logo

হাত কেটেও বাঁচানো গেল না ছোট্ট ইরাজকে

হাত কেটেও বাঁচানো গেল না ছোট্ট ইরাজকে
চট্টগ্রামের সাজিনাজ হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে বেসরকারি একটি হাসপাতালে গত ২৫ মে ছেলেসন্তানের জন্ম দেন আমাতুল মাকনুন নামের এক নারী। তবে জন্মের পর তিন হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত হাত কেটেও বাঁচানো যায়নি নবজাতকটিকে। ১১ দিনের মাথায় গত ৪ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় শিশুটির। এ ঘটনায় অভিযোগের তির চট্টগ্রামের সাজিনাজ হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানটির এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে।

অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় প্রতিকার চাইতে গিয়ে উল্টো পরোক্ষভাবে হুমকির শিকার হয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার। যদিও এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করলেও নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা অভিযুক্ত হাসপাতালের। তবে আইনের মাধ্যমে প্রতিকার চান নবজাতক কাজী ইরাজ হোসেনের পরিবার।

চট্টগ্রামের বাসিন্দা ইফতেখার হোসেন ও আমাতুল মাকনুন দম্পতির তৃতীয় সন্তান ইরাজ। ছেলের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইরাজের মা বলেন, ‘গত ২৫ মে চট্টগ্রাম নগরীর সার্জিস্কোপ হসপিটালে আমার একটা ফুটফুটে পুত্রসন্তান হয় সি-সেকশনে (অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে)। কিন্ত বাচ্চার জন্মের সময় অক্সিজেন সমস‍্যা ও নিউমেনিয়া থাকায় লাইফ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতালটিতে না থাকায় চট্টগ্রামের সাজিনাজ হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আর কোনো সমস‍্যা ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির ডা. ফয়সাল আহমেদের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। কোরবানির ছুটিতে উনি (ডা. ফয়সাল আহমেদ) ঢাকা যাওয়াতে ইম্পেরিয়ালের শিশু ডাক্তার আনোয়ার হোসেন চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন।’

তিনি লেখেন, ‘প্রতিদিন দুবার করে আমরা বাচ্চাকে দেখতে যেতাম, শুধু বিকেলে ভিজিটিং টাইমে এক থেকে দুই মিনিট দেখতে দিতো। এর মধ‍্যে ওর অবস্থা উন্নতি হলে পঞ্চম দিন ডিউটি ডাক্তার বলেন ইরাজকে এনআইসিউ থেকে রিলিজ দিয়ে কেবিনে দেবে। ওইদিন আমি আমার বাচ্চার সঙ্গে ও অনুরোধ করে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় কাটিয়েছি। হঠাৎ দেখলাম ওর বাম হাতে ব‍্যান্ডেজ করা। আমি জিজ্ঞেস করায় ডাক্তার বলেন, ‘কিছু না, নাথিং’ । পরের দিন সকালে সাজিনাজের ডা. ফয়সাল আহমেদ ঢাকা থেকে আসায় আমাদের ডেকে পাঠায়। বাচ্চাকে দেখানো হলে, দেখা যায় ইরাজের বাম হাতের তলা পুরো কালো এবং ইনডেক্স ফিঙ্গার, রিঙ ফিঙ্গার কালো হয়ে গেছে, হাত গাঢ় গোলাপি বর্ণের মতো।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিলাম গতকাল দেখে গেলাম ভালো, আজকে কেন এই অবস্থা। আমি বুঝে গিয়েছি ওরা ক‍্যানুলাতে কিছু ভুল করেছে। এটা স‍্যালুলাইড হয়ে গ‍্যাংগ্রিনের (মারাত্মক ও প্রাণঘাতী অবস্থা) দিকে চলে যাচ্ছে। প্রথম থেকে এটা ডা. আনোয়ার বা ডিউটি ডাক্তারদের দোষ। ওরা শুরুতে মানতে নারাজ ছিল। পরে ঠিকই স্বীকার করে, ওদের বিশাল বড় ক্রাইম (অপরাধ) হয়েছে। পরে চট্টগ্রামে চিকিৎসা না করে ঢাকায় নেওয়ার কথা বলে। আমরা সব ঠিক করে ফেললাম। কিন্তু এরই মধ‍্যে চট্টগ্রামের আরও কিছু ডাক্তার অন কলে এবং ডাক্তার মিনহাজ (ভাসকুলার সার্জন) কিছু ট্রিটমেন্ট দিল এবং কিছুটা ভালোর দিকে বলল। আমরাও দেখলাম কালো ভাবটা কমেছে। ওরা বলল পারবে, তাই ঢাকায় যেন না যাই। ফলে ওইদিন আর গেলাম না। পরেরদিন ইরাজের অবস্থা আরও খারাপ হলে তাৎক্ষণিকভাবে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়া হয়।’

