয়া (২৯ থেকে ৩৮ শতাংশ), এনসেফালাইটিস (১:১০০০), কানের সংক্রমণ ও ভিটামিন এ ঘাটতির কারণে অন্ধত্ব দেখা দেয়। আর হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মৃত্যুহার প্রায় ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ।’
তিনি আরও বলেন, টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুহার সর্বাধিক। হাম মহামারি শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত ভিড় সৃষ্টি করে, অক্সিজেন ও চিকিৎসা সম্পদের ওপর চাপ বাড়ায় এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত করে। তাই জরুরি টিকাদান, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন, পুষ্টি পুনর্বাসন, নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ ও কভারেজ মনিটরিং অপরিহার্য। মূল কথা হলো হাম প্রতিরোধযোগ্য তাই টিকা নিন, সচেতন থাকুন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিএমইউতে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবায় আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত বিএমইউতে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত কোনো শিশু মারা যায়নি।
উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, হাম মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দ্রুত সকল জটিলতা নিরসন করে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। সরকার, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা হাম মোকাবিলায় নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যার বেশি বেশি প্রচার হওয়া জরুরি এবং এতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
সেন্ট্রাল সেমিনার সাব কমিটির সভাপতি ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছার সভাপতিত্বে এবং ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. খালেদ মাহবুব মুর্শেদের (মামুন) সঞ্চালনায় সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।