মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করবেন যেভাবে

প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুবরণ হবে। মৃত্যুর কবল থেকে জগতের কোনো তাবৎ পরাশক্তি, কোনো প্রযুক্তি কাউকে বাঁচাতে পারবে না। মৃত্যুর কাছে সবাই অক্ষম। মৃত্যুর অনিবার্য স্বাদ প্রত্যেক প্রাণীকে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত: ১৮৫)
সূর্যের অস্ত যেমন কেউ ঠেকাতে পারে না, মানুষের মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না। নির্ধারিত সময়ে তার মৃত্যু হবে। আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু তিনি তাদেরকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন। তারপর যখন তাদের নির্দিষ্ট কাল এসে পড়বে, তখন তারা মুহূর্তকালও পেছনে যেতে পারবে না এবং সামনেও যেতে পারবে না।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৬১)
প্রিয়জনের মৃত্যুতে মানুষের মন খারাপ হয়। বেদনায় ভারাক্রান্ত হয় মন। প্রিয়জন কবরে চলে গেলেও তাদের জন্য জীবিতদের করার অনেক কিছু থাকে। আর এই সংযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো দোয়া।
মৃতের জন্য দোয়া করা
হজরত মুহাম্মদ (সা.) মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়ার করার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। মৃত ব্যক্তি তখন জীবিতদের দোয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল স্থগিত হয়ে যায়, শুধু তিনটি আমল ছাড়া। এর মধ্যে একটি হলো, এমন নেক (ভালো) সন্তান রেখে যাওয়া, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
দাফনের পরই দোয়া করতে বলেছেন মহানবী (সা.)
দাফনের ঠিক পরপরই মৃতের জন্য ক্ষমার আবেদেন করতে বলেছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি নিজেই মৃত ব্যক্তির দাফন সম্পন্ন করে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং সে যেন অবিচল থাকতে পারে সেই দোয়া করো। কারণ, এই মুহূর্তে তাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১)
মৃতের জন্য যেভাবে দোয়া করতেন নবী (সা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত ব্যক্তির কয়েকটি দোয়া করেছেন। একটি দোয়া হলো,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الْأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلًا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ النَّارِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগ ফির লাহু ওয়ার হামহু, ওয়া আ ফিহি, ওয়াফু আনহু, ওয়াকরিম নুজুলাহু, ওয়া ওয়াসসি মুদখালাহু, ওয়াগসিলহু বিল মায়ি ওয়াস সালজি ওয়াল বারাদি, ওয়া নাক্কিহি মিনাল খাতাআ কামা নাক্কায়তাস সাওবাল আবয়াসা মিনাদ দানাসি। ওয়াব দিলহু দারাং খায়রাং মিং দারিহি, ওয়া আহলান খায়রাম মিন আহলিহি, ওয়া জাওজান খায়রাম মিন জাওজিহি, ওয়া আদখিলহুল জান্নাতা, ওয়া আয়িজহু মিন আজাবিল কবরি, ওয়া আজাবিন নারি।
অর্থ: হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন এবং তাকে দয়া করুন। শান্তিতে রাখুন এবং তার থাকার স্থানটিকে মর্যাদাশীল করুন। তার কবর প্রশস্থ করে দিন। বরফ ও তুষারের শুভ্রতা দিয়ে তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিচ্ছন্ন করে দিন, যেমন ময়লা থেকে সাদা কাপড় পরিষ্কার হয়। তাকে দুনিয়ার বাসস্থানের চেয়ে উত্তম বাসস্থান, পরিবার ও সঙ্গী দান করুন। হে মাবুদ, তাকে জান্নাতে দাখিল করুন, তাকে কবর আর দোজখের আজাব থেকে রক্ষা করুন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২/৬৩৪)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার কবরবাসীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়েন-
السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ أَنْتُمْ سَلَفُنَا وَنَحْنُ بِالأَثَرِ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর, ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়ালাকুম। আংতুম সালাফুনা, ওয়া নাহনু বিল আসার।
অর্থ: হে কবরবাসী, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের ক্ষমা করুন, তোমরা আমাদের আগে কবরে গিয়েছ এবং আমরা পরে আসছি। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৫৩)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি কবর জিয়ারতে গিয়ে বলেন-
السَّلامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤمِنينَ وإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاحِقُونَ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম দারা কাওমিম মুমিনিন, ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকুন।
অর্থ: মুমিন এই ঘরবাসীদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ আমরা আপনাদের সঙ্গে মিলিত হব। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪৯)
মৃতদের জন্য দুই নবীর দোয়া
মৃত মা-বাবা, সন্তান এবং মুমিনদের জন্য দোয়া করেছেন নবীরা। এখানে দুজন নবীর দোয়া উল্লেখ করা হলো,
হজরত ইবরাহিম (আ.) এভাবে দোয়া করেছেন-
رَبَّنَا اغۡفِرۡ لِیۡ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَوۡمَ یَقُوۡمُ الۡحِسَابُ
উচ্চারণ: রাব্বানাগ ফিরলি ওয়া লি ওয়া লিদাইয়া ওয়া লিল মুমিনানা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।
অর্থ: হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আপনি আমাকে, আমার বাবা-মাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪১)
হজরত নুহ (আ.)-এর দোয়া ছিল এরকম-
رَبِّ اغۡفِرۡ لِیۡ وَ لِوَالِدَیَّ وَ لِمَنۡ دَخَلَ بَیۡتِیَ مُؤۡمِنًا وَّ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ وَ لَا تَزِدِ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا تَبَارًا
উচ্চারণ: রাব্বিগ ফিরলি ওয়া ওয়া লিদাইয়া ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মুমিনাও ওয়া লিল মুমিনিনা ওয়াল মুমিনাতি। ওয়া লা তাজিদিজ জালিমিনা ইল্লা তাবারা।
অর্থ: হে আমার রব, আপনি ক্ষমা করুন আমাকে। আমার বাবা-মাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে; আর জালিমদের শুধু ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন। (সুরা নুহ, আয়াত: ২৮)
বাবা-মায়ের জন্য দোয়া
সন্তানের দোয়া মৃত বাবা-মায়ের কাজে লাগে। এতে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি হয়। তাদের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করে বলবে, আমরা এত মর্যাদার অধিকারী কীভাবে হলাম?’ তাকে বলা হবে, ‘তোমার জন্য তোমার সন্তানের দোয়া ও ইসতেগফারের কারণে তুমি এত মর্যাদা পেয়েছ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)
এজন্য মৃত বাবা-মায়ের জন্য বেশি দোয়া করতে হবে। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মৃত বাবা-মায়ের জন্য কী দোয়া পড়া হবে, কোরআনে আল্লাহ তা শিখিয়ে দিয়েছেন। দোয়াটি হলো-
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ: রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সগিরা।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করো যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন। (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৩-২৪)
কবর জিয়ারতের দোয়া
কবর জিয়ারত কিংবা কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নিচের দোয়াটি পড়া যেতে পারে-
السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ أَنْتُمْ سَلَفُنَا وَنَحْنُ بِالأَثَرِ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর, ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়ালাকুম। আংতুম সালাফুনা, ওয়া নাহনু বিল আসার।
অর্থ: হে কবরবাসী, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের ক্ষমা করুন, তোমরা আমাদের আগে কবরে গিয়েছ এবং আমরা পরে আসছি। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৫৩)
কবর জিয়ারতের নিয়ম
প্রথমে কবর জিয়ারতের দোয়া পড়তে হবে। পরে তাদের জন্য ইসালে সওয়াবের নিয়তে দরুদ শরিফ ও বিভিন্ন সুরা পড়া উত্তম। কবরবাসীর মাগফেরাতের জন্য দোয়া করতে হবে। কবর জিয়ারতের সময় আল্লাহর কাছে সব মুসলমানের জন্য ক্ষমা চাওয়া ইমানদারের নৈতিক দায়িত্ব।
আরও যেসব আমল মৃতের কাছে পৌঁছায়
দোয়া ছাড়াও আরও কিছু আমল মৃতের কাছে পৌঁছায়। যেমন, মৃতের পক্ষ থেকে দান-সদকা করা, সদকায়ে জারিয়া বা চলমান কোনো নেক কাজ করা, তার পক্ষ থেকে হজ-ওমরাহ করা, কোরবানি ইত্যাদি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার আমল স্থগিত হয়ে যায়, শুধু তিনটি আমল ছাড়া। এক. সদকায়ে জারিয়া, দুই. এমন জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয়, তিন. এমন নেক (ভালো) সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)



