‘দাম কম হওয়ায় মানুষ দলে দলে স্বপ্নে আসতে শুরু করে’

বাংলাদেশের আধুনিক রিটেইল খাতের রূপান্তরের অন্যতম প্রধান কারিগর সাব্বির হাসান নাসির। তার নেতৃত্বে ‘স্বপ্ন’ দেশের সবচেয়ে বড় সুপারমার্কেট চেইনে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি কৃষক, সরবরাহকারী ও ভোক্তাদের মধ্যে একটি সমন্বিত এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় ৯৬৫টিরও বেশি আউটলেটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন সেবা দিচ্ছে লক্ষাধিক গ্রাহককে। বুয়েট, আইবিএ, এমআইটি ও বার্কলেতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জনকারী সাব্বির হাসান নাসির করপোরেট নেতৃত্ব, ব্যবসায়িক রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎমুখী কৌশলগত চিন্তার জন্য সুপরিচিত।
সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের বিশেষ আয়োজন ‘বিয়ন্ড বিজনেস’-এ তিনি কথা বলেছেন তার শৈশব, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, ‘স্বপ্ন’-এর বিকাশ এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রিয়াজুল করিম।
এশিয়া পোস্ট: আপনার শৈশব, বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনা সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল?
সাব্বির হাসান নাসির: আমার জন্ম খুলনায়। আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ‘স্কুল অব মিউজিক’-এ। এরপর আমি খুলনা সেন্ট জোসেফস হাইস্কুল এবং পরবর্তীতে বিএল কলেজে পড়াশোনা করি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। বুয়েটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ সম্পন্ন করি। এরপর এমআইটি স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে পরবর্তীতে ইউসি বার্কলে থেকে ডেটা সায়েন্সে পড়াশোনা করি।
এশিয়া পোস্ট: আপনি মূলত প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনা করেছেন, তবে আপনার আগ্রহের জায়গা তো অন্য কিছু ছিল বলে শুনেছি। এ বিষয়ে একটু বলবেন?
সাব্বির হাসান নাসির: আসলে প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লাম বাবার কারণে। আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার কোনো শখ ছিল না। আমার শখ ছিল তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হওয়ার। কারণ, গণিতের প্রতি আমার অন্যরকম একটা সহজাত ভালোবাসা ও টান ছিল। আমার চাচা গণিতে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ছিলেন এবং সম্প্রতি তিনি ইন্তেকাল করেছেন। গণিতের প্রতি আমার এই টান ওনার কাছ থেকে অথবা আমার দাদার কাছ থেকে আসা, যিনি নিজেও গণিতে অত্যন্ত দক্ষ এবং একজন শিক্ষাবিদ ছিলেন। আমি স্বাভাবিকভাবেই অনেক গাণিতিক মডেল তৈরি করতে পারতাম এবং যে কোনো বিষয়কে দার্শনিক রূপ দিতে পারতাম। কিন্তু আমার বাবা বললেন, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া যাবে না, সেখানে অনেক গন্ডগোল লেগে থাকে। তোমাকে বুয়েটেই ভর্তি হতে হবে।’ বাবার ইচ্ছাতেই বুয়েটে ভর্তি হলাম।
এশিয়া পোস্ট: এটি কত সালের ঘটনা ছিল এবং পড়াশোনা শেষ করতে কেমন সময় লেগেছিল?
