logo

মামলা চলাকালীন জমি ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তরের নিয়ম

মামলা চলাকালীন জমি ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তরের নিয়ম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমা অত্যন্ত পরিচিত একটি চিত্র। সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্ব, ভুয়া দলিলে দখলদারি কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি নিয়ে জটিলতায় জড়িয়ে প্রতিনিয়ত হাজারও মানুষ আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছেন। তবে অনেক সময় দেখা যায়, একটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াই চলাকালেই চতুর বা প্রভাবশালী পক্ষ বিরোধপূর্ণ জমিটি গোপনে অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি, হেবা, দান বা হস্তান্তর করে ফেলে।

এতে একদিকে যেমন মূল পাওনাদার বা প্রকৃত মালিক চরম ভোগান্তিতে পড়েন, অন্যদিকে না বুঝে জমি কিনে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তৃতীয় কোনো নির্দোষ ক্রেতা। এমন পরিস্থিতে কোনো স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে আদালতে মামলা বিচারপ্রক্রিয়ায় থাকা অবস্থায় তা বিক্রি বা রূপান্তর করা কতটুকু বৈধ, সে বিষয়ে দেশের প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ১৫ নং অধ্যায়ের ৩৬৪ ও ৩৬৫ পৃষ্ঠায় ‘মামলাকৃত জমি ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে কি-না?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

মামলাধীন জমি হস্তান্তরে আইনি বাধা ও লিসপেনডেন্স নীতি

আইন বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রায়ই প্রশ্ন আসে—বিচারাধীন জমি হস্তান্তর করা যায় কি না। সাধারণত মামলার রায় বিপক্ষে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে অভিযুক্ত পক্ষ তাড়াহুড়ো করে কম দামে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা করে। তবে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ৫২ ধারা অনুযায়ী, বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন আদালতের অনুমতি ছাড়া এমন সম্পত্তি হস্তান্তর করা আইনত নিষিদ্ধ। আইনের এই সুনির্দিষ্ট নীতিকে বলা হয় ‘লিসপেনডেন্স’ (Lis Pendens) নীতি।

কমন ল’-এর অন্যতম প্রধান সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—‘মামলা চলাকালীন নতুন কোনো স্বার্থ বা অবস্থার সৃষ্টি করা উচিত নয়।’ আইন অনুযায়ী, আদালতের সম্ভাব্য রায় বা ডিগ্রি যেন কোনো পক্ষের অধিকার ক্ষুণ্ন না করতে পারে, সেজন্যই এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে।

একটি বাস্তব উদাহরণ ও মালিকানার জটিলতা

বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, কোনো প্রভাবশালী প্রতিবেশী কারও জমি জোরপূর্বক দখল করে ভুয়া দলিল বানিয়ে নিলেন। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি জমির দখল পুনরুদ্ধারে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করলেন। মামলা দীর্ঘদিন চলার সুযোগে দখলদার ব্যক্তি মূল মালিকের অগোচরে জমিটি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিলেন।

পরবর্তী সময়ে আদালতের রায় যদি মূল মালিকের পক্ষে আসে, তবে জমি পুনরুদ্ধারে জটিলতা সৃষ্টি হয়। দখলদার প্রতিবেশী বলবেন জমি বিক্রি হয়ে গেছে, আর নতুন ক্রেতা বলবেন তিনি টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন। সাধারণ মানুষের এই আইনি ভোগান্তি নিরসনেই আইনের ৫২ ধারা কার্যকর ভূমিকা রাখে।

কখন হস্তান্তর সম্ভব ও মামলার সময়সীমা

আইন অনুযায়ী, মামলা চলাকালে কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করা হলে তার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে মামলার রায়ের ওপর। তবে আদালত যদি কোনো শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেয়, তবেই কেবল তা হস্তান্তর করা সম্ভব।

আইনের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আরজি দাখিল বা আদালতের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার তারিখ থেকে শুরু করে মামলার চূড়ান্ত রায় বাস্তবায়ন, দায় পরিশোধ অথবা তামাদি মেয়াদ উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ সময়টাকেই ‘মামলা চলমান’ হিসেবে গণ্য করা হবে।

মামলাধীন কোনো জমি কেনাবেচা করা ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনের জন্যই চরম ঝুঁকির কারণ হতে পারে। আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতি এড়াতে যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি কেনার আগে তার মালিকানা ও বিচারাধীন কোনো মামলা রয়েছে কি না, তা ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।