logo

সম্পত্তি উইল বা অসিয়তের জরুরি কিছু আইনি নিয়ম

সম্পত্তি উইল বা অসিয়তের জরুরি কিছু আইনি নিয়ম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

নিজের কষ্টার্জিত সম্পত্তি মানুষের মৃত্যুর পর কার হাতে যাবে, তা নিয়ে অনেকেরই দুশ্চিন্তা থাকে। এই দুশ্চিন্তা দূর করার এবং নিজের ইচ্ছেমতো সম্পত্তির বিলি-ব্যাবস্থা করার একটি আইনি পথ হলো উইল বা অসিয়ত। তবে এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে সঠিক আইনি ধারণা না থাকায় অনেকেই জটিলতায় পড়েন। কখন উইল করা যায়, কতটুকু সম্পত্তি উইল করা সম্ভব, বা উত্তরাধিকারীদের মতামতের গুরুত্ব কতটুকু - এই সব বিষয় জানা অত্যন্ত জরুরি। চলুন আজ উইল ও অসিয়ত সম্পর্কিত মূল আইনি দিকগুলো সহজভাবে জেনে নিই।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ৩২১ ও ৩২২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘উইল বা অছিয়ত কেন, কখন, কিভাবে’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

উইল বা অসিয়ত কী

সহজ কথায়, কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় তার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির মালিকানা বা বিলি-ব্যাবস্থা সম্পর্কে যে লিখিত বা মৌখিক ইচ্ছা ব্যক্ত করেন, তাকেই উইল’ বলা হয়। মুসলিম আইনে এই ইচ্ছাপত্রকে 'অসিয়ত' বলা হয়। এটি এমন একটি অনন্য দলিল, যা কার্যকর করার জন্য রেজিস্ট্রেশনের বাধ্যবাধকতা নেই।

কতটুকু সম্পত্তি উইল করা যায়?

উইলের ক্ষেত্রে ধর্মভেদে আইনের ভিন্নতা রয়েছে। মুসলিম আইনে একজন ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ তিন ভাগের এক ভাগ (১/৩ অংশ) অসিয়ত করতে পারেন, যদি গ্রহীতা উত্তরাধিকারী না হন। তবে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কাউকে অসিয়ত করতে হলে তাদের সবার সম্মতি প্রয়োজন। অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মে একজন ব্যক্তি তার সমুদয় সম্পত্তি যে কোনো ব্যক্তিকে উইল করতে পারেন।

একটি কাল্পনিক উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরুন, রহিম মিয়া নামের একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন অসুস্থ। তার তিন বিঘা জমি আছে। তার ভাতিজা কলিমদ্দিন তার সেবা-যত্ন করে। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রহিম মিয়া তাকে এক বিঘা জমি (এক-তৃতীয়াংশ) অসিয়ত করলেন। এটি বৈধ। কিন্তু তিনি যদি তার সব জমি অসিয়ত করতে চাইতেন, তবে তা আইনত সম্ভব হতো না (উত্তরাধিকারীদের সম্মতি ছাড়া)।

পরিবর্তন ও বাতিল করার নিয়ম

উইল বা অসিয়ত চূড়ান্ত কোনো বিষয় নয়। উইলকারী জীবিত থাকা অবস্থায় যে কোনো সময় তার উইল বাতিল বা পরিবর্তন করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, কলিমদ্দিন যদি পরে রহিম মিয়ার দেখাশোনা বন্ধ করে দেয়, তবে রহিম মিয়া সেই অসিয়ত বাতিল করে অন্য কারো নামে নতুন করে অসিয়ত করতে পারেন। এক্ষেত্রে সর্বশেষ করা অসিয়তটিই বহাল থাকবে। এছাড়া, মৃত্যুশয্যায় থাকা কোনো ব্যক্তি উইল করার পর যদি সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবে তার নিজের ভবিষ্যৎ ভরণপোষণের স্বার্থে সেই উইল বাতিলের আইনি বিধান রয়েছে। এমনকি একই সম্পত্তি একাধিক ব্যক্তিকে উইল করা হলে, উইলকারীর মৃত্যুর পর সর্বশেষ যার নামে উইল করা হয়েছে, তিনিই মালিক হবেন।

রেজিস্ট্রেশন ও প্রবেট

উইল বা অসিয়ত রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক নয়। রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৮ ধারায় একে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ চাইলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করে এটি রেজিস্ট্রি বা তালিকাভুক্ত করাতে পারেন।

উইলকারীর মৃত্যুর পর উইলটি কার্যকর করার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় আইনের পার্থক্য রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে জেলা জজ আদালত থেকে উইলটি 'প্রবেট' (আদালতের মাধ্যমে প্রত্যয়ন) করিয়ে নিতে হয়। কিন্তু মুসলমানদের অসিয়তের ক্ষেত্রে প্রবেট করার প্রয়োজন হয় না। মৌখিক উইলের ক্ষেত্রে সাক্ষীদের জবানবন্দি নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) উইলের সত্যতা যাচাই করে নামজারি বা মিউটেশন সম্পন্ন করতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, উইলকারীর মৃত্যুর আগে কোনোভাবেই উইল গ্রহীতার নামে মিউটেশন করা যাবে না।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নির্বাহক বা ওসী নিয়োগ

উইলকারী চাইলে তার মৃত্যুর পর সম্পত্তি দেখাশোনা ও উইলের শর্তাবলী কার্যকর করার জন্য এক বা একাধিক ব্যক্তিকে 'নির্বাহক' বা 'ওসী' নিযুক্ত করতে পারেন। নির্বাহক নারী বা পুরুষ যে কেউ হতে পারেন। একজন মুসলমান ব্যক্তি তার উইলের নির্বাহক হিসেবে হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য যেকোনো অমুসলমান ব্যক্তিকে নিযুক্ত করতে পারেন। যদি কেউ নির্বাহক নিযুক্ত না করেই মারা যান, তবে আদালত একজন নির্বাহক নিয়োগ করবেন।

বিশেষ কিছু আইন ও সতর্কতা

অজাত শিশু: উইল করার সময় যদি গ্রহীতা জন্ম না নিয়ে থাকেন, তবে সেই উইল বৈধ হবে না। তবে ব্যতিক্রম হলো, যদি উইলের তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সেই শিশু মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়, তবে উইলটি বৈধ গণ্য হবে।

ভবিষ্যতের সম্পত্তি: উইলদাতা ভবিষ্যতে পাবেন এমন কোনো সম্পত্তি উইল করতে পারেন না। তবে 'বিকল্প উইল' বৈধ। যেমন—কেউ তার কন্যার নামে উইল করলেন, কিন্তু কন্যা তার আগেই মারা গেলে উইলের শর্ত অনুযায়ী কন্যার সন্তানরা সেই সম্পত্তি পাবেন।

গ্রহীতার মৃত্যু: উইল কার্যকর হওয়ার আগে (উইলদাতার মৃত্যুর আগে) যদি উইল গ্রহীতা মারা যান, তবে উইলটি বাতিল বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সম্পত্তি পুনরায় উইলদাতার সম্পত্তিতে পরিণত হয় এবং তার স্বাভাবিক উত্তরাধিকারীরা তা পাবেন।

নিজের সম্পত্তির সঠিক ও শান্তিপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত করতে উইল বা অসিয়ত একটি শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার। তবে এই প্রক্রিয়ার সাথে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আইনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো জড়িত। তাই একটি ত্রুটিমুক্ত উইল তৈরি করতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক আইন মেনে উইল করলে ভবিষ্যতের অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পারিবারিক বিরোধ এড়ানো সম্ভব।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।