সাব্বির হাসান নাসির: আমি বুয়েটে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৮৯ সালে। ওই সময়ে দেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল। যার ফলে আমাদের ভয়াবহ সেশন জটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে বের হওয়ার কথা থাকলেও সেশন জটের কারণে আমি বের হই ১৯৯৬ সালে। তবে এর একটা ইতিবাচক দিকও ছিল। পাস করার পরপরই আমি বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম স্যারের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে এক বছর কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। উনি একজন সহকারী খুঁজছিলেন এবং আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তার সঙ্গে কাজের সুযোগ পাই। এর মাধ্যমে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হিসেবে কাজ করার যে তীব্র মনোবাসনা আমার মনে ছিল, আল্লাহ তা আংশিকভাবে হলেও পূরণ করেছিলেন।
এশিয়া পোস্ট: আপনার কর্মজীবনের সূচনা কীভাবে হলো? বাটা এবং ইউনিলিভারের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সাব্বির হাসান নাসির: কর্মজীবনের শুরুতে আমি ‘বাটা’র একটি গ্লোবাল ট্যালেন্ট রিক্রুটমেন্ট প্রোগ্রামে যোগ দিই। বাটাতে কাজ করার সময় আমি মালয়েশিয়ায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে যুক্ত ছিলাম। এটি ছিল কোম্পানির উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা বৃদ্ধির একটি প্রজেক্ট। বাটার ইতিহাসে প্রথম টাইম-মোশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অনেকগুলো বড় বড় স্তম্ভ আমার হাত ধরে তৈরি হয়েছিল। এরপর আমি ইউনিলিভারের একটি প্রজেক্ট নিয়ে আফ্রিকার দেশ অ্যাঙ্গোলাতে যাই। তখন সেখানে যুদ্ধ মাত্র শেষ হয়েছে, তবে সম্পূর্ণভাবে শান্ত হয়নি। চারদিকে ল্যান্ডমাইন আর অস্ত্রের ছড়াছড়ি ছিল। সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবেশে ইউনিলিভারের প্রজেক্ট ও ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বড় দায়িত্ব ছিল আমার ওপর।
এশিয়া পোস্ট: এরপর তো আপনি দেশের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড ‘অটোবি’-র সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সাব্বির হাসান নাসির: হ্যাঁ, ইউনিলিভারের পর আমি অটোবির প্রথম সিইও হিসেবে যোগ দিই। ওই সময়ে অটোবিতে সিইও পদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অটোবির প্রতিষ্ঠাতা নিতুন কুন্ডু নিজেই সব পরিচালনা করতেন। তিনি যখন ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে টেকওভার করেন, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের কিছু প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এড়াতে আমাকে সিইও পদটি দেওয়া হয়। আমার সময়ে অটোবি শুধু বাংলাদেশেই বড় ব্র্যান্ড হয়নি, বরং আমরা ভারতে স্টোর এবং বিলবোর্ড স্থাপন করি, কলকাতায় কার্যক্রম বিস্তৃত করি, মধ্যপ্রাচ্যে প্রোডাক্ট এক্সপোর্ট শুরু করি এবং হাসপাতালের জন্য বিশেষায়িত ফার্নিচার তৈরি করি। অটোবি যখন আমি ছেড়ে আসি, তখন এর বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা এবং নিট প্রফিট ছিল ৬০ কোটি টাকা। আমাদের সময়ে অটোবির কোনো ব্যাংক ঋণ ছিল না। ব্যাংকাররা লোন দেওয়ার জন্য আমার পেছনে ঘুরতেন, কিন্তু আমি ঋণের ওপর নির্ভর করায় বিশ্বাসী ছিলাম না। আমি ইকুইটি এবং সেলফ-ফান্ডিংয়ে বিশ্বাসী ছিলাম।
এশিয়া পোস্ট: পরবর্তীতে ‘স্বপ্ন’র সঙ্গে যুক্ত হলেন কীভাবে?