আমাতুল মাকনুন লেখেন, ‘তার আগেই ইরাজের ঠিকভাবে ঢাকায় নিতে ছোট্ট একটা সার্জারি করা হয়। পেডিয়াট্রিক সার্জারির ডা. আদনান ওয়ালিদ অপারেশন করেন। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় ইবনে সিনা হাসপাতালে নিলে ব‍্যান্ডেজ খোলার পর দেখা যায় হাতের কবজি পর্যন্ত গ‍্যাংগ্রিন। আর ওইটা থেকে পুরো বডিতে অনেকটায় ইনফেকটেড হয়েছে। ওর বডির (দেহ) অরগ‍ান (অঙ্গপ্রত্যঙ্গ) কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর ইবনে সিনা জানায় তারা বাচ্চার ঝুঁকি নেবে না। পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিলে ভালমতো চিকিৎসা শুরু করে। গ‍্যাংগ্রিন শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় হাত কেটে ফেলার পরামর্শ দিলে তাতেও রাজি হই এবং ইরাজের হাত কাটা হয়। চিকিৎসক জানায় বাঁচা-মরার সম্ভাবনা সমান সমান।’

ইরাজের মা লেখেন, ‘এভারকেয়ারের চিকিৎসকেরা বলেন, সাজিনাজ যে অপারেশন করেছে তাতে অনেক ভুল আছে। প্রথমত জায়গাটা তারা পরিষ্কার করেনি। চাইলেই ফেক স্কিন বসিয়ে সার্জারি করতে পারত। এ ছাড়াও যেদিকে সার্জারি করার দরকার ছিল, ওদিকে না করা এবং চার থেকে পাঁচটি রক্তনালি কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে এভারকেয়ারের চিকিৎসক যখন হাত কাটার কথা বলেছে, তখন রাজি হয়ে যাই। চিকিৎসকেরা বলেন, শরীরের অনেকটাই সংক্রমিত হয়ে গেছে। ৩ জুন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাত ফেলে দেওয়া হলে পরদিন পুরো শরীরের রং পরিবর্তন হয়ে যায়, প্রেসার একেবারে কমে আসে এবং পেট ও লিভার ফুলে যায়। এ ছাড়াও দুবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে ৪ জুন মারা যায় ইরাজ।’

এ ঘটনার জন্য সাজিনাজ হাসপাতালের ডা. আনোয়ার হোসেন এবং ডিউটি ডাক্তারদের অবহেলাকে দায়ী করেন ইরাজের মা। তিনি বলেন, ‘সাজিনাজ লুকোচুরি করেছে। শেষ দুদিন ডা. আনোয়ার দেখা করতেও আসেনি। আর যখন থেকে দেখেছে আমার বাচ্চার হাতে সমস‍্যা ওরা হাতের কোনো পরীক্ষা বা কোনো প্রকার টেস্ট করায়নি। অপারশনটাও ভুল করেছে।’

চট্টগ্রামের সাজিনাজ হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সাজিনাজ হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

সন্তানের মারা যাওয়ার এ ঘটনার বর্ণনা দ্রুত ভাইরাল হলে অনেকেই ওই হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও নিজেদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানাতে দেখা গেছে মন্তব্যের ঘরে।

বিষয়টি নিয়ে শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শিশু ইরাজের মা আমাতুল মাকনুনের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানের সঙ্গে যা হয়েছে তা স্পষ্ট অপরাধ। আমার সন্তানকে তারা খুন করেছে। আমি এ ঘটনায় সরকারের কাছে বিচার চাই।’

