দাদার আগে বাবা মারা গেলে কি নাতি-নাতনিরা সম্পত্তি পাবেন

দাদার আগে বাবা মারা গেলে দাদার সম্পত্তিতে নাতি-নাতনিদের অংশ থাকবে কি না—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রচলিত আইন, শরিয়া আইন এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এ বিষয়ে কী বলছে, তা নিয়েও রয়েছে নানা বিভ্রান্তি। বিশেষ করে দাদার সম্পত্তিতে এতিম নাতি-নাতনিদের অধিকার নিয়ে প্রশ্নটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ওয়ারিশদের প্রত্যেকের অংশ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই বণ্টন অনুসরণে ব্যর্থ হলে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তোমাদের অংশ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করলেন, যেন তোমরা এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাহীনতার শিকার না হও। আল্লাহ সব বিষয়ে অবগত।’ (সূরা নিসা, আয়াত: ১৭৬)। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, সমস্ত দরকারি জ্ঞানের অর্ধেকই হচ্ছে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত জ্ঞান।
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি কে পাবেন আর কে বঞ্চিত হবেন, বঞ্চিত হওয়ার কারণগুলো কী, ত্যাজ্য পুত্র-কন্যাদের সম্পত্তি প্রাপ্তিতে আইনি বাধা এবং নারীদের সম্পত্তিতে অংশ বিষয়ক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪১ ও ৪২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দাদার আগে বাবার মৃত্যুঘটে নাতিদের অংশ বনাম বাস্তবতা!’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাদার সম্পত্তিতে এতিমের অধিকারের বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে সহজে বুঝিয়েছেন।

উদাহারণে বলা হয়, রহিম সাহেব জীবিত থাকা অবস্থায় তার ছেলে করিম সাহেব মারা গেলেন। করিম সাহেবের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে, যার নাম আরিফ মিয়া। এখন দাদা রহিম সাহেব মারা গেলে তার সম্পত্তিতে নাতি আরিফ মিয়া কোনো অংশ পাবেন কি না, তা নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, আরিফ মিয়ার চাচারা তাকে তার দাদার সম্পত্তিতে প্রাপ্য বাবার অংশ থেকে বঞ্চিত করতে চান।
দাদার সম্পত্তিতে নাতি-নাতনির অংশ কীভাবে নির্ধারিত হবে?
এ ঘটনার সমাধানে বলা যায়, বিশুদ্ধ মুসলিম শরিয়া আইন অনুযায়ী দাদার আগে বাবা মারা গেলে তার সন্তানরা (নাতি-নাতনি) কোনো অংশ পাওয়ার অধিকারী হন না। কিন্তু মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৪ ধারা অনুযায়ী, দাদা জীবিত থাকা অবস্থায় বাবা মারা গেলেও মৃত ব্যক্তির সন্তানরা দাদার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হবেন।
অর্থাৎ, সন্তানরা তাদের বাবা জীবিত থাকলে যতটুকু সম্পত্তি পেতেন, সমপরিমাণ সম্পত্তি তারা পাবেন। এ ক্ষেত্রে পুত্র বা কন্যাসন্তানের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না।
বিষয়টি আরেকটি উদাহরণের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার করেছেন তিনি। আরেকটি উদাহারণে বলা হয়, জামাল সাহেবের ছয় ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের নাম রহিমা বেগম। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে রহিমা বেগম তার একমাত্র কন্যাসন্তান নোমেসা বেগমকে রেখে মারা যান। এর বেশ কয়েক বছর পর মারা যান জামাল সাহেব।
-46a437.jpeg)
ঘটনাক্রমে রহিমা বেগম মারা যান ১৯৫৫ সালে এবং তার বাবা জামাল সাহেব মারা যান ১৯৬৪ সালে। জামাল সাহেবের মৃত্যুর সময় তার ছয় ছেলে ও স্ত্রী জীবিত ছিলেন। পাশাপাশি তার নাতনি নোমেসা বেগমও জীবিত ছিলেন।
এখন জামাল সাহেবের সম্পত্তি বণ্টনের সময় নোমেসা বেগম নাতনি হিসেবে তার মায়ের অংশের সম্পত্তি দাবি করলে তার ছয় চাচা ও নানা জামাল সাহেবের বিধবা স্ত্রী তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলতে পারেন, নোমেসা বেগমের মা রহিমা বেগম ১৯৬১ সালের আগে মারা গেছেন। অর্থাৎ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ কার্যকর হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। তাই তার মেয়ে নোমেসা বেগম তার নানা জামাল সাহেবের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে অংশীদার হতে পারবেন না—এটিই ছিল তাদের আপত্তির মূল ভিত্তি।
সুপ্রিম কোর্টের রায় কী বলছে?
এ ধরনের জটিল আইনি গোলকধাঁধা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। ‘শেখ ইব্রাহীম ও অন্যান্য বনাম নাজমা বেগম’ [৪৪ ডিএলআর (এডি), ২৭৬ পৃষ্ঠা] মামলায় বলা হয়েছে - মৃত ব্যক্তির কন্যাসন্তান ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার আগে নাকি পরে মারা গেছেন, তা এখানে মুখ্য নয়; বরং সাকসেশন (উত্তরাধিকার) কখন উন্মুক্ত হয়েছে, সেটিই মৌলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু জামাল সাহেব ১৯৬৪ সালে মারা গেছেন, অর্থাৎ ১৯৬১ সালের আইন কার্যকর হওয়ার পর তার মৃত্যুর তারিখ থেকে সাকসেশন উন্মুক্ত হয়েছে, তাই নাতনি নোমেসা বেগম তার মা রহিমা বেগম বেঁচে থাকলে যতটুকু সম্পত্তি পেতেন, ঠিক সমপরিমাণ সম্পত্তি নানা জামাল সাহেবের উত্তরাধিকার হিসেবে পাবেন।
ইসলামী শরিয়া আইন বনাম মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১
আইনি ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক আইয়ুব খানের শাসনামলে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
তা হলে দাদার জীবদ্দশায় পিতা মারা গেলে চাচাদের উপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা দাদার মিরাস বা উত্তরাধিকার পাবেন কি না?

এই আইনের ৪ নম্বর ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে- যার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে বণ্টিত হবে, তার আগে তার কোনো পুত্র বা কন্যা মারা গেলে এবং ওই ব্যক্তির মৃত্যুর সময় ওই মৃত পুত্র বা কন্যার কোনো সন্তানাদি থাকলে, তারা প্রতিনিধিত্বের হারে সম্পত্তিতে ঠিক সেই অংশটিই পাবেন, যা তাদের পিতা অথবা মাতা জীবিত থাকলে পেতেন।
তবে প্রচলিত এই আইনের বিপক্ষে ইসলামী চিন্তাবিদ ও ফকিহদের অবস্থান রয়েছে। তাদের মতে, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের এই ৪ ধারাটি শরিয়ত পরিপন্থী। কোরআন-হাদিস ও ইজমায়ে সাহাবার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে তৎকালীন আইয়ুব সরকার এটি প্রণয়ন করেছিল। তবে স্বাধীন বাংলাদেশেও এই আইনটি বহাল রয়েছে।
শরিয়তের মূল বিধান অনুযায়ী, দাদার জীবদ্দশায় পিতা মারা গেলে চাচাদের উপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা দাদার মিরাস পান না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইন (১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ) অনুযায়ী নাতি-নাতনিরা তাদের পিতা বা মাতার প্রাপ্য সম্পূর্ণ অংশ পেয়ে থাকেন।
লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।