সাব্বির হাসান নাসির: অটোবি ছেড়ে দেওয়ার পর আমি ইউকে এবং ইউএসভিত্তিক একটি কনসাল্টিং ফার্মের অংশ হিসেবে কাজ শুরু করি। সেই সময়ে এসিআইয়ের গ্রুপ সিইও ডক্টর আরিফ দৌলা এবং স্বপ্নের তৎকালীন কর্ণধার সৈয়দ আলমগীর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা আমাকে স্বপ্নের রূপান্তরের জন্য কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। আমি শুরুতে মাত্র তিন মাসের জন্য স্বপ্নের কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দিই। মজার বিষয় হলো, অটোবির মতো এত বড় কোম্পানির সাবেক সিইও হওয়া সত্ত্বেও স্বপ্নে কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেওয়ার পর বাথরুমের পাশে আমাকে একটি ছোট্ট ডেস্ক দেওয়া হয়েছিল। আমি সেখানে মন দিয়ে আমার কাজ করে গেছি, যা পরবর্তীতে সিইও হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে আমার জন্য পরিস্থিতি অনেক সহজ করে দিয়েছিল।
এশিয়া পোস্ট: কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সময় স্বপ্নে আপনার মূল ফাইন্ডিংস বা পর্যবেক্ষণগুলো কী ছিল?
সাব্বির হাসান নাসির: সে সময় স্বপ্ন বড় অঙ্কের লোকসান দিচ্ছিল। আমার মূল ফাইন্ডিংস ছিল যে, মূল সমস্যাটা শুধু ব্যবসায়িক নয়, এটি ছিল অর্গানাইজেশনাল কালচার ও স্ট্রাকচারের। খুচরা ব্যবসা বা রিটেইল ইন্ডাস্ট্রির যে মূল দর্শন, তার সঙ্গে স্বপ্নের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক দর্শনের একটি বড় দ্বন্দ্ব ছিল। রিটেইল মূলত আউটলেট-সেন্ট্রিক বা স্টোর-কেন্দ্রিক হতে হয়। কিন্তু স্বপ্নে দেখা গেল, হেড অফিসে বিশাল বড় বড় চেয়ারে বড় বড় নেতারা বসে আছেন যাদের কোনো কন্ট্রিবিউশন বা রিটেল নিয়ে সঠিক ধারণাই নেই, অথচ মাঠপর্যায়ের স্টোরগুলোর কোনো ক্ষমতা বা স্বাধীনতা নেই। দ্বিতীয়ত, এটি কাস্টমার-সেন্ট্রিক বা গ্রাহক-কেন্দ্রিক ছিল না। গ্রাহকের অভিযোগ শোনার বা বোঝার কোনো সংস্কৃতি ছিল না। তাই হেড অফিসের অহেতুক ব্যয়ভার কমানো, স্টোরগুলোকে শক্তিশালী করা, দক্ষ সাপ্লাই চেইন ও প্রকিউরমেন্ট তৈরি করা এবং কাস্টমারের পছন্দ-অপছন্দ ও অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে ব্র্যান্ড পজিশনিং নতুন করে সাজানোই ছিল আমার কনসাল্টিংয়ের মূল ফাইন্ডিংস।
এশিয়া পোস্ট: কিন্তু আপনার তো সুপারমার্কেট বা গ্রসারি রিটেইলে সরাসরি কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এই নতুন চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করলেন?
সাব্বির হাসান নাসির: রিটেল বা খুচরা বিক্রয়ের সাধারণ অভিজ্ঞতা আমার ছিল। কারণ, অটোবিও এক ধরনের রিটেল এবং ম্যানুফ্যাকচারিংভিত্তিক কোম্পানি ছিল। কিন্তু সরাসরি গ্রসারি রিটেইলে আমার পূর্বে কাজ করা হয়নি। এটি সম্পূর্ণ সত্য। তবে আমার বাবা একজন সফল ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা ছিলেন। শৈশব থেকেই আমি ব্যবসাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমি তৃণমূল পর্যায় থেকে গ্রসারি ব্যবসার খুঁটিনাটি শেখার চেষ্টা করলাম। আসলে ব্যবসার মৌলিক বিষয়গুলো সবক্ষেত্রেই একই রকম।
এশিয়া পোস্ট: আপনি স্বপ্নে জয়েন করার পর গ্রস মার্জিন বাড়াতে পেরেছিলেন এবং একই সঙ্গে পরিচালনা ব্যয় কমিয়েছেন, এটি কীভাবে সম্ভব হলো?
