কোরআনের গল্প

নবীর স্ত্রী হয়েও জাহান্নামি যে নারী

নবীর স্ত্রী হয়েও জাহান্নামি যে নারী
আরবি ক্যালিগ্রাফি। ছবি: সংগৃহীত

লুত (আ.) ছিলেন ইবরাহিম (আ.)-এর ভাতিজা। তাঁর পিতার নাম হারান। তিনি শৈশবে ইবরাহিম (আ.)-এর সঙ্গে থাকতেন। ইবরাহিম (আ.)-এর ধর্ম বিশ্বাস করতেন। তাঁর সঙ্গ নিয়ে মাতৃভূমি বাবেল ছেড়ে চলে যান একদিন। ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতিটি হিজরতের সফরে লুত (আ.) সঙ্গে ছিলেন। সর্বশেষ মিসরেও ছিলেন। এর মধ্যে নবুওয়াত পেলেন লুত (আ.)। পরামর্শ করে মিসর ছেড়ে বায়তুল মুকাদ্দাস ও জর্ডানের মধ্যবর্তী সাদুম ও আমুরা অঞ্চলে চলে আসেন। বর্তমানের মৃতসাগর বা লুত সাগরের জায়গাটিতে সামুদ ও আমুরা গোত্রের বসতি ছিল। সেসময় এখানে সমুদ্র ছিল না। লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহর গজবের ফলে এই ভূখণ্ড চারশো মিটার পানির সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যায়। (কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৩৮)

Advertisement

লুত (আ.) সামুদে বসবাস শুরু করলেন। সাদুমের ভূমি ছিল উর্বর ও শস্য-শ্যামল। এখানে সর্বপ্রকার শস্য ও ফলের প্রাচুর্য ছিল। লোকেরা ছিল বেশ স্বচ্ছল। কিন্তু তারা একাত্ববাদে বিশ্বাস করত না। আল্লাহর অবাধ্যতা করত। নানারকম পাপ ও অশ্লীল কাজ করত। ডাকাতি করত। লুটতরাজ চালাত। অধিকন্তু তারা এমন এক জঘন্য অপকর্ম ও লজ্জাকর অনাচারে লিপ্ত ছিল, যা আগের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে ছিল না। তারা নিজেদের কামরিপু চরিতার্থ করার জন্য নারীদের পরিবর্তে দাড়ি-গোফহীন বালকদের সঙ্গে মেলামেশা করত। যা সমকামিতা নামে কুখ্যাত। তারা এ কাজ দলবেঁধে প্রকাশ্যে করত। অন্যায় বা দোষের মনে করত না। (সুরা আরাফ, আয়াত: ৮০-৮১; তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, পৃষ্ঠা: ৬৩৮)

লুত (আ.) তাদের একাত্ববাদের দাওয়াত দিলেন। আল্লাহর পথে ডাকলেন। পাপ ছাড়তে বললেন। পবিত্র জীবনযাপনের প্রতি উৎসাহ দিলেন। গুটিকয়েক লোকই তাঁর কথা মেনে নিল। এর মধ্যে নিজের স্ত্রী ওয়ালেহা অবিশ্বাসীদের দলে রয়ে গেল। তিনি আজাবের ভয় দেখালেন। তারা আজাবের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ল। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘জবাবে তার (লুত আ.-এর) সম্প্রদায় শুধু এই বলল, আমাদের ওপর আল্লাহর শাস্তি আনয়ন করো, যদি তুমি সত্যবাদী হও।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২৯; তাফসিরে কুরতুবিতে সুরা তাহরিমের ১০ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্দ)

নবীর স্ত্রী হয়েও ওয়ালেহার আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করার ব্যাপারটি লুত (আ.)-এর জন্য পীড়াদায়ক হয়ে দাঁড়াল। তিনি তাকে নানাভাবে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। কাজ হলো না। বরং সে অবিশ্বাসীদের সহযোগিতা করত। নবীর কাছে কেউ ইমান নিয়ে আসলে বা মেহমান আসলে, তাদের কথা বলে দিত। কুৎসা রটাত। চুগলখোরি করত। সমকামীতায় উৎসাহ যোগাত। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ১৯৪)

লুত (আ.) দাওয়াতি কাজ অব্যাহত রাখেন। কাফেররা সিদ্ধান্ত নেন, লুত (আ.)-কে শহর থেকে বের করে দেবেন কিংবা পাথর আঘাতে মেরে ফেলবেন। তাদের পাপকাজ ও নবীহত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। একদিন সামুদ শহরে তিনজন যুবক এলেন। লুত (আ.)-এর ঘরে মেহমান হলেন। তারা ছিলেন তরুণ। আকারে ও গঠনে সুশ্রী ও সুন্দর ছিলেন। তাদের কমনীয় চেহারায় দাড়ি-গোফের চিহ্ন ছিল না। তাদের আগমন বিকারগ্রস্ত সমকামীদের দৃষ্টি এড়ায়নি। তারা যুবকদের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে। লুত (আ.)-এর স্ত্রী সম্প্রদায়ের লোকদের যুবকদের খবর জানিয়ে দিয়ে বলল, ‘আজ আমাদের ঘরে তিনজন দাড়ি-গোফহীন অত্যন্ত সুন্দর যুবক মেহমান এসেছেন।’ (তাফসিরে কুরতুবি ও মাজহারির সূত্রে তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, পৃষ্ঠা: ৬৩৯)