তিনি বলেন, ‘সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটা ফোন দিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেনি। উল্টো আমাকে সরাসরি না হলেও বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমার পরিবারের বিষয়ে কাছের মানুষদের ফোন করে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এখন সন্তান হারানোর প্রতিকারের চাইব কীভাবে? উল্টো পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েই উদ্বিগ্ন।’

এদিকে এ ঘটনায় সাজিনাজ হসপিটালের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় শিশুটির প্রতি গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে জানানো হয়, শিশুটিকে ২৫ মে রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে সাজিনাজ হাসতালের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। শিশুটি ৩৬ প্লাস সপ্তাহের লেট পি-টাম নবজাতক, যার জন্মের পর থেকেই শ্বাসকষ্ট ছিল এবং কনজিনেন্টাল নিউমোনিয়া কিংবা নিউনেটাল রেসপিরেটরি ইনফেকশন সন্দেহে এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। ভর্তির সময় শিশুটি এনসিপিএপি রেসপিরেটরি সাপোর্টে ছিল। পরবর্তীতে অক্সিজেন সাপোর্টেরও প্রয়োজন হয়।

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ভর্তির সময়ই ইরাজের ডান পায়ের তালুতে কাটা দাগ ও বাম হাতের ওপরের অঙ্গে উল্লেখযোগ্য ফোলা বিদ্যমান ছিল, যা পূর্ববর্তী হাসপাতাল থেকে স্থানান্তরের সময় থেকেই ছিল। ফোলাটি কাঁধ থেকে হাত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ভর্তির সময় উপস্থিত পিতাকে এই ফোলার বিষয়টি অবহিত করা হয়, দেখানো হয় এবং চিকিৎসা নথিতেও তা লিপিবদ্ধ করা হয়। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে ফোলা ধীরে ধীরে কিছুটা কমলেও হাতের ফোলা উল্লেখযোগ্যভাবে থেকে যায় এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়।

ভর্তির পর হাসপাতালের প্রটোকল অনুযায়ী বাইরের ক্যানুলা (বাম হাতে) অপসারণ করা হয়, আক্রান্ত অঙ্গ উঁচু করে রাখা হয় এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ শুরু হয়। পরে বাম হাতে আর কোনো ক্যানুলা করা হয়নি এবং ডান হাত ও দুই পায়ে ক্যানুলা করে পরবর্তী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়। ভর্তির প্রথম দিন থেকেই বাম হাতের ক্যানুলা ফোলা ও রক্ত সঞ্চালনজনিত জটিলতার সম্ভাবনা বিবেচনায় ফোলা জায়গা গরম রাখার প্রেক্ষিতে কাভার করে রাখা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, রোগীর চিকিৎসার পুরো সময়জুড়ে শিশুর অভিভাবকদের প্রতিদিন রোগীর ক্লিনিক্যাল অবস্থা, অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য আউটকাম সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। সকল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত এবং ঝুঁকি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে কাউন্সেলিং ও ব্রিফিং প্রদান করা হয়। সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরিবারকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত রাখা হয় এবং তাদের সম্মতি ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই চিকিৎসা এগিয়ে নেওয়া হয়।

তারা আরও জানায়, রোগীর অবস্থা বিবেচনায় উন্নততর ব্যবস্থাপনার জন্য রোগীকে ঢাকাভিত্তিক একটি উচ্চতর কেন্দ্রে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত রোগীর পরিবার ও চিকিৎসক দলের সম্মিলিত আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোগীকে রেফার্ড করা হয়, কিন্তু রেফার্ডকৃত হাসপাতালে না গিয়ে অন্য হাসপাতালে গিয়ে মূল্যবান সময় নষ্ট করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসা চলাকালীন অবস্থায় চার দিন পরে শিশুটির মৃত্যু ঘটে। পরবর্তী কেন্দ্রের চিকিৎসাসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল বিবরণ আমাদের প্রতিষ্ঠানের নিকট উপলব্ধ নয়। আমরা গভীরভাবে দুঃখিত যে শিশুটিকে শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।