শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ না করলে যে শাস্তি

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক-কর্মচারীর কোনো পার্থক্য ছিল না। তাঁর কাছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সমান গুরুত্ব পেত। তিনি সবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করতেন; এমনকী দাস-দাসীদের সঙ্গেও। শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতেন। খাদেম বা শ্রমিকরা ভুল করলে উত্তমপন্থায় তা শোধরে দিতেন। কখনো কারও সঙ্গে মন্দাচরণ করতেন না। তাঁর পূর্ণ জীবনীতে এমন নজির নেই, তিনি কর্মচারী বা শ্রমিকের সঙ্গে রুঢ় আচরণ করেছেন কিংবা কোনো ভুলের জন্য তাদের ধমক দিয়েছেন। কর্মচারীরা নবীজির প্রতি এতই বিমুগ্ধ ও নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, যার দরুন বহু বছর পর দেখা হওয়া বাবার সঙ্গে যেতে চাননি খাদেম জায়েদ বিন হারেসা (রা.)।
শ্রমিকদেরকে ভাই মনে করতে হবে। সব সময় তাদের সহযোগিতা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তারা (অধীনস্থরা) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। কাজেই আল্লাহ যার ভাইকে তার অধীনস্থ করে দিয়েছে, তার (মালিক বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তার) উচিত, তাকে তা-ই পরানো, যা সে নিজে পরবে। আর তাকে এমন কাজের ভার দেবে না, যা তার সাধ্যের বাইরে। তার ওপর অধিক কাজের দায়িত্ব চাপানো হলে যেন (দায়িত্বশীল ব্যক্তি) তাকে সাহায্য করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪৫)
শ্রমিকের ভুল ক্ষমা করা
শ্রমিকের ভুল ক্ষমা করা মালিকের নৈতিক দায়িত্ব। তাকে উত্তম পন্থায় বুঝিয়ে দেওয়া। সামান্য ভুলে তাঁকে শাস্তি দেওয়া বা চাকরিচ্যুত করা ঠিক নয়। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একজন লোক এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি শ্রমিকের অপরাধ কতবার ক্ষমা করব? তার কথা শুনে রাসুল (সা.) নীরব থাকলেন। সে আবার বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি শ্রমিকের অপরাধ কতবার ক্ষমা করব? তিনি বললেন, প্রতিদিন ৭০ বার।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪৯)
শ্রমিককে সহযোগিতা করা
মালিকের জন্য শ্রমিক যে কাজ করছেন, বানাচ্ছেন যে পোশাক বা যে খাবার প্রস্তুত করছেন, সম্ভব হলে শ্রমিককে এর অংশ দেওয়া উচিত। নির্ধারিত টাকা-পয়সার বাইরেও তার শ্রমের মূল্যায়ণ করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও সামনে তার কর্মচারী খাবার পরিবেশন করলে কর্মচারীকে সঙ্গে বসাতে না পারলে এক লোকমা বা দুই লোকমা যেন তার হাতে তুলে দেয়। কেননা খাবার তৈরির কষ্টক্লেশ সেই সহ্য করেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৫৭)
শ্রমিককে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া গুনাহ
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায় কর্মচারী বা শ্রমিককে নানা বিষয়ে অপবাদ দেওয়া হয়। কোনো কিছু হারিয়ে গেলে তাকে দোষারূপ করা হয়। কখনও দেওয়া হয় চুরির অপবাদ। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে তার নির্দোষ গোলামের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেবে, কেয়ামতের দিন তাকে বেত্রাঘাত করা হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৬৫)
শ্রমিকের বিনিময় কখন দিতে হবে
প্রায় ঈদেই খবর শোনা যায়, বেতন-বোনাসের জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। গার্মেন্টস সেক্টরে বেতন বকেয়া নিয়ে নানা সময় অনাচারের আলাপ শোনা যায়। গার্মেন্টস ছাড়া আরও অনেক কোম্পানি আছে, যারা সময় মতো শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেয় না। অনেক কর্মচারী কয়েক মাসের বেতন না পেয়ে অফিস ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, এমন গল্পের সংখ্যা হিসাব করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই যে বেতন না দিয়ে মানুষকে কষ্ট দেওয়া, তাদের জীবন যন্ত্রণায় ফেলা, স্বপ্ন ভেঙে দেওয়া; এটা স্পষ্টতাই হারাম। একজন কর্মচারীর ঘাম শুকানোর আগে তার বেতন দেওয়া ঈমানি দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’
বেতন পরিশোধে টালবাহানা গুনাহ
শ্রমিক বা কর্মচারীর বেতন পরিশোধে টালবাহানা করা মারাত্মক অপরাধ। অনেক কোম্পানি আছে, শ্রমিককে নির্ধারিত মজুরি দেয় না। প্রাপ্য মজুরির চেয়ে তাকে ঠকানো হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধনী ব্যক্তির টালবাহানা অবিচার।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৮৭)
সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন
প্রতিষ্ঠানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে কর্মচারীর সততা ও দক্ষতার ওপর। প্রতিষ্ঠানের প্রচার-প্রসার ও সুনাম ছড়ায় কর্মচারীর নিষ্ঠা ও মনোযোগী কাজের মাধ্যমে। সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা ইবাদত। প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও সুফল নিশ্চিত করা ঈমানি দায়িত্ব। দায়িত্বে অবহেলা করা পাপ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর (কেয়ামত দিবসে) তোমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সুতরাং জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরসংসার ও সন্তানের দায়িত্বশীল, তাকে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কর্মচারী তার মালিকের ধন-সম্পদের ওপর একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল। আর (কেয়ামত দিবসে) তোমাদের প্রত্যেককেই দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৫৪)
সর্বোত্তম শ্রমিক কে
আজকাল মানুষ নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে বড়ো উদাসীন, অসচেতন। মানুষ দায়িত্বের চেয়ারে বসে ভুলে যায় সততার কথা। কোম্পানি বা মালিকের কল্যাণের কথা মনে রাখে না। প্রায় খবর শুনি, মালিকের টাকা নিয়ে কর্মচারী উধাও। অমুক ব্যাংকের শত কোটি টাকার হিসাব মিলছে না। টাকা পাচারের দায়ে কোম্পানির ‘অমুক স্যার’ গ্রেপ্তার। ইসলাম বরাবরই সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সর্বোত্তম শ্রমিক সেই, যে শক্তিশালী ও আমানতদার।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬)
যে শ্রমিক দ্বিগুণ সওয়াব পান
মালিক-কর্মচারী, সিনিয়র-জুনিয়র, গৃহকর্তা-গৃহকর্মী, প্রিন্সিপাল-শিক্ষক, শাসক-জনগণ; আজকাল প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা যায়। মালিকের অভিযোগ, ভালো কর্মচারী পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মচারীর অভিযোগ, মালিকের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিলেও কাজ হয় না।
উভয়পক্ষকেই সৎ ও আদর্শবান হতে হবে। শ্রমিক তার সর্বোচ্চটা বিলিয়ে দেবে, এটাই তার দায়িত্ব। যথাসময়ে উত্তম বিনিময় দেওয়াও মালিকের নৈতিক দায়িত্ব। কর্মচারী ন্যায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে আল্লাহ তাআলা তাকে দ্বিগুণ সওয়াব দেবেন। এক. মালিকের কাজে তার রুটি-রুজির ব্যবস্থা। দুই. আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে যথাযথভাবে তার মালিকের প্রতি কর্তব্য আদায় করে এবং সুন্দরভাবে আল্লাহর ইবাদতও করে, সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১৬৯)

