রাতে ভিজিয়ে রাখা ছোলা সকালে খেলে কী হয়

ছোলা আমাদের পরিচিত ও সহজলভ্য একটি খাবার। ভাজা ছোলা, ছোলার ডাল, চটপটি কিংবা সালাদ, নানা উপায়ে এটি খাওয়া হয়। তবে শুকনা ছোলা রান্নার আগে কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখার অভ্যাসও অনেকের আছে। সাধারণত আগের রাতে ছোলা পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে রান্না করা হয়।
এই সহজ অভ্যাসের পেছনে শুধু রান্না সহজ করার কারণ নেই। ছোলা ভিজিয়ে রাখলে এর গঠন নরম হয়, রান্নার সময় কমে এবং কিছু উপাদান পানিতে বের হয়ে যায়, যা ছোলা হজমে তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক করতে পারে। বিশেষ করে যাদের ছোলা খেলে গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা হয়, তাদের জন্য সঠিকভাবে ভিজিয়ে নেওয়া উপকারী হতে পারে।
ছোলা ভিজিয়ে রাখলে কী পরিবর্তন হয়
শুকনা ছোলা আসলে একটি বীজ। পানিতে ভিজলে এটি ধীরে ধীরে পানি শোষণ করে ফুলে ওঠে এবং শক্ত আবরণ নরম হতে শুরু করে। এতে পরে রান্নার সময় ছোলা দ্রুত সেদ্ধ হয়।
ভিজিয়ে রাখার সময় ছোলার কিছু পানিতে দ্রবণীয় উপাদান পানিতে চলে আসে। এর মধ্যে এমন কিছু জটিল শর্করাও রয়েছে, যেগুলো মানুষের শরীর সহজে হজম করতে পারে না। এগুলো বৃহদান্ত্রে গিয়ে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভাঙার সময় গ্যাস তৈরি করতে পারে। ভিজিয়ে সেই পানি ফেলে দিয়ে নতুন পানিতে রান্না করলে এ ধরনের উপাদানের কিছুটা কমানো সম্ভব।
গ্যাস ও পেট ফাঁপার সমস্যা কিছুটা কমতে পারে
ছোলা খাওয়ার পর অনেকের গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হয়। এর একটি কারণ হলো ছোলায় থাকা র্যাফিনোজ ও স্ট্যাকিওজের মতো অলিগোস্যাকারাইড। মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্রে এগুলো পুরোপুরি ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম থাকে না। ফলে এগুলো বৃহদান্ত্রে পৌঁছে সেখানকার ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ফার্মেন্টেড হয় এবং গ্যাস তৈরি হতে পারে।
ছোলা ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে সেই পানি ফেলে দিলে এই জটিল শর্করার একটি অংশ পানির সঙ্গে বের হয়ে যায়। এরপর ভালোভাবে ধুয়ে নতুন পানিতে রান্না করলে অনেকের ক্ষেত্রে হজমের অস্বস্তি কম হতে পারে।
তবে সবার শরীরের প্রতিক্রিয়া এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে ভিজিয়ে রান্না করলেও ছোলা খেলে গ্যাস হতে পারে।
ফাইটিক অ্যাসিডের পরিমাণ কমতে পারে
ছোলাসহ বিভিন্ন ডাল ও শস্যে ফাইটিক অ্যাসিড থাকে। এটি উদ্ভিদের বীজে স্বাভাবিকভাবেই থাকা একটি যৌগ। ফাইটিক অ্যাসিড শরীরে কিছু খনিজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেগুলোর শোষণ কমাতে পারে।
ভিজিয়ে রাখার ফলে ফাইটিক অ্যাসিডের একটি অংশ কমতে পারে। এতে ছোলায় থাকা আয়রন, জিংক ও ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ শরীরের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হতে পারে। তবে ভিজিয়ে রাখলেই সব ফাইটিক অ্যাসিড চলে যায় না। রান্নার পদ্ধতিও এতে ভূমিকা রাখে।
ছোলা পুষ্টিকর খাবার
ভিজিয়ে রাখার বিষয়টি আলাদা হলেও ছোলা নিজেই পুষ্টিকর একটি খাবার। এক কাপ রান্না করা ছোলায় প্রায় ১৪.৫ গ্রাম প্রোটিন এবং ১২.৫ গ্রাম খাদ্যআঁশ থাকে। এতে ফোলেট, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজও রয়েছে।
ছোলার খাদ্যআঁশ দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে খাবারের মাঝখানে অপ্রয়োজনীয় নাশতা করার প্রবণতা কমাতে এটি সহায়ক হতে পারে। উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস হিসেবেও ছোলা খাদ্যতালিকায় রাখা যায়।
তবে শুধু ছোলা খেলেই সব ধরনের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে না। সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ডাল, শস্য, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাণিজ বা উদ্ভিজ্জ প্রোটিন খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
রান্নার সময়ও কমে
শুকনা ছোলা সরাসরি রান্না করলে নরম হতে অনেক সময় লাগতে পারে। আগে কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখলে ছোলা পানি শোষণ করে নরম হয়ে যায়। ফলে রান্নার সময় কমে আসে এবং তুলনামূলকভাবে সমানভাবে সেদ্ধ হয়।
