দাদার সম্পত্তিতে নাতনির অধিকার ও অংশ বণ্টনের পদ্ধতি

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি কে কতটুকু পাবে, তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। নির্ধারণ করে দিয়েছেন প্রত্যেকের অংশ। এই বিধানে কমবেশি করার কোনো সুযোগ নেই। উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে কাউকে বঞ্চিত করা হারাম। নানা অজুহাত বা না-জানার কারণে কাউকে কাউকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতা সমাজে আছে। তবে সঠিক মাসয়ালা ও বণ্টননীতি জানা থাকলে উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টন করতে সহজ হয়।
উত্তরাধিকার আইন নিয়ে ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ফারায়েজ সম্পর্কে ইসলামি আইন ও বিধিবিধানসহ নানা বিষয় নিয়ে ‘ফারায়েজ আইন’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন গাজী শামছুর রহমান। বইটির তৃতীয় অধ্যায়ের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নাতনির ছয় অবস্থা’ তা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
ইসলামি শরিয়াহ ও ফারায়েজ আইন অনুযায়ী, দাদার সম্পত্তিতে নাতনির অধিকার সুনির্দিষ্ট নিয়মে সংরক্ষিত। তবে পরিবারের মূল উত্তরাধিকারী যেমন: ছেলে, মেয়ে বা অন্যান্য পুরুষ ওয়ারিশের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নাতনির প্রাপ্য অংশের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

ফারায়েজ শাস্ত্র অনুযায়ী মৃতের সম্পত্তিতে নাতনির অধিকারকে মূলত ছয় ভিন্ন অবস্থায় বিন্যস্ত করা হয়েছে।
১. একজন নাতনি থাকলে (সন্তানহীন অবস্থায়): মৃত ব্যক্তির যদি কোনো সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) না থাকে এবং শুধু একজনই নাতনি থাকে, তবে সে মোট সম্পত্তির অর্ধাংশ বা দুই ভাগের এক ভাগ অংশ পাবে।
২. একাধিক নাতনি থাকলে (সন্তানহীন অবস্থায়): মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকলে এবং একাধিক নাতনি বিদ্যমান থাকলে, তারা সবাই মিলে যৌথভাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ বা তিন ভাগের দুই ভাগ অংশ পাবে এবং তা নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
৩. একজন মেয়ে থাকলে: মৃত ব্যক্তির যদি একজন মেয়ে থাকে, তবে এক বা একাধিক নাতনি থাকলে তারা সবাই মিলে অবশিষ্ট অংশ হিসেবে মোট সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ বা ছয় ভাগের এক ভাগ অংশ পাবে।
৪. ছেলে থাকলে: মৃত ব্যক্তির ছেলে জীবিত থাকলে নাতনিরা সম্পত্তির কোনো অংশ পাবে না (অর্থাৎ তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবে)।
৫. একাধিক মেয়ে থাকলে: মৃত ব্যক্তির ছেলে না থাকা সত্ত্বেও যদি দুই বা ততোধিক মেয়ে থাকে, তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী নাতনি সম্পত্তির কোনো অংশ পাবে না।

৬. আসাবা বা অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে বিশেষ অবস্থা: যদি নাতনিদের সঙ্গে তাদের ভাই বা চাচাতো ভাই (মৃত ব্যক্তির নাতি) থাকে, অথবা নাতনিদের নিম্নক্রমের কোনো পুরুষ সন্তান (যেমন: ভাইপো বা ভাইপোর ছেলে) বিদ্যমান থাকে, তবে তাদের উপস্থিতির কারণে নাতনিরা নির্ধারিত অংশের দাবিদার না হয়ে আসাবা হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির দুই মেয়ের নির্ধারিত অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, তা উক্ত নাতি ও নাতনিদের মধ্যে ‘এক পুরুষ দুই নারীর সমান’ (প্রতি পুরুষ প্রতি নারীর দ্বিগুণ) হারে বণ্টিত হবে।
লেখক পরিচিতি
গাজী শামছুর রহমান (১৯২১-১৯৯৮) বাংলাদেশি আইনবিদ ও আইন সংস্কারক, বিচারক, ভাষাবিদ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলায় আইনবিষয়ক গ্রন্থ রচনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তিনি ১৯৮৫ সালে একুশে পদক পান। তিনি জেলা জজ ছিলেন। সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন কিছুদিন।


