‘পাগল আর শিশু ছাড়া এই দেশে কোনো নিরপেক্ষ লোক নেই’

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
‘পাগল আর শিশু ছাড়া এই দেশে কোনো নিরপেক্ষ লোক নেই’
ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

নওগাঁ-৩ আসনের (বদলগাছী ও মহাদেবপুর) সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল। জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এশিয়া পোস্টের নিয়মিত আয়োজন আলাপনে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি কথা বলেছেন তৃণমূল রাজনীতির গতি-প্রকৃতি থেকে শুরু করে সমসাময়িক জাতীয় নানা ইস্যুতেও। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

Advertisement

এশিয়া পোস্ট: ৫ আগস্টের আগের ও পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন আপনি সংসদ সদস্য। এই সময়টা কেমন উপভোগ করছেন?

ফজলে হুদা বাবুল: সংসদ সদস্য হওয়া অবশ্যই একটি সম্মানের বিষয়। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এখানে কিছুটা দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি হয়। সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা, কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে আমাদের সরাসরি জনগণের কাছে যেতে হয়। নির্বাচনের আগে আমরা ইশতেহারে যেসব অঙ্গীকার করেছি, সেগুলো যত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারব, ততই আমরা স্বস্তিতে থাকব। আইন প্রণেতার ভূমিকা আর জনগণের তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণের মধ্যে সমন্বয় করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হলেও আমি বিশ্বাস করি আমরা তা সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে পারব।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতিতে আপনার শুরুর গল্প জানতে চাই।

ফজলে হুদা বাবুল: সত্যি বলতে, রাজনীতিতে আসার কোনো পূর্বপরিকল্পনা আমার ছিল না। তবে ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কাজ করার একটা প্রবল ইচ্ছা ছিল। মা যখন কোনো ভিক্ষুককে এক কৌটা চাল দিতে বলতেন, আমি হয়তো মাকে না জানিয়ে দুই-তিন কৌটা দিয়ে দিতাম। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পর সেই পুরো টাকা আমি গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারকে দিয়ে দিয়েছিলাম। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন বিতর্ক ও বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলাম। নিজের টিউশনির টাকা দিয়ে গ্রামের দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি দিতাম। বিষয়টি নিয়ে বর্তমান চ্যানেল আইয়ের আনন্দ আলো পত্রিকার সম্পাদক রেজানুর রহমান ভাই তখন ইত্তেফাকের ‘তরুণ কণ্ঠ’ ও ‘করর্চা’ পাতায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন করেছিলেন যে, একজন ছাত্র টিউশনি করে সেই টাকা দিয়ে গ্রামের ছাত্রদের সাহায্য করছে। সেটি দেখে আমি আরও অনুপ্রাণিত হই। এমনকি লন্ডন থেকে এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট জনাব আব্দুল মহি সাহেব সেই প্রতিবেদন পড়ে আমাকে ৫০০ টাকার একটি ফান্ড পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের দিকে আমি যখন এলাকায় একটি স্কুলে কম্পিউটার দিতে যাই, তখন এলাকার মানুষ ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান এবং বিএনপির সিনিয়র নেতারা আমাকে রাজনীতিতে আসার আহ্বান জানান। মূলত সেই সামাজিক কাজের প্রেক্ষাপট থেকেই এলাকার মানুষের অনুরোধে আমার সরাসরি রাজনীতিতে আসা। যদিও ছাত্রজীবনে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসিমউদ্দিন হলের ছাত্রদল এবং জাসাসের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলাম।

এশিয়া পোস্ট: রাজনীতিতে পরিবারের সমর্থন কেমন পেয়েছেন?

