logo
Advertisement

বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে যা করবেন

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে যা করবেন
বাবার সম্পত্তি থেকে বোনকে বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ নেই। ছবি: ভেকটিজি

পৃথিবীতে ভাইবোনের সম্পর্ক সবচেয়ে মধুর। তবে মাঝেমধ্যে এই সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। বিশেষ করে বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে প্রায়ই ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এদিকে আবার কেউ কেউ মনে করেন, বোনেরা বাবার পৈত্রিক সম্পত্তির অংশ পায় না। আবার কারও ধারণা, সম্পত্তি নিলে স্বামীর সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়।

Advertisement

সম্পত্তি বণ্টনকে কেন্দ্র করে ভাইবোনের মধ্যে বিবাদ পরিবার ও সমাজে বিদ্যমান সমস্যার একটি। ভাই যদি বোনকে সম্পত্তি দিতে না চান, বোন যদি তার প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হন, সেক্ষেত্রে বোনের করণীয় কী এবং এ সংক্রান্ত আইনি সহায়তা সম্পর্কে বই লিখেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। বইয়ের নাম ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৬ ও ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলে বোনের করণীয় নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

বোনেরা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হলে যা করবেন

বইটিতে লেখা হয়েছে, ‘আমাদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে, বোনেরা বাবার পৈত্রিক ভিটার অংশ পায় না আবার বাপের বাড়ির সম্পত্তি ভাগ নিলে স্বামীর সংসারে অভাব-অনটন নেমে আসে। আবার অনেকে বলে থাকে ভাইদের সঙ্গে বোনদের সম্পর্কের অবনতি এবং বোনেরা ভাইদের বাড়িতে এবং ছেলেমেয়েরা মামার বাড়িতে যাবার অধিকার বঞ্চিত হয়। ভাইয়েরা বোনকে ফাঁকি দিয়ে পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি করে ভোগ-দখল করলে যদি অভিশপ্ত না হয়, সম্পর্ক অবনতি না হয়, তো বোনদের অপরাধ কোথায়?’

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সম্পত্তিতে বোনের অধিকার

সম্পত্তিতে বোনের অধিকার নিয়ে বইয়ে লেখা আছে, ‘বোনদের প্রাপ্য সম্পত্তি ভাই ভোগদখল করবে, ফুফুর সম্পত্তি ভাইপো ভোগদখল করবে, তাতে অপরাধ হবে না, অথচ পিতামাতার সম্পত্তির বৈধ অংশ কন্যা ভোগদখল করলেই ‘অভিশপ্ত’ হবে। প্রকৃতপক্ষে মেয়েদের স্থায়ীভাবে ঠকানোর এগুলো একটি চতুর কৌশল ছাড়া আর কিছুই না। শুধু বোনের প্রাপ্ত অংশই নয়, যদি কোনো বোন তার স্বামীর অব্যাহত অত্যাচারে ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেয়, তাহলে ভাই ভরণপোষণ দেবে। জোর করে বোনের ভরণপোষণের ভয়ে উপযুক্ত সুরাহা বা মীমাংসা ছাড়া ওই স্বামীর বাড়িতে পৌঁছে দেবেন না। কাজেই বোনের উত্তরাধিকার সম্পত্তি গ্রাস করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনকে তার অধিকার দিয়ে দাও...।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৬)। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারও উত্তরাধিকার সম্পত্তি গ্রাস করে, যে ব্যক্তি কারও উত্তরাধিকারী সম্পত্তি নিয়ে পলায়ন করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের অংশ থেকে বঞ্চিত করবেন।’

উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা

একটি উদাহরণ দিলেই আজকের আলোচ্য বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। রহিমরা চার ভাই ও এক বোন। রহিমের বাবা মারা গেছেন। তার মা বেঁচে আছেন। এখন রহিমরা চার ভাই মিলে বাবার সম্পত্তি নিজেদের নামে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন। ভাইয়েরা কিছুতেই বোনের বাবার সম্পত্তির অংশ দিতে চাচ্ছেন না। এখন বোন কি করবেন?

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বোনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই

বোনদের বঞ্চিত করার সুযোগ নেই জানিয়ে বইয়ে লেখা হয়েছে, ‘মুসলিম আইনে বাবা বা মা মারা গেলে মৃত ব্যক্তির যদি ছেলে এবং মেয়ে উভয়ই থাকে তাহলে রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে ছেলেরা যা পাবেন, মেয়ে বা মেয়েরা তার অর্ধেক পাবেন। অর্থাৎ ভাইয়েরা ইচ্ছা করলেই বোনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে বোনের বিয়ে হোক বা না হোক, সেটি বিবেচ্য নয়।’

বঞ্চিত হলে মামলা

এ ক্ষেত্রে বঞ্চিত বোনেরা বাঁটোয়ারা বা বণ্টনের মোকাদ্দমা করতে পারেন। মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির ভাগ-বণ্টন নিয়ে উত্তরাধিকারীদের নিজেদের মধ্যে বনিবনা না হলে, বাঁটোয়ারা মামলা করে অধিকার ফিরে পাওয়া যায়। এই মোকদ্দমা চলাকালে কেউ মারা গেলে তাদের উত্তরাধিকারীরা অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন এবং অংশ চাইতে পারেন। অর্থাৎ শুধু বোনেরা নন, বোনেরা মারা যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকারীরাও এই মামলায় পক্ষ হতে পারেন।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সম্পদ থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে ভয় দেখালে মামলা করারও সুযোগ আছে উল্লেখ করে লেখক সিরাজ প্রামাণিক লিখেছেন, ‘এ মামলায় দুবার ডিক্রি হয়। প্রাথমিক ডিক্রি হওয়ার পরে বা আগে নিজেদের মধ্যে নির্ধারিত সময়ে আপস-মীমাংসা করে নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রাথমিক ডিক্রির পর বণ্টন না করা হলে আদালত অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করে অংশ নির্ধারণ করে দিতে পারেন এবং চূড়ান্ত ডিক্রি প্রদান করেন। এ ছাড়া বোনদের ভয়-ভীতি ও হুমকি দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ও নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা যেতে পারে। ভয়-ভীতি-হুমকি ও জীবননাশের আশঙ্কায় আদালতে ফৌজদারি মামলাও করা যায়।’


লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।