জমি কেনার আগে মালিকানা যাচাই করবেন যেভাবে

একটি নিজস্ব জমি বা আবাসন গড়ে তোলা প্রতিটি মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান স্বপ্ন ও সারা জীবনের সঞ্চয়ের বিনিয়োগ। তবে বর্তমানে জমি-জমা সংক্রান্ত সঠিক তথ্যের অভাব, আইনি জটিলতা এবং প্রতারক চক্রের নানামুখী ফাঁদের কারণে এই আনন্দের মুহূর্তটি অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তা ও আদালতের চক্করে পরিণত হয়। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি, একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি কিংবা সরকারি-অর্পিত সম্পত্তি গোপনে বুঝিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা অহরহই ঘটছে।
জমি কেনার ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতা বা অজ্ঞতা কেবল বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিই ডেকে আনে না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম আইনি বিবাদে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই যেকোনো জমি চূড়ান্ত বা বায়না করার আগে এর প্রতিটি আইনি নথি, মালিকানার ইতিহাস ও সরজমিনে তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। ক্রেতাদের আইনি সুরক্ষা ও ঝুঁকিহীন সম্পত্তি ক্রয় নিশ্চিত করতে জমি কেনার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা করতে হবে চলুন তা জেনে নিই।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির চতুর্থদশ অধ্যায়ের ৩৩৫ ও ৩৩৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমি কেনার পূর্বে জমির মালিকানা যাচাইয়ের সূত্র’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
দলিলের সত্যতা ও বায়া দলিল পরীক্ষা
প্রথমেই সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সম্পত্তিটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হলে কেবল মূল দলিল নয়, সাথে 'বণ্টননামা' বা পার্টিশন ডিড খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া পূর্ববর্তী মালিকদের তথ্য জানতে ‘বায়া দলিল’ (পিঠ দলিল) ভালোভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন, যা জমির পেছনের ইতিহাস স্পষ্ট করে।
মালিকানার উৎস ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি যাচাই
জমিটি ক্রয়সূত্রে, ওয়ারিশসূত্রে কিংবা দান বা হেবামূলে অর্জিত—যেভাবেই হোক না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রের উপযুক্ত কাগজপত্র যাচাই করা আবশ্যক। কেউ যদি 'পাওয়ার অব অ্যাটর্নি' বা আমমোক্তারনামার মাধ্যমে জমি বিক্রি করতে চান, তবে সরাসরি মূল মালিকের সাথে যোগাযোগ করে তথ্যের সত্যতা যাচাই করে নেওয়া উচিত। কারণ ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি করে জমি বিক্রির অহরহ ঘটনা ঘটে। এছাড়া জমিটি সরকারি খাস, অর্পিত সম্পত্তি বা অগ্রক্রয়ের (প্রি-এম্পশন) মামলার আওতাভুক্ত কি না, তাও খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্থতাকারীদের ওপর অন্ধবিশ্বাস করা যাবে না।
নামজারি (মিউটেশন) ও প্রয়োজনীয় নথি
জমির সত্যলিপি বা পরচা (রেকর্ড অফ রাইটস) দেখে জমি ও তার দখল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তবে মালিকানার পূর্ণ বৈধতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নামজারি বা মিউটেশন খতিয়ান। এসি ল্যান্ড (AC Land) অফিস থেকে নামজারির ৩টি নথি ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে-
- নামজারি প্রস্তাবপত্র বা প্রপোজাল লেটার
- ডুপ্লিকেট কার্বন রশিদ (ডিসিআর)
- নামজারি খতিয়ান

এই নথিগুলো ছাড়া আইনগতভাবে জমির মালিকানা হস্তান্তর সম্ভব নয়।
এনওসি, দায়মুক্ত সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র
ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা এড়াতে লেনদেনের আগেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে এন.ও.সি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) এবং এন.ই.সি (নো এনকামব্রেন্স সার্টিফিকেট বা দায়মুক্ত সনদ) সংগ্রহ করা উচিত। এন.ই.সি-র মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে জমিতে কোনো দায় বা বকেয়া আছে কি না। এছাড়া হালনাগাদ খাজনার রশিদ এবং ভাড়ার রশিদ যাচাই করা প্রয়োজন। ফ্ল্যাট বা ভবন ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্ল্যান ও অনুমোদনকারী সংস্থার ছাড়পত্র দেখতে হবে। পাশাপাশি জমিতে কোনো ব্যাংক ঋণ বা মর্টগেজ রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
কাগজপত্র যত নিখুঁতভাবেই উপস্থাপন করা হোক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরজমিনে গিয়ে জমি পরিদর্শন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের চোখে জমি দেখা, স্থানীয়দের সাথে কথা বলা এবং নথিপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের পরেই লেনদেন সম্পাদন করা উচিত। একটু সচেতনতা ও সঠিক পদক্ষেপই পারে আপনাকে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি আইনি ঝামেলা ও আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।