সাব্বির হাসান নাসির: আমি যখন স্বপ্নে যোগ দিই, তখন গ্রস মার্জিন ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। যোগদানের এক বছর পর এটি বাড়ে এবং বর্তমানে স্বপ্ন প্রায় ২২ শতাংশ গ্রস মার্জিনে অপারেট করছে। আমি এমআইটির এক প্রফেসরের কাছ থেকে সিস্টেম ডাইনামিক্সের ক্লাসে শেখা একটি বিখ্যাত তত্ত্ব প্রয়োগ করেছিলাম, যাকে বলা হয় ‘প্রোডাক্টিভিটি লুপ’। ওয়ালমার্ট এবং অ্যামাজনও এই সিস্টেম ডাইনামিক্সের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা পরিচালনা করে। প্রোডাক্টিভিটি লুপের মূল কথা হলো একটি ভালো কাজের প্রভাব অন্য একটি বিষয়ের ওপর পড়ে এবং সেটি ঘুরে এসে আবার প্রথম বিষয়টিকে সাহায্য করে। আপনার যদি বড় স্কেল থাকে, তবে আপনার ক্রয়ক্ষমতা বা বার্গেনিং পাওয়ার অনেক বেড়ে যাবে এবং আপনি পাইকারি বা বাল্ক আকারে অনেক কম দামে কিনতে পারবেন। আমরা প্রথমে আমাদের বিক্রয় বা স্কেল বাড়ানো শুরু করলাম। স্কেল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি সোর্স থেকে পণ্য কেনার খরচ কমে এলো এবং মার্জিন বাড়তে থাকল।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশে তো মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ক্রেতাদের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজার ছেড়ে সুপারশপে আসার অভ্যাস ছিল না। এই ক্রেতাদের অভ্যাস পরিবর্তন আপনারা কীভাবে করলেন?
সাব্বির হাসান নাসির: এটি আসলে একটি বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস পরিবর্তন করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। আমরা গবেষণা ও গভীর জরিপ করে গ্রাহকদের তিনটি মূল ভীতি বা পারসেপচুয়াল ব্যারিয়ার চিহ্নিত করলাম: ১. সুপারমার্কেট অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এটি শুধু ধনীদের জায়গা। ২. এখানে ফ্রেশ বা তাজা জিনিস পাওয়া যায় না, ফ্রিজে রাখা বাসি মাছ-মাংস বিক্রি করা হয়। ৩. পাড়ার চেনা দোকানদার যেখানে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেয় বা বাকিতে দেয়, সেখানে কষ্ট করে ট্রলি ঠেলে কেনাকাটা করার কী দরকার? এই জায়গা থেকে মানুষের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করা ছিল ভীষণ কঠিন। আমরা তখন এমন কিছু ক্যাটাগরি বেছে নিলাম যেখানে আমাদের শক্তি সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে গরুর মাংস এবং চাল ছিল অন্যতম। আমরা কোয়ালিটি নিশ্চিত করার পর প্রাইস পারসেপশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি পুরান ঢাকার জরাজীর্ণ ধূসর ভবনগুলোর দেয়ালে টাঙানো ওয়াজ মাহফিলের হলুদ ব্যাকগ্রাউন্ডের কালো হরফে লেখা পোস্টারগুলোর কথা মাথায় রেখে আমাদের ‘ইয়েলো ব্যানার’ বা হলুদ ব্যানার ক্যাম্পেইন শুরু করলাম। গলিতে গলিতে সবুজ ও হলুদ ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লিখে দেওয়া হলো—মিনিকেট চাল ৩০ টাকা অথবা গরুর মাংস ২৩৫ টাকা। বাইরে যেখানে গরুর মাংস ৩০০ টাকা, সেখানে স্বপ্নে ২৩৫ টাকা দেখে ক্রেতাদের মনে এক বিশাল ধাক্কা লাগল। এই প্রাইস পারসেপশন ভাঙার মাধ্যমেই ক্রেতারা কাঁচাবাজার ছেড়ে দলে দলে স্বপ্নে আসতে শুরু করলেন।
এশিয়া পোস্ট: সেই সময়ে বাজারে ‘আগোরা’ বা ‘মিনাবাজার’-এর মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আপনারা কি প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোনো ভালো প্র্যাকটিস অনুসরণ বা কপি করেছিলেন?
