কীসের আওয়াজ শুনে কানে আঙুল দিয়েছিলেন মহানবী (সা.)

ইসলামে আছে মানবজীবনের সব বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ সমাধান। কী করতে হবে, কোন জিনিস থেকে বিরত থাকতে হবে, এর আছে সঠিক দিকনির্দেশনা।
ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তাঁর আদর্শের অনুসরণ ছাড়া মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না। জীবনে সফলতা লাভ করতে পারবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের (মানুষ ও জিন) জন্য রাসুলুল্লাহর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি স্মরণ করে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)
মুমিন-মুসলমানের জন্য আবশ্যক হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশ মেনে জীবন পরিচালনা করা। তাঁর নিষেধ করা বিষয় থেকে বিরত থাকা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) গান-বাজনা শুনতে নিষেধ করেছেন। গানকে ‘শয়তানের সুর’ বলেছেন। তিনি জীবনে কখনো গান বা বাঁশির সুর শোনেননি। তিনি একবার বাঁশির সুর শুনে কানে আঙুল দিয়েছিলেন।
নাফে (রহ.) বলেন, ‘একবার ইবনে উমর বাঁশির আওয়াজ শুনে দুই কানে আঙুল দিয়ে রাস্তা থেকে দূরে সরে গেলেন। কিছুদূর গিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে নাফে, এখনো কি আওয়াজ শুনছ?’ বললাম, ‘হ্যাঁ।’ পরে আমি যখন বললাম, এখন আর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না, তখন তিনি কান থেকে আঙুল সরালেন। বললেন, ‘একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) চলার পথে বাঁশির আওয়াজ শুনে এমনই করেছিলেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯২৪)
গান-বাজনা বা বাঁশির আওয়াজ শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা একমুহূর্তের জন্যও কান তুলতে রাজি ছিলেন না। মহানবী (সা.) ও সাহাবিরা প্রচণ্ডরকমভাবে গান-বাজনা ও বাঁশির সুর ঘৃণা করতেন।
মহানবী (সা.)-এর মক্কার জীবনে নজর ইবনে হারিস বিদেশ থেকে এক গায়িকা বাঁদি ক্রয় করে তাকে গান-বাজনায় লাগিয়ে দিলো। কেউ কোরআন শোনার ইচ্ছা করলে তাকে গান শোনানোর জন্য সে গায়িকাকে আদেশ দিত। বলত, ‘মুহাম্মদ তোমাদেরকে কোরআন শুনিয়ে নামাজ, রোজা এবং ধর্মের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার কথা বলে। এতে শুধুই কষ্ট। এর চেয়ে বরং গান শুনে জীবনকে উপভোগ করো।’ এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ কোরআনে বলেন, ‘এক শ্রেণির মানুষ আছে, যারা অজ্ঞতাবশত খেল-তামাশার জিনিস কেনে বান্দাকে আল্লাহর পথ থেকে অমনোযোগী করার জন্য।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মদ খেতে, জুয়া খেলতে, ঢোল বা তবলা বাজাতে এবং ঘরে তৈরি মদপান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই হারাম। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৪৪)
রাসুলুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার ওপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমণীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদের জমিনে ধসিয়ে দেবেন। আর তাদের কিছুকে বানর ও শূকর বানিয়ে দেবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০২০)
ইবনে কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘গান নিষেধ ও হারাম হওয়া সম্পর্কিত হাদিসগুলো মুতাওয়াতির (বিশুদ্ধ সনদে ধারবাহিকভাবে বর্ণিত)। এ বিষয়ে ১৩ জন সাহাবি থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।’ (ইগাসাতুল লাহফান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৬০)
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফি ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, গান-বাদ্য হারাম।
পবিত্র কোরআনের এক আয়াতে আছে, ইবলিস-শয়তান আদম সন্তানকে ধোঁকা দেওয়ার আরজি পেশ করলে আল্লাহ তাআলা ইবলিসকে বললেন, ‘তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৬৪)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যে সব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ি মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা। এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (ইগাছাতুল লাহফান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৯৯)


