Advertisement

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাসিনা অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে: মাসুদ কামাল

এশিয়া পোস্ট সাক্ষাৎকার
বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাসিনা অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে: মাসুদ কামাল
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিক্স

প্রায় চার দশক ধরে দেশের সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত আছেন মাসুদ কামাল। বিভিন্ন টেলিভিশন টক শোতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নিয়মিত কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজস্ব একটি প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছেন।

Advertisement

সম্প্রতি এশিয়া পোস্টের আলাপন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন মাসুদ কামাল। কথা বলেছেন গণমাধ্যম, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতি নিয়ে। সঞ্চালনা করেছেন রাহাত রূপান্তর

এশিয়া পোস্ট: আপনি ১৯৮৮ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে সাংবাদিকতা করছেন। আপনার শুরুর সময়ের সাংবাদিকতা আর আজকের বর্তমান সাংবাদিকতার মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য দেখছেন?

মাসুদ কামাল: দেখুন, পার্থক্য আসলে সময়ের কারণেই হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, আমরা প্রতিদিন আগের দিনের তুলনায় একটু একটু করে খারাপের দিকে যাচ্ছি। কেবল একটি জায়গায় আমরা ভালো করেছি, সেটি হলো প্রযুক্তি। প্রযুক্তির দিক দিয়ে আমরা প্রতিদিন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হচ্ছি। কিন্তু আমাদের রাজনীতি, সামাজিক চিন্তা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের উত্থান-পতন, পেশাদারত্ব এবং সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতা, সবকিছুই দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। আমলাতন্ত্র, শিক্ষকতা কিংবা সাংবাদিকতা, সব ক্ষেত্রে পেশাদারত্ব আগের চেয়ে প্রতিদিন একটু করে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৮৮ সাল থেকে যদি হিসাব করি, তবে সেখানে ১২ বছর আর এদিকে ২৬ বছর মিলিয়ে মোট ৩৮ বছর হয়ে গেল। এই দীর্ঘ ৩৮ বছরে যদি প্রতিদিন একটু একটু করে অবনতি হতে থাকে, তাহলে আমরা এখন কতটা খারাপ পর্যায়ে আছি, তা সহজেই অনুমেয়। আমি এটি নিয়ে অত্যন্ত হতাশ যে, আমরা এত খারাপ পরিস্থিতি কীভাবে সহ্য করছি এবং ধারণ করছি।

এশিয়া পোস্ট: ১৯৮৮ সালে যখন আপনি সাংবাদিকতায় পা রাখেন, তখনকার তরুণ মাসুদ কামাল আর আজকের ২০২৬ সালের অভিজ্ঞ মাসুদ কামালের মধ্যে কী তফাত লক্ষ্য করেন?

মাসুদ কামাল: তখন আমি তরুণ ছিলাম, জুনিয়র ছিলাম। সবকিছু ইতিবাচকভাবে দেখতাম, আশাবাদী ছিলাম যে এক দিন অনেক বড় কিছু হবে। আমি কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করলেও পাস করার পরদিনই এ পেশায় আসিনি। প্রথম দিকে সাংবাদিকতা পেশায় আসার তেমন কোনো ইচ্ছেও আমার ছিল না। কারণ, তখন এ পেশায় বেতন খুবই কম ছিল। এর মধ্যেই আমি বিয়ে করি এবং স্বাভাবিকভাবেই আমার সংসারের একটি আর্থিক চাহিদা ছিল। আমি তখন টিউশন করতাম এবং সেখান থেকে বেশ ভালো আয় হতো। এক পর্যায়ে আমার মনে হতো, সাংবাদিকতা করার চেয়ে টিউশন করা অনেক ভালো। যখন প্রথম চাকরি শুরু করি, তখন বেতন এতটাই কম ছিল যে আমাকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, প্রথম চার মাস কোনো বেতন চাওয়া যাবে না। পঞ্চম মাসে গিয়ে প্রথম মাসের বেতন পাব, এই ছিল শর্ত।

এশিয়া পোস্ট: শুরুতে সাংবাদিকতায় আপনার কাজের ধরন কেমন ছিল? তখন কীভাবে চাকরি ও সংসারের বাস্তবতার সঙ্গে এই পেশায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন?