লুত (আ.) তাদের নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। আশঙ্কা করলেন, জাতির লোকেরা মেহমানদের সঙ্গে মন্দ আচরণ করতে উদ্যত হবে। তাঁকে দুশ্চিন্তা ভাঙচুর করে চলল। এর মধ্যে লোকেরা তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে বসল। মেহমানদের তাদের কাছে সোপর্দ করতে বলল। নবী তাদের খুব করে বুঝাতে চাইলেন। বললেন, ‘আমার মেয়েদের বিয়ে করো। তারা তোমাদের জন্য পবিত্রতম। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। অতিথিদের কাছে আমাকে লজ্জিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি একজনও ভালো মানুষ নেই, যে আমার কথা শুনবে।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৭৮)

কোনো কোনো ব্যাখ্যাকারী বলেছেন, লুত (আ.) নিজের মেয়ে বলে সমগ্র জাতির মেয়েদের বুঝিয়েছেন। কেননা প্রত্যেক নবী নিজ জাতির পিতৃতুল্য এবং উম্মতরা তাঁর রুহানি সন্তান। তারা বলল, ‘তোমার মেয়েদের নিয়ে আমাদের আগ্রহ নেই। আমরা কি চাই, তাও তুমি জানো। এদের আমাদের কাছে দাও।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৭৯)

লুত (আ.)-এর তুমুল অস্থিরতা দেখে যুবকরা বললেন, ‘আমরা ফেরেশতা। এরা আমাদের কাঁবু করতে পারবে না। এদের শাস্তি দিতে এসেছি। আপনার স্ত্রী এদের সঙ্গে থাকবে। আপনার সঙ্গে থাকবে না। আপনার পরিবার সুরক্ষিত থাকবে। আপনি ভোর হওয়ার আগে শহর ছেড়ে চলে যাবেন। পেছনে তাকাবেন না।’ কোনো কোনো তাফসিরবিদ বলেছেন, ‘তিনজন যুবক হলেন, জিবরাইল, মিকাইল ও ইসরাফিল (আ.)।

এদিকে ঘরের সামনে সমবেত লোকেরা ঘরের ভেতর ঢুকতে যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। লুত (আ.) ঘরের দরজা বন্ধ রেখেছিলেন। তারা দেয়াল টপকিয়ে ও কপাট ভেঙে ঘরে ঢুকতে উদ্যত হচ্ছিল। ফেরেশতাদের কথায় তিনি দরজা খুলে দিলেন। জিবরাইল (আ.) ওদের প্রতি পাখার ঝাপটা দিলে তারা অন্ধ হয়ে যায়।

লুত (আ.) সপরিবারে রাতের প্রথম ভাগে সাদুম থেকে বের হয়ে গেলেন। স্ত্রী তাঁর সঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। সে সাদুমে ফিরে এলো। শেষ রাতে একটি বিকট শব্দ সাদুমবাসীকে বিধ্বস্ত করে দিল। পরে গোটা বসতির ওপরিভাগকে ঊর্ধ্বে তুলে উল্টিয়ে দেওয়া হলো। ওপর থেকে পাথর বর্ষণ করে তাদের নাম-চিহ্ন পর্যন্ত মুছে দেওয়া হলো। তাদের বসতি সাগর হয়ে গেল। নবীর স্ত্রী হয়েও ওয়ালেহা জাতির সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেল। (সুরা হিজর, আয়াত: ৬১-৭৫; সুরা হুদ: আয়াত: ৮০-৮৩; কাসাসুল কোরআন, মাওলানা হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আব্দুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৪০)

কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, ‘তাঁর স্ত্রীও সঙ্গে যাচ্ছিল। কিন্তু পাপীদের ওপর আজাব নাজিল হওয়ার আওয়াজ শুনে পেছনে ফিরে তাকায় সে। জাতির শোচনীয় পরাজয় দেখে দুঃখ প্রকাশ করতে লাগল। তখন একটি পাথরের আঘাতে তার মৃত্যু হয়।’ (তাফসিরে কুরতুবি ও মাজহারির সূত্রে তাফসিরে মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, পৃষ্ঠা: ৬৪০)

পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যারা কুফুরির (অবিশ্বাস) নীতি অবলম্বন করে তাদের বিষয়ে আল্লাহ নুহের স্ত্রী আর লুতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত পেশ করছেন। এরা ছিল আমার দুই নেককার বান্দার অধীনে। কিন্তু তারা দুজনেই তাদের স্বামীদ্বয়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নুহ ও লুত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারল না। তাদের বলা হলো, তোমরা দুজন জাহান্নামে প্রবেশ করো (অন্যান্য) প্রবেশকারীদের সঙ্গে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ১০)

সুফিয়ান সাওরি (রহ.) সুলায়মান ইবনে কারম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, সুলায়মান (রহ.) বলেন, ‘আমি ইবনে আব্বাস (রা.)-কে ‘স্বামীদ্বয়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা’র ব্যাখ্যা বলতে শুনেছি, এই দুজন নারী ব্যভিচারে লিপ্ত হয়নি। নুহ (আ.)-এর স্ত্রী জনসমাজে নুহকে পাগল বলে বেড়াত। লুত (আ.)-এর স্ত্রী ঘরে মেহমান এলে তাদের অপদস্থ করতে লোকদের বলে দিত—এই ছিল তাদের বিশ্বাসঘাতকতা।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ১৯৪)