জুমার দিনকে জিবরাইল (আ.) কালো দাগ দিয়ে চিহ্নিত করলেন কেন

জুমা শব্দের অর্থ এক জায়গায় জড়ো হওয়া বা কাতারবদ্ধ হওয়া। শুক্রবার মসজিদে জোহরের চার রাকাতের পরিবর্তে কাতারবদ্ধ হয়ে দুই রাকাতের যে ফরজ নামাজ আদায় করা হয়, ইসলামের পরিভাষায় সেটিই সালাতুল জুমা বা জুমার নামাজ।
মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন জুমার দিন। এটি আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম দিন। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে এ দিনে। এ দিনই কেয়ামত সংঘটিত হবে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিন দিবসসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং তা আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৮৪)
এ দিনের সবচেয়ে বড় আমল জোহর নামাজের পরিবর্তে জুমার নামাজ আদায় করা। জুমার নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। কেনাবেচা ছেড়ে দাও, এটাই তোমাদের জন্য অতি উত্তম, যদি তোমরা জানতে!’ (সুরা জুমা, আয়াত: ৯)
জুমার দিন যেসব ইবাদত ও আমল করা হয়, সপ্তাহের অন্যান্য দিনে সাধারণত তা করা হয় না। এই ব্যতিক্রম মুসলমানদের আনন্দ দেয়। ইবাদতে প্রাণ সঞ্চার করে। জুমার দিন পেয়ে আনন্দিত হওয়া সওয়াব। এটি সুন্নতও। কারণ, এ দিনের গুরুত্ব অনেক। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ দিনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। বিশেষ আমল করতেন।
জুমার দিনের একটি বিশেষ ফজিলত হলো, জান্নাতবাসীর জন্য এ দিনটি মহা আনন্দ ও বিশেষ প্রাপ্তির দিন। জান্নাতে প্রতি জুমার দিন বিপুল আনন্দ ও প্রাপ্তির সমাহার ঘটবে।
এ দিনকে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) কালো দাগ দিয়ে চিহ্নিত করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কারণ জানতে চান। হাদিসে আছে, আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসেছেন শুভ্র আয়নার মতো একটা জিনিস নিয়ে। আয়নাটিতে একটি কালো দাগ। আমি বললাম, এটা কী? জিবরাইল (সা.) বলেছেন, এটি হলো জুমার দিন। এ দিনকে আল্লাহ তাআলা আপনার এবং আপনার উম্মতের জন্য ঈদের দিন বানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আপনারা ইহুদি ও নাসারা থেকে অগ্রগামী। (তাদের বিশেষ ইবাদতের দিন যথাক্রমে শনিবার ও রোববার, যা জুমার দিনের পরে আসে।) এই দিন একটা সময় আছে, যে সময় বান্দা আল্লাহর কাছে যে কল্যাণই প্রার্থনা করে আল্লাহ তাকে তা-ই দান করেন।
মহানবী (সা.) বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, জুমার দিনকে কালো দাগ দিয়ে চিহ্নিত করা হলো কেন? জিবরাইল (আ.) জবাব দিয়েছেন, এই যে কেয়ামত দিবস- তা এ দিনেই সংঘটিত হবে। আখেরাতেও জুমার দিনকে আমরা ‘ইয়াউমুল মাজিদ’ নামে স্মরণ করব।
নবী (সা.) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, ‘ইয়াউমুল মাজিদ’ কী? জিবরাইল (আ.) উত্তর দিয়েছেন, জান্নাতে আল্লাহ তাআলা প্রশস্ত ও সুগন্ধময় একটা উপত্যকা বানিয়েছেন এবং এতে তিনি শুভ্র মেশকের একাধিক টিলা স্থাপন করেছেন। জুমার দিন এলে আল্লাহ তাআলা এ উপত্যকায় অবতরণ করবেন। তখন সেখানে নবীদের জন্য স্বর্ণের মিম্বরগুলো রাখা হবে, শহীদদের জন্য মুক্তার অনেক চেয়ার পাতা হবে এবং জান্নাতি হুরেরা আপন আপন কক্ষ থেকে অবতরণ করবে। এরপর সবাই মিলে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও মাহাত্ম্যের স্তুতি গাইতে থাকবে। এরপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করবেন, (হে ফেরেশতারা,) আমার বান্দাদের (বিশেষ পোশাক) পরিধান করাও। সে অনুযায়ী তাদের সজ্জিত করা হবে।
তখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেবেন, আমার বান্দাদের জন্য (বিশেষ) খাদ্য পরিবেশন করো। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাদের জন্যই বিশেষ ভোজনের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমার বান্দাদের সামনে (বিশেষ) পানীয় উপস্থিত করো। তাদের সামনে পানীয় পরিবেশন করা হবে। এরপর আল্লাহ তাআলার আদেশ, আমার বান্দাদের আতর-খোশবু লাগিয়ে দাও। তখন তাদেরকে সুরভিত করা হবে। এবার আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেন, (হে আমার বান্দারা,) তোমরা আমার কাছে কী চাও?
তারা বলবে, হে আমাদের রব, আমরা শুধু আপনার সন্তুষ্টি কামনা করি।
আল্লাহ তাআলা উত্তর দেবেন, আমি তোমাদের প্রতি রাজি হয়ে গেছি। (তবারানির বর্ণনায় আছে, এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য এমন এমন নেয়ামতের দ্বার উন্মুক্ত করবেন, যা কখনো কোনো চোখ দেখেনি এবং কোনো হৃদয় কল্পনা করেনি।)
এরপর সসবাইকে নিজ নিজ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ করবেন। সবাই নিজেদের জান্নাতে চলে যাবে এবং হুরেরা ওই সব কক্ষে আরোহণ করবে, যার প্রত্যেকটিই সবুজ (মূল্যবান রত্ন) পান্না বা লাল ইয়াকুতের তৈরি।’ (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস ৪২২৮; মুজামে আওসাত, তবারানি, হাদিস: ২১০৫৪)