মাসুদ কামাল: হ্যাঁ, তখন আমাকে বাধ্য হয়েই টিউশন করতে হতো। তা না হলে তো আমি সংসার চালাতে পারতাম না। এই চাকরি ও টিউশনের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য আমি শুরুতে রিপোর্টিংয়ে যোগ দিইনি। আমি প্রথমে যোগ দিয়েছিলাম সাব-এডিটর হিসেবে। আমার শর্তই ছিল, আমাকে যেন ডেস্কে এমন একটি সময়ে ডিউটি দেওয়া হয় যাতে আমি বাকি সময়টায় টিউশন করতে পারি। তখনও আমার সংসার চলত মূলত টিউশনের টাকায়। প্রথম প্রতিষ্ঠানে চার মাস বেতন না পেয়ে পঞ্চম মাসে আমি সেটি পরিবর্তন করে অন্য জায়গায় চলে যাই। অর্থাৎ, আমার সাংবাদিকতার প্রথম চার মাস ছিল সম্পূর্ণ বেতনহীন। অন্যান্য পেশার তুলনায় সাংবাদিকতায় বেতন কাঠামো এখনও অনেক কম। তা সত্ত্বেও আমি এ পেশায় কাজ করতে গিয়ে এক ধরনের রোমাঞ্চ ও ভালোলাগা খুঁজে পেয়েছি। প্রতিদিন নতুন নতুন সংবাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, বিশেষ করে প্রথম দিকে ডেস্কে থাকার সময় টেলিভিশনে বিদেশি সংবাদ দেখার মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা ও আনন্দ অনুভব করতাম।

তৎকালীন সময়ে সাংবাদিকদের একটিমাত্র ইউনিয়ন ছিল। এখন যেমন দুটি ইউনিয়ন দেখা যায়, তখন তেমন ছিল না। একটি মাত্র ইউনিয়নের ভেতরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজন থাকত। তারা পরস্পরের কঠোর সমালোচনা করত, কিন্তু একসঙ্গে বসত, একসঙ্গে নির্বাচন করত। ১৯৯০ সালের পরে এসে সেটি ভেঙে গেল। এটি আমাদের পেশার জন্য এক বিশাল বিভেদ সৃষ্টি করেছে। আপনি যদি অন্যান্য পেশার দিকে তাকান, যেমন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে ডাক্তারদের ড্যাব কিংবা স্বাচিপের মতো ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দল আছে, কিন্তু তাদের মূল সংগঠন বিএমএ একটাই। সুপ্রিম কোর্ট বারে বিভিন্ন গ্রুপ আছে, কিন্তু বার অ্যাসোসিয়েশন একটাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিতে নীল দল, সাদা দল বা কালো দল আছে, কিন্তু শিক্ষক সমিতি একটাই। কেবল আমরা সাংবাদিকরাই ব্যতিক্রম, যারা নিজেদের স্বার্থে বিএফইউজে বা ডিইউজে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেছি। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন বললে এখন মানুষ বোঝে না কোনটির কথা বলা হচ্ছে। কতিপয় সুবিধাবাদী নেতার কারণে এটি হয়েছে। আমাদের শ্রদ্ধেয় রিয়াজউদ্দিন চৌধুরী কিংবা গাজী ভাইয়ের মতো ভালো মানুষরা, যারা আজ বেঁচে নেই, তারাও একসময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য এই বিভক্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

এশিয়া পোস্ট: আপনার এই ৩৮ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে নিশ্চয়ই অসংখ্য প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। এর মধ্যে আপনার করা সেরা বা সবচেয়ে বিশেষ কোনো রিপোর্টের কথা বলবেন কি, যা এখনও আপনার মনে দাগ কেটে আছে?

মাসুদ কামাল: আমার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায়। দৈনিক জনকণ্ঠ প্রকাশের আগে থেকেই আমি সেখানে যুক্ত ছিলাম। মূলত এই পত্রিকাটির গড়ে ওঠা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। প্রথম দিকে আমি সেখানে হেলথ বিট বা স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করতাম। সেখানে অনেক আলোচিত রিপোর্ট ছিল। তবে মানুষের জন্য করা বিশেষ কিছু রিপোর্টের কথা যদি বলতে হয়, তবে ফেনীর তৎকালীন গডফাদার জয়নাল হাজারীকে নিয়ে করা রিপোর্টের কথা বলতে হবে। সে সময় ফেনীতে জয়নাল হাজারীর চরম দাপট ছিল, তিনি সেখানে একটি স্বাধীন রাজ্য কায়েম করেছিলেন। তার রাজত্বের স্বরূপ দেখার জন্য আমি নিজে সশরীরে ফেনীতে গিয়ে কয়েক দিন বিভিন্ন কৌশলে অবস্থান করি। ফিরে এসে আমি ‘সন্ত্রাসী জনপদ’ নামে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন করেছিলাম। সেটি অত্যন্ত আলোচিত হয়েছিল। কারণ, জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে যে রিপোর্ট করা সম্ভব, এটিই মানুষ তখন কল্পনা করতে পারত না। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল এবং শেখ হাসিনা নিজে বলতেন যে তার আরও কয়েকজন জয়নাল হাজারী দরকার। এতটা প্রশ্রয় তাকে দেওয়া হতো। সেই হাজারীর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার পর আমাকে মামলা-মোকদ্দমাসহ অনেক ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এ ছাড়া খুলনায় যখন আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির তীব্র দাপট এবং খুনখারাবি চলছিল, তখন সেখানে গিয়েও আমি আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স নিয়ে একটি সরেজমিন সিরিজ রিপোর্ট করেছিলাম। এগুলো আমার জীবনের অন্যতম ভালো কাজ ছিল।

এশিয়া পোস্ট: এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা রিপোর্ট কি আছে, যা আপনি তৈরি করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কারণে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি?