ফজলে হুদা বাবুল: পরিবারের একদমই সমর্থন ছিল না। আমি ক্লাসের ফার্স্ট বয় ছিলাম বলে শিক্ষকরা চাইতেন আমি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হই। মা-বাবার ইচ্ছা ছিল আমি ম্যাজিস্ট্রেট বা বিসিএস ক্যাডার হই। কিন্তু আমার চিন্তাভাবনা সবসময়ই কিছুটা ভিন্ন ছিল। আমি এসএসসিতে মানবিকে থাকলেও ইন্টারমিডিয়েটে কমার্স নিয়েছি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিং বিভাগে পড়াশোনা করেছি। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়াও ছিল আমার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। একবার বিসিএস প্রিলিমিনারি ও রিটেনে টিকলেও ভাইভা দিতে যাইনি। কারণ, আমি প্রাইভেট সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিলাম। এতে করে আমি সৎভাবে অর্থ উপার্জন করে মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের হয়ে আপনার প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ফজলে হুদা বাবুল: আমার বাড়ি উত্তরাঞ্চলে হওয়ায় ঢাকায় আমাদের কোনো সিনিয়র ভাই ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতে আমাদের এলাকার কেউ আমাকে হলে তুলতে পারেনি, তাই আমি একটি মসজিদে থাকতাম। তখন আমি খুব পরহেজগার ছিলাম এবং ফজর নামাজে আজান দিতাম। অনেকে আমাকে অন্য কোনো ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের কর্মীও ভাবত। পরে আমাদের হলের ছাত্রদলের সভাপতি নুরুল হক জিতু ভাই আমাকে তার রুমে থাকার সুযোগ দেন। এক দিন হলের মিছিলের কথা শুনে আমি নিজেই তাকে বললাম যে আমিও যাব। কারণ, আমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তান আমলের সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। তার কাছ থেকে শহীদ জিয়ার অনেক গল্প শুনে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। সেই মিছিলে আমি যখন প্রথম স্লোগান দিলাম, আমার শুদ্ধ উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গির কারণে তা সবার নজর কেড়েছিল। সেদিন প্রথম মনে হয়েছিল যে আমি সক্রিয় রাজনীতির অংশ হয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনার ছাত্ররাজনীতির সময়কার পরিবেশ আর বর্তমানের মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য দেখেন?

ফজলে হুদা বাবুল: আমাদের সময়ে হলে একই সঙ্গে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন এমনকি শিবিরেরও সক্রিয় নেতৃত্ব ছিল। তখন আমাদের মধ্যে আদর্শিক লড়াই ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতা হতো, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্প্রীতি ছিল প্রবল। আমরা মধুতে একসঙ্গে বসে চা খেতাম। এমনকি আমার রুমমেট শাহনিয়া চৌধুরী অপু শিবিরের সভাপতি হলেও আমাদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু গত ১৫-১৭ বছরে সেই পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয়করণ হয়েছে। ডেমোক্রেসি মানে হলো আপনি আমার সঙ্গে একমত না হলেও আপনার মতপ্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া। কিন্তু বর্তমানে সর্বত্র অঙ্গসংগঠন ও পেশাজীবী সংগঠনের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, এমনকি ঈদগাহ কমিটির ক্ষেত্রেও কোয়ালিটি বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পায়। আমরা যদি অন্তত আট-দশটা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে পারি, তবে হয়তো ১৯৯০ পরবর্তী সেই সুস্থ ধারার রাজনীতিতে ফিরে যেতে পারব।

এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিকভাবে গত ১৭ বছর আপনাদের ব্যাপক চাপের মুখে থাকতে হয়েছে। আপনি ব্যক্তিগতভাবে সেই সময়টা কীভাবে সামলেছেন?

ফজলে হুদা বাবুল: আমি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চ বেতনে চাকরি করতাম। কিন্তু রাজনীতির জন্য আমার উপার্জনের প্রায় সব টাকা যাতায়াত ও নেতাকর্মীদের পেছনে খরচ হয়েছে। আমি কোনো সঞ্চয় করতে পারিনি। ২০১৪ সালে আমার উপজেলায় ৭৩ জন নেতাকর্মী দ্রুত বিচার আইনে আড়াই মাস জেল খেটেছেন। হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাদের জামিনের সব খরচ আমি নিজের কর পরিশোধিত টাকা থেকে দিয়েছি। মামলার কারণে রাতে নিজের বাসায় থাকতে পারতাম না, বিভিন্ন হোটেলে থাকতে হতো। গ্রামে গেলে মায়ের সঙ্গে দেখা করা কঠিন ছিল। এমনকি নিজের ময়লা কাপড় ধোয়ার জন্য কর্মীদের সাহায্য নিতে হতো। গত ৫ বছর তো চাকরি ছেড়ে দিয়ে শতভাগ রাজনীতিতে সময় দিয়েছি। এই সময়ে আমার জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলতে হয়েছে। নেতাকর্মীরা আমার ওপর আস্থা রেখেছে বলেই আমি আজ এই অবস্থানে আসতে পেরেছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনি নওগাঁ-৩ আসনে প্রায় ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এই জয়কে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ফজলে হুদা বাবুল: এটি মূলত দলীয় প্রতীক ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার একটি সংমিশ্রণ। ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে মানুষের ব্যাপক সমর্থন আমি পেয়েছি। ম্যাডাম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের চেয়ে আমি বেশি জনপ্রিয় হতে পারি না। তবে অনেক ভোটার যারা অন্য দল করেন, তারাও আমাকে বলেছিলেন যে নমিনেশন নিয়ে আসলে ভোট আমাকেই দেবেন। জাতীয় নির্বাচন মূলত প্রতীকেরই লড়াই হয়, তবে ব্যক্তি হিসেবে মানুষের সঙ্গে আমার যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, তার ফলে হয়তো কিছু বাড়তি ভোট পেয়েছি।