এটি বিশেষভাবে কাজে লাগে যখন চটপটি, ছোলার তরকারি, সালাদ বা অন্য কোনো রান্নার জন্য আগে থেকেই ছোলা প্রস্তুত করতে হয়।
কতক্ষণ ভিজিয়ে রাখবেন
সাধারণভাবে শুকনা ছোলা ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা যায়। তাই রাতে পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে রান্না করা একটি সুবিধাজনক পদ্ধতি।
তবে আবহাওয়া খুব গরম হলে দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পানিতে ভিজিয়ে রাখা ঠিক নয়। বেশি সময় ভিজিয়ে রাখতে হলে ফ্রিজে রাখা ভালো, যাতে দ্রুত গাঁজন শুরু না হয়।
ভেজানো পানি দিয়ে রান্না করবেন কি
ভিজিয়ে রাখা পানি ফেলে দিয়ে ছোলা পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া ভালো। এরপর নতুন পানি দিয়ে রান্না করা যায়। কারণ ভিজিয়ে রাখার সময় কিছু জটিল শর্করা ও অন্যান্য যৌগ পানিতে চলে আসে। সেই পানি ফেলে দিলে সেগুলোর একটি অংশ খাবার থেকে বাদ যায়।
বিশেষ করে যাঁদের ছোলা খেলে গ্যাস বা পেট ফাঁপার প্রবণতা বেশি, তাঁদের জন্য ভেজানো পানি ফেলে দিয়ে নতুন পানিতে রান্না করা বেশি আরামদায়ক হতে পারে।
ভিজিয়ে রাখলে কি সব পুষ্টি নষ্ট হয়ে যায়
এমন ধারণা ঠিক নয়। ভিজিয়ে রাখার সময় কিছু পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের সামান্য অংশ পানিতে চলে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে ফাইটিক অ্যাসিড ও কিছু গ্যাস তৈরি করা জটিল শর্করার পরিমাণও কমে। তাই ভিজিয়ে রাখা ছোলার ক্ষেত্রে পুষ্টির কিছু অংশ হারানোর পাশাপাশি কিছু পুষ্টি শরীরের জন্য সহজলভ্য হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
তবে ভিজিয়ে রাখাকে কোনো জাদুকরী পদ্ধতি হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। ছোলার মূল পুষ্টিগুণ আসে এর প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, ভিটামিন ও খনিজ থেকে।
কাঁচা ভেজানো ছোলা নাকি রান্না করে
অনেকেই রাতে ছোলা ভিজিয়ে সকালে সরাসরি খেয়ে থাকেন। তবে শুকনা ছোলা শুধু পানিতে ভিজিয়ে নরম হলেই সম্পূর্ণ রান্না হয়ে যায় না। শুকনা ছোলা ভালোভাবে সেদ্ধ করে খাওয়াই নিরাপদ ও সহজপাচ্য পদ্ধতি।
ভিজিয়ে রাখার পর পানি ফেলে ছোলা ধুয়ে নতুন পানিতে ভালোভাবে সিদ্ধ করে নেওয়া যায়। এরপর রান্না, সালাদ বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে।
কারা একটু সতর্ক থাকবেন
ছোলা স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও সবার জন্য একইভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। যাদের ডালজাতীয় খাবার খেলে অতিরিক্ত গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হয়, তারা অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করতে পারেন।
ছোলায় প্রচুর খাদ্যআঁশ থাকায় হঠাৎ বেশি পরিমাণে খেলে পেটের অস্বস্তি হতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় ছোলা নতুন করে যোগ করলে ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো ভালো এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা দরকার।
যাদের কোনো নির্দিষ্ট কিডনি রোগ, খাদ্য অসহিষ্ণুতা বা চিকিৎসকের দেওয়া বিশেষ খাদ্যনির্দেশনা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত বেশি পরিমাণে ছোলা খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সহজ নিয়মে ছোলা ভিজিয়ে রাখুন
ছোলা প্রস্তুত করার সহজ পদ্ধতি হলো প্রথমে শুকনা ছোলা ভালোভাবে বেছে ধুয়ে নেওয়া। এরপর পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানিতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। সকালে সেই পানি ফেলে দিয়ে ছোলা আবার ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এরপর নতুন পানি দিয়ে সম্পূর্ণ নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
এভাবে প্রস্তুত করলে ছোলা নরম হয়, রান্নার সময় কমে এবং গ্যাস তৈরির সঙ্গে যুক্ত কিছু জটিল শর্করা কমানোর সুযোগ থাকে।
সব মিলিয়ে, রাতে ছোলা ভিজিয়ে রাখা একটি সহজ রান্নাঘরের অভ্যাস, যার বাস্তব উপকার রয়েছে। এটি ছোলাকে রান্নার উপযোগী করে তোলে, রান্নার সময় কমায় এবং অনেকের ক্ষেত্রে হজমের অস্বস্তিও কমাতে পারে। তবে ছোলা ভিজিয়ে রাখলেই এটি কোনো বিশেষ ওষুধ বা রোগ প্রতিরোধের উপায় হয়ে যায় না। সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবেই ছোলা খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।
সূত্র: কান্ট্রি লাইফ