মাসুদ কামাল: না, এমন কোনো ঘটনা আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি। আমি যা লিখেছি, আমার অফিস তা ছেপেছে। হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশ হতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে, কিন্তু ছাপা হয়েছে। জনকণ্ঠে আমার রিপোর্টিং ক্যারিয়ারের প্রায় ১২ বছর কেটেছে। এরপর আমি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় চলে যাই। সেখানে রিপোর্টিংয়ের চেয়ে রিপোর্ট এডিটিংয়ের কাজই বেশি করতে হতো। পাশাপাশি বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিতাম। এরপর দৈনিক যায়যায়দিনে আমি চিফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিই। চিফ রিপোর্টার থাকার কারণে স্বভাবতই মাঠে গিয়ে রিপোর্ট করার সুযোগ কমে আসে। এরপর যখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় অর্থাৎ বাংলাভিশনে যোগ দিই, তখন সিনিয়র নিউজ এডিটর বা হেড অব নিউজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় মাঠপর্যায়ে রিপোর্টিংয়ের সুযোগ আর ছিল না।

এশিয়া পোস্ট: সাংবাদিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি তো সবসময়ই আলোচনায় থাকে। একজন সাংবাদিক কি আসলেই নিরপেক্ষ হতে পারেন, নাকি তাকে কোনো না কোনো পক্ষ নিতেই হয়?

মাসুদ কামাল: নিরপেক্ষ থাকা অবশ্যই সম্ভব, পক্ষ নিতে কেউ বাধ্য করে না। সাংবাদিকরা স্বেচ্ছায় পক্ষ নেন। আমি বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বলি। আমাদের এখানে বিভিন্ন সাংবাদিক বিভিন্ন বিট কভার করেন। কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ বিএনপি, আবার কেউ সচিবালয়। সেখানে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দল কিন্তু এসে তাদের রিকোয়েস্ট করে না যে আপনি আমাদের পক্ষ নিন। সাংবাদিকরা নিজেরাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায় তাদের খুশি করার চেষ্টা করেন। তারা গিয়ে বলেন, ‘আপনার এই কাজটা আমি করে দিচ্ছি।’ বিনিময়ে তারা ছোটখাটো কিছু সুবিধা পান এবং তাতেই খুশি থাকেন। এভাবে চলতে চলতে এক সময় তাদের প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

সাংবাদিকতায় সোর্সের সঙ্গে সম্পর্কের একটি চমৎকার নিয়ম আছে। সোর্স হলো শীতকালের আগুনের মতো। গ্রামীণ এলাকায় মানুষ যেভাবে বড় আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে শীত দূর করে, সম্পর্কটা ঠিক সে রকম। আপনি যদি আগুনের খুব বেশি কাছে যান, তবে আপনি পুড়ে যাবেন। আবার খুব বেশি দূরে থাকলে তাপ পাবেন না। সোর্সের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টিও ঠিক এমন। আপনি যদি সোর্স থেকে একদম দূরে চলে যান, তবে কোনো নিউজ পাবেন না। আবার খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলে সোর্সের সঙ্গে একাকার হয়ে যাবেন এবং তখন আপনার আর পেশাদার নিরপেক্ষতা থাকবে না।