এশিয়া পোস্ট: জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান এত কম থাকার কারণ কী এবং ভবিষ্যতে এটি আপনাদের জন্য কোনো চ্যালেঞ্জ কি না?

ফজলে হুদা বাবুল: জামায়াত প্রায় এক বছর ধরে এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছে, অন্যদিকে বিএনপি প্রচারণার জন্য সময় পেয়েছে মাত্র ২০ দিন। এ ছাড়া আমাদের দলের কিছু বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল, যা ভোটের ব্যবধানে প্রভাব ফেলেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ইসলামের বিভিন্ন ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ভোটারদের ডাইভার্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আমি প্রতিটি ইউনিয়নে প্রথম হয়েছি। আগামীতে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন হলে আমাদের জয় আরও সহজ হবে এবং চ্যালেঞ্জ কমে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

এশিয়া পোস্ট: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের মধ্যে আপনি কোনো পরিবর্তন দেখছেন?

ফজলে হুদা বাবুল: আমি বিএনপি করি, তাই জামায়াতের পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য করা আমার কাজ নয়। তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে বলতে পারি, আগের তুলনায় এখনকার জামায়াতের সেই আদর্শিক ভিত্তি বা স্টাইল অফ ওয়ার্কে পার্থক্য আছে। আমার উপজেলায় জামায়াতের একজন নেতা একটি কলেজ থেকে ৩০ লাখ টাকা চুরির দায়ে অভিযুক্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মানুষ যখন এসব দেখে, তখন তাদের প্রতি আস্থা কমে যায়। জামায়াতের উচিত তাদের পুরোনো সেই নৈতিক ভিত্তি ধরে রাখা।

এশিয়া পোস্ট: এনসিপি বর্তমানে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে এবং বিএনপির সমালোচনা করছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ফজলে হুদা বাবুল: এনসিপি কী চায় সে সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা নেই। জুলাই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারা যদি উপদেষ্টামণ্ডলীতে না গিয়ে স্বাধীনভাবে নির্বাচন করতেন, তবে হয়তো নতুন কিছু করতে পারতেন। কিন্তু এখন তারা ক্ষমতার অংশ হয়ে সেই পুরোনো ধারার রাজনীতিতেই জড়িয়ে পড়েছেন। চ্যালেঞ্জ সবাই দিতে পারে, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সমালোচনা অর্থহীন।

এশিয়া পোস্ট: হাসনাত আব্দুল্লাহ দুর্নীতি নিয়ে একটি চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। আপনি কীভাবে দেখছেন বিষয়টা?

ফজলে হুদা বাবুল: এ ধরনের চ্যালেঞ্জ সারা দিনই দেওয়া যায়। আমি স্পষ্ট করে বলছি, আমার এলাকায় গত ১৭ বছরে আমি যদি পাঁচ পয়সার দুর্নীতি করে থাকি, তবে আমি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করব এবং আর কোনোদিন রাজনীতি করব না। একজন রাজনীতিবিদের জন্য সততা হওয়া উচিত ন্যূনতম যোগ্যতা, এটি প্রচার করার বিষয় নয়। যেমন—মুসলমান হিসেবে নামাজ পড়া ফরজ, এটি বলে বেড়ানোর কিছু নেই।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগ তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা প্রচার করে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এই উন্নয়ন কি ভিন্নভাবে হতো?

ফজলে হুদা বাবুল: উন্নয়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকলে যে কোনো দলই উন্নয়ন করবে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো উন্নয়নের নামে মেগা দুর্নীতি নিয়ে। প্রতিটি প্রজেক্টে অন্য দেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কয়লা ও পাথর পর্যন্ত চুরি হয়েছে। এই টাকাগুলো সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা। বিএনপি থাকলে হয়তো মেগা দুর্নীতির বদলে জনবান্ধব কাজ হতো, আমরা হয়তো আরও আগেই বুলেট ট্রেন পেতাম। বর্তমানের এই উন্নয়ন কেবল শহরকেন্দ্রিক, গ্রামীণ অবকাঠামোর প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি। গ্রাম পর্যায়ে এখনও রাস্তা খারাপ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বাকি।

এশিয়া পোস্ট: রাষ্ট্রযন্ত্রের দলীয়করণের বিরুদ্ধে আপনারা সরব ছিলেন, কিন্তু এখন বিএনপির বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?

