অন্যের নিউজ বা লেখা কপি করা কি জায়েজ

অনেকেই আছেন, অন্যের নিউজ বা লেখা কপি (অনুলিপি বা নকল) করে তথ্যসূত্র উল্লেখ করা ছাড়াই নিজের নামে চালিয়ে দেন বা নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেন। সম্প্রতি অনেকের মধ্যে অন্যের নিউজ বা লেখা কপির প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে কিছু কিছু অনলাইন সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব খবর, প্রতিবেদন ও বিশেষ স্টোরি অনেকেই কপি করে নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করছেন। এ ক্ষেত্রে যে সাইট থেকে নিউজ নেওয়া হচ্ছে, ওই সাইটের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে না। দেওয়া হচ্ছে না তথ্যসূত্র বা লেখকের নাম। কেউ কেউ নিজের লেখা বই, অনুবাদগ্রন্থ ও নিউজ অন্যরা হুবহু নকল করে প্রচার করেছে বলে অভিযোগও করেছেন। প্রশ্ন হলো, তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে অন্যের নিউজ বা লেখা কপি করা জায়েজ কি না?
অনুমতি বা তথ্যসূত্র উল্লেখ করা ছাড়া একজন লেখকের লেখা বা কোনো ওয়েবসাইটের নিউজ হুবহু কপি করে নিজের নামে বা অন্য ওয়েবাসাইটে প্রকাশ করা ইসলামে গুরুতর অপরাধ। লেখক বা ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকলে কপি করে প্রকাশ করা যাবে। তবে লেখক বা ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কপি করার অনুমতি না থাকলে কপি করা জায়েজ নেই। কপি করতে হলে লেখক বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে মূল লেখায় কমবেশি না করে তথ্যসূত্র উল্লেখ করে দেওয়া আবশ্যক।
যারা বই বা ওয়েবসাইটের নির্দেশিকায় লেখা বা নিউজ কপির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার শর্ত জুড়ে দেন, তাদের লেখা বা নিউজ কপি করা নাজায়েজ।
তথ্যসূত্র ছাড়া লেখা বা নিউজ কপি করা আমানতের খেয়ানত। অন্যের প্রাপ্য ক্রেডিট নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া চুরিও। হাদিস বিশারদ এবং আলেমদের কাছে এটি অত্যন্ত দোষনীয়। অন্যের বক্তব্য নকলের ক্ষেত্রে তার সূত্র লেখা দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব।
ইসলাম বিশেষজ্ঞরা বলেন, জ্ঞানের আমানত হচ্ছে, যার কথা বা লেখা উদ্ধৃতি দেওয়া হচ্ছে, তার সূত্র বর্ণনা করে সেটি উল্লেখ করা। লেখকের নাম বা তথ্যসূত্র ছাড়া অন্যের লেখা নিজের নামে বা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা নাজায়েজ। তথ্যসূত্র দিয়ে অন্যের লেখা বা নিউজ প্রকাশ করতে কোনো অসুবিধে নেই।
মিসরের হাদিসশাস্ত্রবিদ ও ইতিহাসবিদ ইমাম সাখাভি (রহ.) (১৪২৮-১৪৯৭) বলেন, ‘সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন, কোনো জ্ঞান কারও থেকে শেখার পর তার দিকে সম্পর্কিত করে প্রচার করা জ্ঞানের সততা এবং কৃতজ্ঞতা। কিন্তু ওই ব্যক্তির নাম গোপন রাখা জ্ঞানের অকৃজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত।’ (আল-জাওয়াহিরু ওয়াদ দুরার ফি তারজমাতি হাফেজ ইবনে হাজার)
মিসরের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও ফকিহ ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) (১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.) বলেন, ‘শিক্ষকের দিকে জ্ঞানের সমন্ধ করলে জ্ঞানের আমানত আদায় হয় এবং খেয়ানত থেকে বাঁচা যায়।’ (কিমাতুজ জামান ইনদাল উলামা, আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ)
ঢাকা থেকে প্রকাশিত আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সম্পাদিত মাসিক আল-কাউসারের এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ‘কোনো বইয়ের স্বত্ব লেখক বা প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত হওয়ার উদ্দেশ্য হলো, ওই বইয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনার সব অধিকার লেখক বা প্রকাশকের। এভাবে স্বত্ব সংরক্ষণ করা জায়েজ। এ ক্ষেত্রে লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি ছাড়া ওই বইয়ের মুদ্রণ ও বাজারজাত করা জায়েজ নেই।’ (মাজাল্লাতু মাজমাইল ফিকহিল ইসলামি, সংখ্যা: ৫, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৫৮১)
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘কোনো ওয়েবসাইট বা বই থেকে লেখা বা তথ্য হুবহু নকল করে তথ্যসূত্র ছাড়া বা ওই লেখকের নাম ছাড়া নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া আমানতের খেয়ানত। এটা অসততা এবং একজন খারাপ মানুষের চরিত্র। এটা ভালো মানুষের পরিচয় হতে পারে না। মুসলমান হিসেবে আমাদেরকে আমানতদার হতে হবে।’
আমানত না থাকলে মানুষের ধর্ম থাকে না জানিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘কারও তথ্য তার নাম উল্লেখ ছাড়া নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া আমানতের খেয়ানত। অন্যের প্রাপ্য ক্রেডিট নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া চুরি। হাদিস বিশারদ এবং আলেমদের কাছে এটি অত্যন্ত দোষনীয়।’
জামেয়া মাহমুদিয়া যাত্রাবাড়ি ঢাকার প্রধান মুফতি রেজাউল কারীম আবরার ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘অন্যের জ্ঞান বা লেখা নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ। এটা জঘন্য খেয়ানত। অন্যের বক্তব্য নকলের ক্ষেত্রে তার সূত্র লেখা দেওয়া নৈতিক দায়িত্ব।’
আমানতের খেয়ানত
ইসলামের আমানত রক্ষার গুরুত্ব অনেক। আমানত রক্ষা করা অপরিহার্য দায়িত্ব। আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের লক্ষণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা আমানত নেই, তার ইমান নেই।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৫৬৭)
মুনাফিকের বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৫)