আমাদের দেশের পলিটিক্যাল বিটের সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এটি খুব বেশি ঘটে। গত ১৭ বছর যারা বিএনপি বিট করেছেন, তারা দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করেছেন। দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এই দীর্ঘ সময়ে নেতারা তাদের প্লট, টাকা বা অন্য কোনো সুবিধা দিতে পারেননি। ফলে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন পদ পাওয়ার জন্য সাংবাদিকদের মধ্যে একধরনের ইঁদুর-দৌড় ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেউ ডিপিএস, কেউ পিএস, আবার কেউ বিদেশে প্রেস মিনিস্টারের চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছেন। তাদের ভাবখানা এমন যে এই দীর্ঘ ১৫ বছর কি তারা দলের জন্য খাটেননি? অথচ এই ১৫ বছর তাদের বেতন দিয়েছে নিজ নিজ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান। মির্জা ফখরুল বা মির্জা আব্বাসের দালালি করার জন্য অফিস তাদের বেতন দেয়নি। অফিস বেতন দিয়েছিল পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে বিএনপির সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য। অথচ তারা নিজেরা দলদাস হওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন এবং এখন তা প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে আমাদের গণমাধ্যমের চরিত্র ও ভূমিকা কেমন ছিল? জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মাসুদ কামাল: আমাদের গণমাধ্যমগুলো আসলে সম্পূর্ণভাবে মালিকদের ইচ্ছায় পরিচালিত হয়। মালিক যেভাবে চান, গণমাধ্যম সেভাবেই চলে। তথাকথিত স্বাধীন গণমাধ্যমকর্মী বা বড় সাংবাদিকরা দিনশেষে মালিকের কাছ থেকে বেতন নেওয়া কর্মচারী মাত্র। মালিকের পছন্দের বাইরে গিয়ে কথা বললে চাকরি থাকবে না। আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমের মালিকই কোনো না কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারের সঙ্গে শত্রুতা করে কোনো ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়। তাই মালিকদের দুটি সত্তা থাকে। একদিকে তিনি মিডিয়া মালিক, অন্যদিকে তিনি শিল্পপতি। নিজের মূল ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে তাদের সরকারের সঙ্গে আপস করতেই হয়।

এর ফলে আওয়ামী আমলের গণমাধ্যমগুলোর আচরণ কেমন ছিল, তা আমরা সবাই দেখেছি। এখন যেমন সব গণমাধ্যম বর্তমান সরকারকে তোষণ করছে, আওয়ামী লীগের সময়েও তারা সরকারকে তোষণ করত। এখানে দল কোনো বিষয় নয়, তোষণ করাই তাদের মূল চরিত্র। তারা এমন কিছু করত না যাতে সরকার অসন্তুষ্ট হয়। কেউ একটু বেশি তোষণ করত, কেউ হয়তো সামান্য কম। মাঝে মাঝে তোষণের এই প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করত। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে কে কত বেশি তেল দিতে পারে, তা প্রমাণ করতে মিডিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিদের সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এর সুফল কিন্তু দিনশেষে মালিকরাই ভোগ করত।

আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যেমন মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ বা শ্যামল দত্ত, তাদের কথা ধরুন। প্রথম তিনজনই একাত্তর টিভির সাংবাদিক ছিলেন। একাত্তর টিভি যদি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে না থাকত, তবে তারা সরকারের দালালি করে সুবিধা নিতে পারতেন না। তারা তিনজনে মিলে দালালি করে যত টাকা উপার্জন করেছেন, তার চেয়ে একশো গুণ বেশি সুবিধা নিয়েছে একাত্তর টিভির মালিকপক্ষ তথা মেঘনা গ্রুপ। আজ এই তিন সাংবাদিক জেলে আছেন, কিন্তু মেঘনা গ্রুপের মালিকের কিছুই হয়নি। তার একাত্তর টিভি এখনও চলছে এবং বর্তমান সরকারের তোষণ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি তিনি একটি নতুন বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করেছেন এবং ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’ কিনে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, চাটুকারিতার খেসারত দিয়ে লাঠিয়ালরা জেলে গেল, কিন্তু মালিকরা বহাল তবিয়তে রয়ে গেলেন।

এশিয়া পোস্ট: এটি কি ব্যক্তির নিজস্ব দোষ, নাকি কাঠামোগত পদের দোষ? আগের সমালোচিত ব্যক্তিদের জায়গায় কি এখন নতুন কেউ আসছেন না?

মাসুদ কামাল: নতুনরা অবশ্যই আসছেন, তবে তারা তো মাত্র ছয় মাস হলো এসেছেন। ফারজানা রূপা বা মোজাম্মেল বাবুরা তো এক দিনে তৈরি হননি, তাদের তৈরি হতে ১৫ বছর সময় লেগেছে। এখন যারা নতুন সরকারের মন্ত্রীদের কাছে গিয়ে বলেন, ‘আমরা ১৫ বছর আপনাদের সার্ভিস দিয়েছি’, এই কথাটি বলাই তো সবচেয়ে বড় অপরাধ। আপনি যদি পেশাদার সাংবাদিক হন, তবে কাউকে ‘সার্ভিস’ দেওয়ার কথা বলেন কীভাবে?