সাব্বির হাসান নাসির: আমি কখনোই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিকে কপি করিনি। তবে ওই সময় আমাদের স্ট্র্যাটেজি দেখে আগোরার তৎকালীন ফ্রেঞ্চ সিইও আন্দ্রে আমাদের সেইম প্রাইস ডিসকাউন্ট স্ট্র্যাটেজি কপি করা শুরু করেছিলেন। ফলস্বরূপ, আমাদের কিছু কাস্টমার তাদের দিকে চলে যাচ্ছিল। তখন আমি নতুন কোনো ক্ষেত্র দিয়ে নিজেকে ডিফারেনশিয়েট করার চিন্তা করলাম। সে সময় মাছ বা খাবারে ফরমালিন নিয়ে দেশের মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছিল। আমরা খাদ্য মন্ত্রণালয়, ফুড সেফটি অথরিটি এবং বিসিএসআইআর-এর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তারা আমাদের ফরমালিন টেস্ট করার কিট এবং মিটার দিলেন। আমরা আমাদের স্টোরে সেই কিট ও মিটার রাখলাম এবং ক্রেতাদের ঘোষণা দিলাম—আপনারা আমাদের স্টোর থেকে পণ্য না কিনলেও বাইরের যে কোনো জায়গা থেকে কেনা মাছ বা ফল আমাদের এখানে এনে সম্পূর্ণ ফ্রিতে ফরমালিন পরীক্ষা করে নিতে পারেন। এটি শুধু ফরমালিন পরীক্ষার বিষয় ছিল না, এটি ছিল গ্রাহকদের মনে স্বপ্নের প্রতি একটি গভীর বিশ্বাসের জন্ম দেওয়া।
এশিয়া পোস্ট: কোভিডের সময়ে চালডালের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো দারুণ পারফর্ম করছিল। সেই সময়ে স্বপ্নের অবস্থান কেমন ছিল? আপনারা কি অনলাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছিলেন?
সাব্বির হাসান নাসির: আমরা আসলে প্রতিযোগিতাই করিনি, আমরা কোলাবরেট বা সহযোগিতা করেছি। আমরা বিশ্বাস করি, সংকটের সময়ে প্রতিযোগিতা নয়, বরং কোলাবরেশন জরুরি। সেই সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল শক্তি ছিল টেকনোলজি বা অ্যাপ, কিন্তু তাদের শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন ও ফিজিক্যাল ব্যাকএন্ড ছিল না। অন্যদিকে স্বপ্নের ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন। আমরা তাদের সঙ্গে হাত মেলালাম এবং চমৎকার কোলাবরেশনের মাধ্যমে আমাদেরও গ্রোথ হলো, ওদেরও হলো। এটি ছিল বাংলাদেশের মডার্ন ট্রেড বা আধুনিক রিটেল খাতের অন্যতম বড় টার্নিং পয়েন্ট।
এশিয়া পোস্ট: বর্তমানে বাংলাদেশের বড় বড় অনলাইন গ্রসারি বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো মারাত্মক ব্যবসায়িক স্ট্রাগল বা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আপনার কী মনে হয়, তারা কেন সফল হতে পারছে না?
