ক্যানসারের যেসব উপসর্গ অবহেলা করা ঠিক নয়

ক্যানসার অনেক সময় শুরুতে খুব সাধারণ কিছু লক্ষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেমন ঘাড়ে ফোলা, ত্বকের এমন ঘা যা দীর্ঘদিনেও সারে না, বা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ব্যথা। অনেকেই এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না। তবে শরীরে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিচে ক্যানসারের কিছু প্রাথমিক লক্ষণ তুলে ধরা হলো।
মুক্তার মতো ছোট ফুসকুড়ি
ত্বকের ক্যানসার বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে প্রধান ধরন হলো স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা, বেসাল সেল কার্সিনোমা এবং মেলানোমা।
বেসাল সেল কার্সিনোমা অনেক সময় মুক্তার মতো স্বচ্ছ বা মোমের মতো দেখতে ফুসকুড়ির মতো হয়। আবার কখনো এটি ঘা, খসখসে দাগ বা সিস্টের মতো গাঁট আকারে দেখা দিতে পারে।
গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি
গলায় যেন কিছু আটকে আছে এমন অনুভূতি হলে তা জিহ্বার গোড়া বা টনসিলের টিউমারের লক্ষণ হতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে এটি হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভি সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ভাইরাস শরীরে বহু বছর নীরব অবস্থায় থাকতে পারে এবং পরে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিনের তীব্র চুলকানি
কিছু ক্যানসারে তীব্র চুলকানি দেখা যায়। বিশেষ করে লিম্ফোমা নামের ক্যানসারে এমনটি হতে পারে।
লিম্ফোমা শরীরের লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমকে আক্রান্ত করে, যা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কানে ব্যথা
মাথা বা গলার স্নায়ুর কারণে অনেক সময় কানে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। একে রেফার্ড ওটালজিয়া বলা হয়।
মুখগহ্বরের ক্যানসার বা গলার কিছু ক্যানসারেও এমন ব্যথা হতে পারে, বিশেষ করে রোগের পরবর্তী পর্যায়ে।
অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত
মেনোপজের পর বা অস্বাভাবিক সময়ে যোনিপথে রক্তপাত জরায়ুর ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
এ ধরনের কোনো রক্তপাত দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি, বিশেষ করে যদি স্থূলতা বা অন্যান্য ঝুঁকির কারণ থাকে।
চোখের পাতা ঝুলে পড়া
উপরের চোখের পাতা হঠাৎ ঝুলে পড়া কখনো কখনো প্যানকোস্ট টিউমারের লক্ষণ হতে পারে। এটি এক ধরনের ফুসফুসের ক্যানসার যা ফুসফুসের ওপরের অংশে শুরু হয়।
এতে তীব্র কাঁধের ব্যথা, চোখের পাতা ঝুলে যাওয়া বা মুখের এক পাশে ঘাম কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
খসখসে দাগ বা আঁচিলের মতো গাঁট
সূর্যের আলো বেশি লাগে এমন জায়গায় লালচে খসখসে দাগ দীর্ঘদিন থাকলে তা স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার লক্ষণ হতে পারে।
এটি সাধারণত মাথা, ঘাড়, হাতের পেছনের অংশ বা পায়ের সামনে দেখা যায়। শুরুতে ধরা পড়লে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি চিকিৎসায় সেরে যায়।
রক্তস্বল্পতা
মলের সঙ্গে অল্প অল্প রক্ত যাওয়ার কারণে অনেক সময় কোলোরেক্টাল ক্যানসার ধীরে ধীরে রক্তস্বল্পতা তৈরি করতে পারে।
এই রক্তপাত অনেক সময় চোখে দেখা যায় না এবং পরীক্ষা ছাড়া বোঝা কঠিন হয়।
গলা ভাঙা বা কর্কশ কণ্ঠ
লারিনজিয়াল ক্যানসার কণ্ঠনালির টিস্যুতে আক্রমণ করে। এতে কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া, গলা ব্যথা, কানে ব্যথা বা ঘাড়ে গাঁট দেখা দিতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে এটি থাইরয়েড, শ্বাসনালি বা খাদ্যনালিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পেট ফাঁপা
কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পেট ফাঁপা বা পেলভিক অঞ্চলে অস্বস্তি ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
যাদের পরিবারে আগে এ ধরনের ক্যানসারের ইতিহাস আছে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
ঘাড়ে গাঁট
ঘাড়ে গাঁট দেখা দিলে তা থাইরয়েডের সমস্যা বা ক্যানসারের কারণে হতে পারে।
যদিও প্রাপ্তবয়স্কদের অনেক গাঁট ক্যানসারজনিত নয়, তবুও চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্তনে ফোলা বা গর্তের মতো দাগ
স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে তা গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। স্তন ক্যানসারের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে—
- স্তনে ব্যথা
- স্তনের আকার বা গঠনে পরিবর্তন
- ত্বকে গর্ত বা ভাঁজ পড়া
- লালচে ভাব বা ফোলা
- স্তন বা বগলে নতুন গাঁট
- নিপল থেকে তরল বের হওয়া
- নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া
হাড়ে ব্যথা
হাড়ের ব্যথা অনেক কারণে হতে পারে। তবে কোনো কারণ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে তা ক্যানসারের লক্ষণও হতে পারে।
বিশেষ করে মেরুদণ্ড, পেলভিস বা পাঁজরে ব্যথা মাল্টিপল মায়েলোমা নামের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
প্রস্রাবের সমস্যা
প্রস্রাবের সমস্যা অনেক সময় মূত্রথলির ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।
প্রস্রাবে রক্ত দেখা গেলে তা মূত্রথলি বা কিডনির ক্যানসারের লক্ষণও হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
শরীরে নতুন কোনো লক্ষণ দেখা দিলেই তা ক্যানসার হবে এমন নয়। তবে শরীরের পরিবর্তনগুলো খেয়াল করা জরুরি।
যদি অস্বাভাবিক ব্যথা, গাঁট, রক্তপাত বা অন্য কোনো নতুন লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করতে পারেন।
ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা এবং দ্রুত শনাক্তকরণ অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে পারে। শরীরে ছোটখাটো পরিবর্তনও কখনও বড় রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে। তাই অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র : হেল্থ