কিছুদিন আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন, তারা কোনো দলদাস সাংবাদিক চান না, স্বাধীন সাংবাদিক চান। ওনারা মুখে এটি বললেও বাস্তবে কিন্তু যারা তাদের দলের জন্য দালালি করেছেন, তাদেরই পুরস্কৃত করছেন। মুখে এক কথা বলা আর কাজে অন্যটি করা স্পষ্ট ভণ্ডামি।

এখন যারা পদ পাচ্ছেন, তাদের বিষয়ে বিএনপির ভেতরের অনুসারী সাংবাদিকরাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন যে বঞ্চিত হয়েও তারা পদ পেলেন না, অথচ অন্যজন পেয়ে গেলেন। সুতরাং চাটুকারিতার এই প্রতিযোগিতা এখনও বিদ্যমান। যখন আমরা নিজেরা বিপদে পড়ি, তখন বলি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। আর যখন সুবিধাজনক অবস্থানে থাকি, তখন বড় বড় কথা বলি।

এশিয়া পোস্ট: সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের ওপর আসলে কী ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়?

মাসুদ কামাল: সরকার প্রধানত দুইভাবে চাপ দেয়, প্রত্যক্ষ চাপ ও পরোক্ষ চাপ। পরোক্ষ চাপের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। কয়েক দিন আগে ডাক্তার জাহিদুর রহমান একটি টেলিভিশন টকে বললেন যে, ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনা যে অনলাইন বা অডিও বক্তব্য দিয়েছেন, তা দেশের কোনো গণমাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করা যাবে না। মজার ব্যাপার হলো, পরের দিন আমি দেশের কোনো পত্রিকায় সেই খবরের ন্যূনতম উল্লেখও দেখতে পাইনি।

অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বা আদালতের নির্দেশনা ছিল শেখ হাসিনার ‘বিদ্বেষমূলক’ বক্তব্য প্রচার না করার জন্য। কিন্তু শেখ হাসিনার ওই অডিও কনফারেন্সটি তো ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা বা ইভেন্ট। সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে সেটি সংবাদ হওয়ার যোগ্য ছিল। তিনি সেখানে কী বলেছেন, তা শুনলে তবেই তো বোঝা যাবে, তা বিদ্বেষমূলক নাকি অন্য কিছু। কিন্তু এক উপদেষ্টার সামান্য ধমকেই দেশের সব গণমাধ্যম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সেই সংবাদটি চেপে গেল। কারণ, তারা ভয় পাচ্ছিল যে এই সংবাদ প্রকাশ করলে সরকার তাদের সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেবে।

সরকারি বিজ্ঞাপন প্রতিটি পত্রিকার জন্য অত্যন্ত লোভনীয় একটি বিষয়। কলাম ইঞ্চি প্রতি ৯০০ টাকা দরের এই বিজ্ঞাপনের বিপুল অর্থ কোনো প্রকাশনা হারাতে চায় না। এই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার আসলে জনগণের টাকা অপচয় করে পত্রিকাগুলোকে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রাখে। অথচ বর্তমান অনলাইনের যুগে এই সরকারি বিজ্ঞাপনের কোনো যৌক্তিক প্রয়োজনই নেই।

‘দৈনিক মানচিত্র’ বা ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ নামের এমন অনেক পত্রিকা আছে, যা বাজারে কোনো দিন চোখেই পড়ে না, কিন্তু তারা প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়ে যাচ্ছে। এটি জনগণের টাকার চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

এশিয়া পোস্ট: আপনারা যারা দীর্ঘ সময় ধরে এই ক্ষেত্রে কাজ করছেন, তারা কি এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারতেন না?

মাসুদ কামাল: আমি এই যে কথাগুলো প্রকাশ্যে বলছি, এটিই আমার প্রতিবাদের মাধ্যম। আমাকে যদি বলা হয় মাঠে নেমে আন্দোলন করতে বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএসের মতো নেতৃত্ব দিতে, সেটি তো আমার কাজ নয়। আমি পলিসি মেকিং বা নীতিনির্ধারণের কী বুঝি? আমার সেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই।

আমি কেবল একটি কাজই ভালো পারি, সেটি হলো পেশাদার সাংবাদিকতা। এ দেশের আর কোনো প্রথম সারির বা পদধারী সাংবাদিক চাকরি বাঁচানোর তাগিদে এই সত্যগুলো এভাবে বলতে পারবেন না। আমার হারানোর কোনো ভয় নেই। কারণ, আমার কোনো পদের লোভ নেই। আমি সরকারের কোনো পদ পেতে চাই না, তাই আমার কাউকে তোষামোদি করার প্রয়োজন পড়ে না।

এশিয়া পোস্ট: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার পরিচালিত আপনার ‘কথা’ প্ল্যাটফর্মটি এখন বেশ আলোচিত। এটি শুরু করার পেছনে কী চিন্তা কাজ করেছিল?