সাব্বির হাসান নাসির: আমাদের দেশের স্টার্টআপগুলোর প্রধান ভুল হলো—তারা মনে করে ভালো প্রযুক্তি এবং সুন্দর কোডিং করলেই বুঝি একটি সফল ব্যবসা গড়ে ওঠে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস যখন বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স কোম্পানি গড়ে তোলেন, তখন তার প্রথম সিদ্ধান্ত কিন্তু কোডিং করা ছিল না। তিনি বুঝেছিলেন, অনলাইন ব্যবসার মূল প্রাণ হলো এর ‘ফিজিক্যাল ব্যাকএন্ড’ এবং ‘সাপ্লাই চেইন’। ব্যাকএন্ড যদি শক্তিশালী না হয়, তবে শুধু ফ্রন্টএন্ড বা অ্যাপ বানিয়ে আপনি টিকে থাকতে পারবেন না। আমাদের দেশের অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর গ্রস মার্জিন নেগেটিভ। ইনভেস্টরদের টাকা এনে ক্যাশ বার্ন করে নেগেটিভ গ্রস মার্জিনে গ্রাহক আকর্ষণের এই যে মডেল, তা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক এবং অবাস্তব।
এশিয়া পোস্ট: স্বপ্নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কিছু বলুন। কোম্পানিটিকে ঋণমুক্ত করার যে প্রক্রিয়া চলছে, সে বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।
সাব্বির হাসান নাসির: রিটেল বা ফুড রিটেল বিজনেস হলো মূলত ‘হাই ভলিউম, লো মার্জিন’ বা উচ্চ বিক্রয় ও কম মুনাফার ব্যবসা। বৈশ্বিকভাবেই ফুড রিটেলের ইবিট মার্জিন ২ থেকে ৪ শতাংশ এবং নিট প্রফিট ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে থাকে। এই ব্যবসায় ডেট বা লোন নেওয়া এবং হাই লেভারেজ বা ঋণগ্রস্ত থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের ম্যানেজমেন্ট এবং এসিআইয়ের বোর্ড অনেক আগেই একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, স্বপ্নের ব্যালেন্স শিট সংস্কার করতে হবে এবং ঋণ কমাতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যালেন্স শিট ক্লিন করার কারণে এ বছর বা আগামী বছরের মধ্যে স্বপ্ন পিবিটি পজিটিভ হবে এবং পূর্বের সমস্ত লস কাটিয়ে উঠবে। বর্তমানে আমাদের ৪ শতাধিক আউটলেট রয়েছে। এই বিশাল নেটওয়ার্কের লজিস্টিকস, সাপ্লাই চেইন, ওয়্যারহাউজিং এবং টেকনোলজিতে বিপুল পরিমাণ নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমরা জাপানি এবং অন্যান্য বৈদেশিক পার্টনারদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করছি।
এশিয়া পোস্ট: সম্প্রতি বিএসটিআইয়ের করা একটি মামলা নিয়ে নিউজে স্বপ্নের নাম এসেছে। স্বপ্নের মতো এত বড় এবং দায়িত্বশীল একটি চেইনে কীভাবে এই ধরনের ঘটনা ঘটে?
সাব্বির হাসান নাসির: এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন। প্রথমত, স্বপ্নে যে পণ্যগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো দেশের সব প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ও ইম্পোর্টারদের কাছ থেকে সরাসরি আসে। সাপ্লাইয়ার বা ইম্পোর্টাররা আমাদের কাছে তাদের বিএসটিআই লাইসেন্স এবং ইম্পোর্ট সার্টিফিকেটের সমস্ত লিগ্যাল ডকুমেন্টস জমা দেন। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আমাদের মাসিক টার্নওভার প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। প্রতিদিন ৪২ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রোডাক্ট আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার এবং স্টোরগুলোতে ঢুকছে এবং বের হচ্ছে। প্রতিটি প্রোডাক্টের গায়ে বিএসটিআইয়ের সিল বা লাইসেন্স ঠিকমতো প্রিন্ট করা আছে কি না, তা ম্যানুয়ালি চেক করা কোনো মানুষের পক্ষে শারীরিকভাবে অসম্ভব। এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো সরকারি পর্যায়ে কিউআর কোড (QR Code) বাধ্যতামূলক করা। বিএসটিআই যদি প্রতিটি অনুমোদিত প্রোডাক্টের জন্য কিউআর কোড সিস্টেম চালু করে দেয়, তবে আমরা স্ক্যান করার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারব পণ্যটি অনুমোদিত কি না।
এশিয়া পোস্ট: আপনারা যে ফ্র্যাঞ্চাইজ মডেলটি চালু করেছেন, বাংলাদেশে ব্যবসার নৈতিকতার যে ঘাটতি রয়েছে, সেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজিরা স্বপ্নের বাইরে থেকে নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করবে না তার নিশ্চয়তা কী?