ফজলে হুদা বাবুল: ম্যাডাম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। ক্ষমতার ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে গেলে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আস্থাশীল মানুষ প্রয়োজন হয়। যেমন—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে বিএনপিপন্থি কাউকে দেওয়া মানেই অন্যায় দলীয়করণ নয়। তবে আওয়ামী লীগ আমলের মতো পুলিশ নিয়োগ বা সিভিল প্রশাসনে যে নগ্ন দলীয়করণ ছিল, বিএনপি তা করছে না। আমার জেলায় শত শত নিয়োগ হয়েছে, আমরা কোনো তদবির করিনি। প্রশাসনকে আমরা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা করছি।

এশিয়া পোস্ট: আপনার নির্বাচনি এলাকাকে মাদকমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?

ফজলে হুদা বাবুল: আমি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সফল হয়েছি বলে দাবি করতে পারি। গত তিন মাসে দুই উপজেলায় প্রায় ৮৬টি মাদক মামলা হয়েছে এবং ১২৬ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে। জাতীয় সংসদে আজই এই আইনটি উপস্থাপিত হয়েছে। আশা করছি আইন সংস্কার হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।

এশিয়া পোস্ট: কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও কর্মসংস্থান নিয়ে আপনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো চ্যালেঞ্জ দেখেন কি না?

ফজলে হুদা বাবুল: কৃষকদের জন্য আমি ইতিমধ্যে একটি কাজ বাস্তবায়ন করেছি। নওগাঁসহ আশপাশের কৃষকরা এখন ৪০ কেজিতেই মণ বিক্রি করতে পারছেন, কোনো বাড়তি দিতে হচ্ছে না। এ ছাড়া আমার একটি ব্যক্তিগত অঙ্গীকার আছে—যাদের জমি বা চাকরি নেই, সেই দরিদ্র পরিবারগুলোকে দুইটা লাইট ও একটা ফ্যানের বিদ্যুৎ বিল আমি নিজের তহবিল থেকে ফ্রিতে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। আমি ব্যক্তিগতভাবে জমি লিজ নিয়ে সেখানে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা করছি, যাতে দরিদ্র মানুষের কল্যাণে তা কাজে লাগানো যায়।

এশিয়া পোস্ট: রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অনেক জায়গায় প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি দেখা যায়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন কি সম্ভব?

ফজলে হুদা বাবুল: আমার এলাকায় কোনো দখলদারত্ব বা আধিপত্যবাদের স্থান নেই। আমি স্পষ্ট করে দিয়েছি যে বিএনপি কোনো ‘খাই-দাই’ পার্টি নয়। ইতোমধ্যে আমাদের দলের কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করেছি এবং ৪২ জনকে নোটিশ দিয়েছি। আধিপত্য বিস্তার করতে চাইলে আমি নিজ দলের নেতার বিরুদ্ধেও মামলা দিতে বলেছি। আমার জীবনের লক্ষ্য কেবল ক্ষমতার চর্চা নয়, বরং এলাকায় ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠা করা।

এশিয়া পোস্ট: তরুণ প্রজন্মের যারা রাজনীতিতে আসতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ফজলে হুদা বাবুল: আমি তরুণদের বলি, আগে নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলো, নিজের পায়ের নিচে মাটি শক্ত করো, তারপর রাজনীতিতে আসো। রাজনীতি মানে টাকা উপার্জনের জায়গা নয়। আপনার যদি উপার্জনের ব্যবস্থা না থাকে, তবে আপনি জনগণের সেবা করতে পারবেন না। ছাত্রদের রাজনীতি করা উচিত, কিন্তু পড়াশোনা বাদ দিয়ে নয়।

এশিয়া পোস্ট: নিজ এলাকার জনগণের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?

ফজলে হুদা বাবুল: বদলগাছী ও মহাদেবপুরবাসী বর্তমানে বিদ্যুৎবিভ্রাটসহ কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা মাত্র চার মাস হয়েছে দায়িত্ব নিয়েছি। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, সরকারের বরাদ্দকৃত প্রতিটি টাকা আমি শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে আপনাদের কাছে পৌঁছে দেব। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমি সুস্থ থেকে আপনাদের দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারি।

এশিয়া পোস্ট: ধন্যবাদ।