মাসুদ কামাল: আমি সর্বশেষ ‘বাংলা ট্রিবিউন’ অনলাইন পোর্টালে হেড অব নিউজ হিসেবে কর্মরত ছিলাম। এর মালিক ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ ও কাজী আনিস আহমেদের পরিবার। সেখানে কাজ করার সময় আমি বিভিন্ন টেলিভিশনে টক শোতে গিয়ে সরকারের ভুলভ্রান্তি নিয়ে কথা বলতাম। মালিকরা অত্যন্ত সজ্জন ও ভদ্র হওয়া সত্ত্বেও পত্রিকার সম্পাদকের মাধ্যমে আমাকে নরম সুরে কথা বলার অনুরোধ জানাতেন। তারা বলতেন, যেহেতু তাদের পরিবারের সদস্য এমপি, তাই সরকারের নানা মহলের চাপ তাদের সহ্য করতে হয়।

এ ছাড়া আমাকে লিখিতভাবে একটি তালিকা দেওয়া হয়েছিল যে তথ্য মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় কিংবা ওষুধ খাত নিয়ে কোনো সমালোচনামূলক প্রতিবেদন করা যাবে না। কারণ, সেসব খাতের বড় বড় ব্যবসায়ী ও মন্ত্রীদের সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল। একজন হেড অব নিউজের কাজ যেখানে ছিল সংবাদ প্রকাশ করা, সেখানে আমার কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রিপোর্ট আটকানো। এই অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গণমাধ্যমেরই একই দশা। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মতো করে সত্য কথা বলার জন্যই আমি ‘কথা’ প্ল্যাটফর্মটি শুরু করি।

এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এত বড় একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে, এটি কি আপনি আগে কখনও ভেবেছিলেন?

মাসুদ কামাল: এত বড় একটি অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সম্ভব হবে, তা আমি ভাবিনি। তবে এমন একটি পরিবর্তন হওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল এবং এটি হওয়াতে আমি খুশি হয়েছিলাম, যদিও পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমি কিছুটা হতাশ। ১ আগস্ট যখন তড়িঘড়ি করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হলো, তখনই আমার মনে হয়েছিল যে এই সরকার আর টিকবে না। কারণ, এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও হঠকারী সিদ্ধান্ত। জামায়াতকে যদি নিষিদ্ধ করতেই হতো, তবে আওয়ামী লীগ তা অনেক আগেই করতে পারত। তারা জামায়াতকে সম্পূর্ণ ধ্বংস না করে ‘মরার মতো’ বাঁচিয়ে রেখেছিল, যাতে নির্বাচনের সময় জামায়াত কার্ড খেলে সুবিধা নেওয়া যায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যখন তারা এই তাসটি ব্যবহার করল, তখন বোঝা গেল সরকারের হাতে আর কোনো রাজনৈতিক কার্ড অবশিষ্ট নেই। তারা চরম এলোমেলো হয়ে শেষ অস্ত্রটি প্রয়োগ করেছিল। ওই আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াত কৌশলী ভূমিকা নিয়েছিল। তারা সামনে থেকে নেতৃত্ব না দিয়ে আন্দোলনকারীদের নৈতিক সমর্থন ও সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছিল।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের পতনের পেছনে আসলে কোন ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল?

মাসুদ কামাল: আওয়ামী লীগের প্রথম ভুল ছিল ছাত্রদের আন্দোলনকে শুরুতে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা। তারা এটিকে অন্যান্য সাধারণ আন্দোলনের মতো ভেবেছিল এবং মনে করেছিল যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি থিতিয়ে যাবে। কিন্তু আমি জুলাইয়ের ১০ তারিখের দিকেই আমার ভিডিওতে বলেছিলাম যে সরকার একটি ঐতিহাসিক ভুল করছে। কারণ, এ দেশের সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ছিল, যা কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম না থাকায় এত দিন সংগঠিত হতে পারেনি। সাধারণ মানুষ ট্যাগিংয়ের ভয়ে বা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে রাস্তায় নামেনি। কিন্তু ছাত্রদের এই আন্দোলন সাধারণ মানুষের সেই ক্ষোভ প্রকাশের এক অভূতপূর্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়।

যখন আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন সেখানে আন্তর্জাতিক পরাশক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য বিদেশি শক্তি জড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনে বিপুল অর্থের জোগান এসেছিল। উত্তরার একটি সাক্ষাৎকারে এক ব্যক্তি স্বীকার করেছেন যে সেখানে তার নিজেরই পাঁচ কোটি টাকার বিনিয়োগ ছিল। আন্দোলনকারীদের প্রতিদিনের অবস্থান, খাবার-দাবারের জোগান আকাশ থেকে পড়েনি, এর পেছনে নিশ্চিতভাবে বিদেশি শক্তির হাত ছিল। তবে দেশের সাধারণ মানুষ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ না হতো, তবে কোনো বিদেশি টাকাই এই আন্দোলন সফল করতে পারত না।

এশিয়া পোস্ট: আন্দোলনকারীদের পক্ষে আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সঠিক বা সাহসী সিদ্ধান্ত কোনটি ছিল?