সাব্বির হাসান নাসির: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই আমি এই বিশেষ মডেলটি ডিজাইন করেছি, যা অত্যন্ত ইউনিক। একে আমরা বলি ‘সুডো-ইকুইটি ড্রিভেন মডেল’। এই মডেলে ফ্র্যাঞ্চাইজি বা আউটলেটের মালিক মূলত স্থান, এসি, পিওএস মেশিন এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু পণ্যের প্রকিউরমেন্ট, সাপ্লাই এবং আউটলেটের স্টাফিং বা কর্মী পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে স্বপ্নের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কর্মী থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্য আমরা নিজে কিনে দিই এবং পুরো অপারেশন আমরা নিয়ন্ত্রণ করি। তাই ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক চাইলেও স্বপ্নের স্টোরে বাইরের কোনো পণ্য বা নিম্নমানের জিনিস বিক্রি করতে পারবেন না।
এশিয়া পোস্ট: দেশের ২ হাজারেরও বেশি কৃষকের সঙ্গে স্বপ্নের সরাসরি পার্টনারশিপ রয়েছে। কিন্তু গ্রামীণ ইকোনমিতে যে সনাতন দাদন বা মহাজনি প্রথা রয়েছে, তা এড়িয়ে আপনারা কীভাবে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছেন?
সাব্বির হাসান নাসির: বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি অত্যন্ত অগোছালো এবং খণ্ডিত। এই ফুড ভ্যালু চেইনকে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও সমতাভিত্তিক একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই স্বপ্নের মূল লক্ষ্য। যে কোনো গল্পেই আমাদের এই কৃষি বিপ্লবের গল্পেও নায়ক এবং খলনায়ক রয়েছে। এখানে আমাদের প্রান্তিক কৃষকেরা হলেন নায়ক, আর মধ্যস্বত্বভোগী ও মহাজনেরা হলেন খলনায়ক যারা দাদন বা ঋণের ফাঁদে ফেলে কৃষকদের দাস বানিয়ে রাখে। এই অদৃশ্য দাসত্ব থেকে কৃষকদের মুক্ত করতে আমাদের প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে। আমি সমাজতন্ত্রী নই, আমি একজন হিউম্যান ক্যাপিটালিস্ট বা সচেতন পুঁজিপতি। আমরা সেই ফড়িয়া বা দালালদের বাদ দিয়ে সরাসরি দাদনমুক্ত প্রান্তিক কৃষকদের চিহ্নিত করি এবং তাদের সঙ্গে ন্যায্যমূল্যে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ করি। এতে কৃষকেরা তাদের ফসলের সঠিক দাম পান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণ থেকে রক্ষা পান।
এশিয়া পোস্ট: দীর্ঘ এক দশকে আপনার নেতৃত্বে স্বপ্নের প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর সত্যিই বিস্ময়কর। যারা করপোরেট জগতে নতুন এবং ভবিষ্যতে আপনার মতো একজন লিডার হতে চান, তাদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
সাব্বির হাসান নাসির: আমি যখন স্বপ্নের দায়িত্ব নিই, তখন এর বার্ষিক টার্নওভার ছিল ১০০ কোটি টাকার নিচে। আজ তা ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। যারা ভবিষ্যতে করপোরেট লিডার হতে চান, তাদের জন্য আমার কয়েকটি পরামর্শ থাকবে: ১. বিনয়ী বা হাম্বল হওয়া: জীবনে বিনয় বা হিউমিলিটি সবচেয়ে বড় গুণ। ২. প্রতিকূলতা ও সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতা: আপনি যখন বড় কোনো রূপান্তর বা কাজ করতে যাবেন, আপনার প্রচুর শত্রু তৈরি হবে। নিজেকে প্রতিনিয়ত অপমানিত ও ভুলবোঝার মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন। ৩. মানুষের সঙ্গে স্পিরিট বা আত্মিক সংযোগ স্থাপন করা: মানুষের মনকে বুঝতে হবে এবং মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে ডেটা বা তথ্যের সঠিক মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। ৪. নিজেকে প্রতিনিয়ত লার্নিং বা শেখার প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা। ৫. টিমমেটদের সবসময় অনুপ্রাণিত করা এবং নিজের কাজের মধ্যে প্রাণ ও স্পিরিট বজায় রাখা।
