স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত, এ কথা কি সঠিক

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো ভালোবাসা, দয়া, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিশ্বাসের এক পবিত্র বন্ধন। স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র বাঁধনে নির্মিত হয় পরিবার। পৃথিবীতে আসে নতুন মানুষ।
দাম্পত্য সম্পর্ক আল্লাহর সেরা দান। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা বাড়িয়ে দেন। কোরআনে আছে, ‘তাঁর নিদর্শনের মধ্যে হলো এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পার। আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এর মাঝে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১)
ইসলামে স্ত্রীর প্রতি যেমন স্বামীর দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে। তেমনি স্বামীর প্রতি রয়েছে স্ত্রীর দায়িত্ব ও অধিকার। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা কোরআনে মৌলিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘স্বামীদের যেমন তাদের (স্ত্রীদের) ওপর ন্যায়সঙ্গত হক রয়েছে, তেমনি তাদেরও হক রয়েছে স্বামীদের ওপর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২৯)
স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্য ও মর্যাদার কথা বোঝাতে গিয়ে অনেকেই বলেন, ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত’। প্রশ্ন হলো, এ কথা কি সঠিক। কোরআন ও হাদিসে এর কোনো ভিত্তি আছে?
ইসলামি স্কলার ও হাদিসবিশারদদের মতে, কোরআনে এমন কথা নেই। হজরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে এরকম কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। তাই এটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী বা হাদিস হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভুল ও অনুচিত।
তবে কিছু বর্ণনায় এর মর্মার্থ পাওয়া যায়। হাদিসে আছে, ‘একবার এক নারী সাহাবি নিজের কোনো প্রয়োজনে রাসুলের কাছে এলেন। যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি স্বামী আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আছে। নবীজি বললেন, তার সঙ্গে তোমার আচরণ কেমন? সে বলল, আমি যথাসাধ্য তার সঙ্গে ভালো আচরণের চেষ্টা করি। তখন নবীজি বললেন, হ্যাঁ, তার সঙ্গে তোমার আচরণের বিষয়ে সজাগ থাকো। কারণ, সে তোমার জান্নাত বা তোমার জাহান্নাম।’ (মুয়াত্তা মালেক, হাদিস: ৯৫২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিস্তারিতভাবে স্বামী-স্ত্রীর হক তুলে ধরেছেন এবং স্বামীদেরকে স্ত্রীর হক আদায়ের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
একই সঙ্গে নারীদেরকে স্বামীর আনুগত্য করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এর ফজিলতও বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারী যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক মতো আদায় করবে, রমজানের রোজা রাখবে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে, স্বামীর আনুগত্য করবে, তখন সে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪১৬৩)
ঢাকা থেকে প্রকাশিত আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সম্পাদিত মাসিক আল-কাউসারের এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ‘স্ত্রীর প্রতি স্বামীর হক বা স্বামীর আনুগত্য বিষয়ে অনেকে ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত’ কথাকে হাদিস হিসেবে পেশ করে থাকে। যার আরবি হলো, الجنة تحت أقدام الأزواج। কিন্তু এ শব্দ-বাক্যে কোনো হাদিস পাওয়া যায় না। সুতরাং এটিকে হাদিস হিসেবে বলা যাবে না।’
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত- এ কথাটি আমাদের সমাজে বেশ প্রচলিত। এটি অনেকেই হাদিস বলে থাকেন। অথচ কোরআন-হাদিসের কোথাও এ বর্ণনা নেই। এমনকি কোরআন-হাদিস সমর্থিত কোনো কথাও নয় এটি।’
আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের জান্নাত তার কর্মের ওপর নির্ভর রেখেছেন জানিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘স্বামী যদি মন্দ আমল করেন আর স্ত্রী ভালো আমল করেন, তাহলে এমন হতে পারে যে স্ত্রী জান্নাতে যাবেন। স্বামী যাবেন জাহান্নামে। যেমন ঘটেছিল ফেরাউন ও তার স্ত্রী আসিয়ার ক্ষেত্রে। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া নেক আমল করে জান্নাতবাসী হয়েছেন। তার স্বামী আল্লাহকে না মেনে জাহান্নামি হয়েছেন। অতএব স্ত্রী এবং স্বামীর প্রত্যেকের হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