মাসুদ কামাল: শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছেড়ে রাজপথে টিকে থাকাটাই ছিল সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত। ৩ আগস্ট যখন ছয়জন সমন্বয়ককে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে আন্দোলন প্রত্যাহারের মুচলেকা দেওয়া হলো, তখন কিন্তু সাধারণ আন্দোলনকারীরা সেই সমঝোতা মেনে নেয়নি। প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনের আসল হিরো ছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা (যেমন: ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি)। ডিবির চাপের মুখে সমন্বয়করা এক প্রকার আত্মসমর্পণ করলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়েননি। কিন্তু আন্দোলনের সফলতার পর সেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও এই আন্দোলনে শহীদ হননি, অথচ সব কৃতিত্ব ও সরকারের বড় বড় পদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদাররাই পেয়ে গেল। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

এশিয়া পোস্ট: আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সবচেয়ে বড় দুটি নীতিগত ভুল কী ছিল?

মাসুদ কামাল: প্রথম ভুল ছিল দেশের গণতান্ত্রিক ভোটিং সিস্টেমটাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে তারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছিল। দ্বিতীয় ভুল ছিল দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীকে অনৈতিক সুবিধা ও সুযোগ দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলা হয়েছিল। যেমন, ডেপুটি সেক্রেটারি এবং তার ওপরের কর্মকর্তাদের ৩০ লাখ টাকা বিনা সুদে গাড়ি কেনার লোন দেওয়া এবং সেই গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া ছিল মূলত এক ধরনের রাষ্ট্রীয় ঘুষ। এই আমলাতান্ত্রিক সুবিধা বন্ধ করার জন্য জুলাই মাসে একটি সরকারি আদেশ দেওয়া হলেও মাত্র ১০ দিনের মাথায় আমলাদের চাপে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। তারা আমলা ও পুলিশকে মাথায় তুলেছিল এই ভাবনায় যে, এরা তাদের আজীবন ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে। তারা জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদদের চেয়ে আমলাদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। করোনার সময়েও ত্রাণ কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আমলাদের, যা এ দেশের মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের চরম অপমান করার শামিল ছিল।

এশিয়া পোস্ট: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

মাসুদ কামাল: ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর এ দেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থকও খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে, দলটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি হয়তো একটি ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু ড. ইউনূস অত্যন্ত হতাশাজনকভাবে দেশটাকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে শুরুতেই বিভক্ত করে ফেলেছেন। তিনি ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া, লুটতরাজ ও ঢালাও মামলা দেওয়া বন্ধ করতে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেননি। তিনি দেশকে আমেরিকার কাছে এক প্রকার দাসত্ব চুক্তিতে আবদ্ধ করেছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে দেশ পরিচালনার বিষয়ে তার নির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা বা পরিকল্পনা নেই।

ড. ইউনূস এমন কিছু প্রবীণ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক তরুণদের নিয়ে ক্যাবিনেট গঠন করেছিলেন, যাদের রাষ্ট্রীয় শাসন পরিচালনায় কোনো দক্ষতাই ছিল না। আলী ইমামের মতো প্রবীণ ব্যক্তি, যিনি অনেক কিছু মনেই রাখতে পারেন না, কিংবা আদিলুর রহমান শুভ্র ও রিজওয়ানা হাসানের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের তিনি ক্যাবিনেটে বসিয়েছেন। এ ছাড়া জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের নামে সরকারি অর্থের যে বিপুল অপচয় ও নিম্নমানের কমার্শিয়াল ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই কাজের প্রধান কারিগর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আসলে একজন চোর। ড. ইউনূস সংস্কারের নামে কেবল সময় অপচয় করেছেন, যা দিন শেষে দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।

এশিয়া পোস্ট: সংখ্যালঘু বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার রক্ষায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভূমিকা কেমন ছিল?