এশিয়া পোস্ট: এবার একটু দেশের সার্বিক অর্থনীতি প্রসঙ্গে আসি। বর্তমানে গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ সংকট, যানজট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট কমে যাওয়াসহ ব্যবসায়ীরা নানাবিধ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
সাব্বির হাসান নাসির: আমার কাছে মনে হয়, এই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের জন্য শুধু বর্তমান সরকারকে দায়ী করা যৌক্তিক হবে না। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ট্রাজেক্টরি বা গতিপথটি বেশ গভীর। একসময় আমরা দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েছি, যা আমাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো মূলত কোভিড-১৯ এবং পরবর্তীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এনার্জির দাম হুহু করে বেড়ে গেল, যা আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিল। ঠিক ওই সময়ে আমাদের যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল, তা দিয়ে আমরা উচ্চ ব্যয়ের নানাবিধ মেগা ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরিতে মনোযোগ দিলাম। সেই মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হয়ে গেল। তবে মূল সমস্যা হলো—এই মেগা অবকাঠামোগুলো থেকে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার যে রিটার্ন আসার কথা ছিল, তা আসেনি। ভুল খাতে বা অনুৎপাদনশীল খাতে বিশাল বড় বড় বিনিয়োগ দেশের জন্য ক্ষতিকর।
এশিয়া পোস্ট: তাহলে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
সাব্বির হাসান নাসির: প্রথমত, আমাদের এই বিশাল যুবশক্তিকে সঠিক ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। আমরা শুধু অদক্ষ শ্রমিক না পাঠিয়ে উন্নত নার্স, রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার বা রিটেল ম্যানেজার ট্রেইন করে বিদেশে পাঠাতে পারি। দ্বিতীয়ত, আমাদের ভিয়েতনাম মডেল অনুসরণ করা উচিত। ভিয়েতনাম শুধু কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছে। বাংলাদেশও এগ্রিকালচারাল প্রসেসিং বা কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে জোর দিতে পারে। আমাদের দেশে পোস্ট-হারভেস্ট লস বা ফসল কাটার পর নষ্ট হওয়ার হার প্রায় ৩০ শতাংশ। আমরা কোল্ড স্টোরেজে শুধু আলু আর পেঁয়াজ না রেখে আম, লিচুর মতো ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাত করে এক্সপোর্টের মাধ্যমে ভিয়েতনামের মতো বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারি। তৃতীয়ত, আমাদের পরিবেশ দূষণ না করে ভারত ও চীনের মতো বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অ্যাসেম্বলিং বা সংযোজন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতকে সংস্কার করতে হবে। উচ্চ সুদের হার দিয়ে নতুন শিল্পায়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের উচিত হবে একটি প্র্যাকটিক্যাল ক্রেডিট রেটিং সিস্টেম তৈরি করা। খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে সচল করা উচিত।
.png)






