মানুষের শরীরে শনাক্ত শামোন্ডা ভাইরাস, এটি কীভাবে ছড়ায় ও কতটা বিপজ্জনক

ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে শনাক্ত হয়েছে শামোন্ডা ভাইরাস (Shamonda virus)। এত দিন ভাইরাসটি মূলত গবাদিপশুসহ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে দেখা গেছে। আক্রান্ত ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং তার রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও অনেক কম ছিল। অক্টোবরের শুরুর দিকে তার মৃত্যু হয়। তবে ভাইরাসটি তার মৃত্যুর জন্য কতটা দায়ী, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
ফরাসি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য এই ভাইরাসের কারণে কোনো জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি শনাক্ত হয়নি। তবু মানুষের শরীরে প্রথম সংক্রমণের ঘটনা সামনে আসায় ভাইরাসটির সংক্রমণ, সম্ভাব্য লক্ষণ ও ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
শামোন্ডা ভাইরাস কী?
শামোন্ডা ভাইরাস এক ধরনের অর্থোবুনিয়াভাইরাস (Orthobunyavirus), যা আগে মূলত প্রাণীর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে নাইজেরিয়ায় প্রথম ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। পরে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এবং জাপানে গবাদিপশুর মধ্যে এর সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপের গবাদিপশুর মধ্যেও ভাইরাসটি শনাক্ত হয়।
গরু এই ভাইরাসের প্রধান প্রাণী বাহক। তবে ফ্রান্সে এ বছর কিছু ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়ার মধ্যেও সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
কীভাবে ছড়ায় শামোন্ডা ভাইরাস?
প্রাণীদের মধ্যে শামোন্ডা ভাইরাস সাধারণত Culicoides গণের ক্ষুদ্র কামড়ানো পোকামাকড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। দেখতে ছোট মাছির মতো এসব পোকা আক্রান্ত প্রাণীকে কামড়ানোর পর অন্য প্রাণীর মধ্যেও ভাইরাস ছড়াতে পারে।
ফ্রান্সে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বাঞ্চলে এ ধরনের পোকামাকড়ের কামড়ের মাধ্যমে তিনি সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন। তবে কীভাবে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন, তা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করছে।
মানুষের শরীরে শামোন্ডা ভাইরাসের লক্ষণ কী?
মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফ্রান্সের ঘটনাটি প্রথম শনাক্ত মানব সংক্রমণ হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হলে কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গুরুতরভাবে দুর্বল ছিল। মৃত্যুর আগে তার মস্তিষ্কে জটিলতা দেখা দিয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে এসব জটিলতার সঙ্গে শামোন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণের সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর মধ্যে সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত চলছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, প্রাণীদের মধ্যে দেখা দেওয়া লক্ষণকে সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সাধারণ মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
এখন পর্যন্ত ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষের জন্য কোনো শনাক্ত জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা জানায়নি। ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ECDC) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ফরাসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তবে মানুষের শরীরে ভাইরাসটির প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সীমিত। তাই ভবিষ্যতে সংক্রমণের সম্ভাবনা, রোগের তীব্রতা কিংবা সংক্রমণের অন্যান্য পথ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শামোন্ডা ভাইরাসকে মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া কোনো রোগ হিসেবে বিবেচনা করার কারণ নেই। একই সঙ্গে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে ঝুঁকি মূল্যায়নও পরিবর্তিত হতে পারে।
শামোন্ডা ভাইরাস প্রতিরোধে কী করা উচিত?
মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশনা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে পোকামাকড়ের কামড় এড়াতে কিছু সাধারণ সতর্কতা অনুসরণ করা যেতে পারে।
- বাইরে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পোকামাকড় প্রতিরোধক ব্যবহার করুন।
- পোকামাকড় বেশি রয়েছে এমন এলাকায় শরীর ঢাকা পোশাক পরুন।
- গবাদিপশুর অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখা দিলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- প্রাণীর মধ্যে নতুন সংক্রমণের খবর পেলে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
- কোনো ভাইরাসের খবর শুনে আতঙ্কিত না হয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুসরণ করুন।
এসব সাধারণ সতর্কতা পোকামাকড়ের কামড় কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এগুলো শামোন্ডা ভাইরাসের বিরুদ্ধে পরীক্ষিত বা নিশ্চিত প্রতিরোধপদ্ধতি নয়।
ফ্রান্সে শামোন্ডা ভাইরাসের প্রথম মানব সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে একজনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি শনাক্ত হয়নি। ভাইরাসটি কীভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে, কী ধরনের অসুস্থতা সৃষ্টি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে এর ঝুঁকি কতটা, তা জানতে তদন্ত চলছে। তাই আতঙ্কিত না হয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুসরণ করাই সবচেয়ে ভালো।
সূত্র: ফ্রান্সভিত্তিক রিসার্চ সাইট ইনসার্মে (Inserm) ‘Shamonda virus: first detection in humans’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।