মাসুদ কামাল: আমাদের দেশে একটি সাধারণ ধারণা আছে যে সংখ্যালঘুরা সবসময় আওয়ামী লীগঘেঁষা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যত নির্যাতন হয়েছে, তার ৯০ শতাংশ ঘটিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দুদের জমি অর্ধেক দামে বা নামমাত্র মূল্যে যারা কিনে নিয়েছে, তাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তা সত্ত্বেও তারা নিরুপায় হয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দিত। কারণ, তারা যদি বিএনপিকে ভোটও দিত, বিএনপির স্থানীয় নেতারা তা বিশ্বাস করত না। এবার সংখ্যালঘুরা শতভাগ বিএনপিকে ভোট দেওয়া সত্ত্বেও গত ছয় মাসে বিএনপি তাদের আস্থা অর্জনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। হিন্দুদের দেবোত্তর সম্পত্তি বেদখল হয়ে যাওয়া রোধে কোনো আইন বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টো চিন্ময় প্রভুর মতো একজন ধর্মীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করে সরকার বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এশিয়া পোস্ট: অনেকে অভিযোগ করছেন যে আপনি আগে আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচনা করলেও এখন তাদের পক্ষে নরম সুরে কথা বলছেন বা তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন। এই সমালোচনার জবাবে কী বলবেন?

মাসুদ কামাল: যারা এই অভিযোগ করছেন, তারা আসলে আমার যৌক্তিক ও তথ্যভিত্তিক কথার কোনো জবাব দিতে না পেরে আমাকে ‘ট্যাগিং’ করার সহজ পথ বেছে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ আমলে এ দেশের প্রায় সাড়ে নয় কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল বা ভোট দিত। আমি সবসময় বলি, শেখ হাসিনাসহ যে এক লাখ নেতাকর্মী সরাসরি অপরাধ, দুর্নীতি বা গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আপনি তাদের কঠোর বিচার করুন। কিন্তু কোটি কোটি সাধারণ আওয়ামী লীগ সমর্থককে তো আপনি দেশ থেকে বিতাড়িত করতে বা তাদের স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার হরণ করতে পারেন না। আমি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবার রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে কথা বলি। আমি কোনো রাজনৈতিক দল, এমনকি হিযবুত তাহরীরের মতো দল নিষিদ্ধ করারও পক্ষে নই, যদি না তারা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানে। দল নিষিদ্ধ করার বা জনগণের ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার ড. ইউনূসকে কেউ দেয়নি, এটি সম্পূর্ণভাবে জনগণের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। শেখ হাসিনাও মনে করেছিলেন, তিনি জনগণকে ছাড়াই চিরকাল দেশ চালাবেন, কিন্তু ৫ আগস্ট তিনি তার জবাব পেয়ে গেছেন।

এশিয়া পোস্ট: দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় সমাধান এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মাসুদ কামাল: আমাদের দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘জি হুজুর’ বা চাটুকারিতার সংস্কৃতি। অন্ধভাবে নেতার পেছনে জিন্দাবাদ দেওয়া বন্ধ না করলে এ দেশের কোনো কল্যাণ হবে না। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধ্যায় চিরতরে সমাপ্ত হয়েছে বলেই আমি মনে করি। তার পরিবারের বা সন্তানের এমন কোনো রাজনৈতিক ক্যারিশমা নেই, যা দিয়ে তারা আবার দলটির হাল ধরবেন। এই মুহূর্তে নেতৃত্বের জায়গায় বিএনপিতে তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীতে শফিকুর রহমান অত্যন্ত ক্যারিশমেটিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বর্তমান সরকারের বড় পরীক্ষা হবে তারা কীভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করে এবং দেশের মানুষকে একটি সুষ্ঠু ভোটাধিকার উপহার দেয়।

এশিয়া পোস্ট: নতুন প্রজন্মের তরুণ সাংবাদিকরা যারা এখন কাজ করছেন, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ বা মূল্যায়ন কী?

মাসুদ কামাল: বর্তমান প্রজন্মের তরুণ সাংবাদিকরা অত্যন্ত মেধাবী, প্রযুক্তিবান্ধব এবং দ্রুত যে কোনো নতুন বিষয়কে গ্রহণ করতে পারে। তবে তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তারা খুব দ্রুত ‘স্টার’ বা তারকা হতে চায়। রাতারাতি তারকা হওয়ার বা শর্টকাটে সফল হওয়ার কোনো পথ নেই। আমার পরামর্শ থাকবে, তারা যেন তাড়াহুড়ো না করে ধৈর্য ধরে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ শেখে। এবং দিন শেষে ঘুমাতে যাওয়ার আগে যেন অন্তত একবার নিজেকে প্রশ্ন করে, আজ সারাদিনে একজন মানুষ হিসেবে এবং একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি যা করেছি, তা কি সমাজ ও দেশের জন্য যৌক্তিক ও সঠিক ছিল? এই আত্মানুসন্ধানই আমাদের একটি সুন্দর সমাজ উপহার দিতে পারে।

এশিয়া পোস্ট: আপনাকে ধন্যবাদ।

মাসুদ কামাল: আপনাকেও ধন্যবাদ।