নাবালক ও মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির সম্পত্তি কে বিক্রি করতে পারবেন

নাবালক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির সম্পত্তি কি নিজের ইচ্ছায় বিক্রি করা যায়? নাবালকের পক্ষে কে সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রয় করতে পারেন? কে হবেন নাবালকের অভিভাবক এবং কোন পরিস্থিতিতে আদালত অভিভাবক নিয়োগ করবেন? এসব বিষয় নিয়ে রয়েছে নির্দিষ্ট আইনি বিধান।
১৯৭৫ সালের সাবালকত্ব আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো ব্যক্তি নাবালক। ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন এবং ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের বিধান অনুযায়ী, নাবালক নিজে কোনো সম্পত্তি বিক্রি করতে বা কোনো চুক্তি করতে পারেন না। এ ছাড়া ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৫ ধারা অনুযায়ীও কোনো নাবালক দলিল সম্পাদন করতে পারেন না।

নাবালক ও মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির সম্পত্তি প্রাপ্তিতে আইনি বাধা এবং সম্পত্তিতে অংশ বিষয়ক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৩,৪৪ ও ৪৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘নাবালক ও পাগলের সম্পত্তির অংশ, ক্রয়-বিক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তবে নাবালকের পক্ষে তার বাবা, মা কিংবা অন্য কোনো অভিভাবক সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। বাবা নাবালকের স্বাভাবিক অভিভাবক। তাই তাকে আলাদাভাবে নাবালকের অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ নিতে হয় না। নাবালকের পক্ষে কোনো কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বাবাকে আদালতের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।
তবে বাবা ছাড়া অন্য কেউ নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে প্রথমে আদালতের মাধ্যমে অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ পেতে হয়। ১৮৭৫ সালের মেজরিটি অ্যাক্টে জেলা জজকে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ান অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্টের ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নাবালকের অভিভাবক নিয়োগের জন্য আদালতে আবেদন করতে হয়। আদালত সেই আবেদন পরীক্ষা করে প্রয়োজন মনে করলে নাবালকের কল্যাণের জন্য অভিভাবক নিয়োগ করতে পারেন।
আদালত যাকে অভিভাবক নিয়োগ করবেন, তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক দিতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে ১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী অনুমোদিত ফরমে তা করতে হবে। আদালত নাবালকের অভিভাবক নিয়োগ না করলে নাবালকের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হলেই তিনি সাবালক হিসেবে গণ্য হবেন। তাই নাবালকের পক্ষে তার সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রেও যথাযথ অনুমতির প্রয়োজন হয়।
কোনো মানসিক প্রতিবন্ধী বা পাগলের সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রেও একইভাবে আদালতের অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে নির্বোধ, উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ বলতে যেকোনো বয়সের ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়েছে। তবে নাবালকের অনুকূলে বা বরাবরে, অর্থাৎ নাবালকের নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আইনে কোনো বিধিনিষেধ নেই।

অর্থাৎ, কোনো অভিভাবক নাবালকের পক্ষে সম্পত্তি কিনলে তা বৈধ বলে বিবেচিত হবে। কোনো ব্যক্তি নাবালকের কাছে সম্পত্তি বিক্রি করার পর নাবালকত্বের অজুহাতে সেই বিক্রি অস্বীকার করতে পারবেন না। সুতরাং একজন নাবালক হস্তান্তরগ্রহীতা হতে পারেন, কিন্তু দাতা হতে পারেন না। দাতা হতে হলে যথাযথ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তার পক্ষে তার অভিভাবক সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন।
কে হবেন নাবালকের অভিভাবক
অভিভাবক হিসেবে যেসব ব্যক্তির আইনগত স্বীকৃতি রয়েছে, তারা হলেন বাবা, মা কর্তৃক উইলের মাধ্যমে নিয়োগকৃত ব্যক্তি, দাদা এবং দাদা কর্তৃক উইলের মাধ্যমে নিয়োগকৃত ব্যক্তি। আপন ভাই, রক্তসম্পর্কীয় ভাই, আপন ভাইয়ের ছেলে, রক্তসম্পর্কীয় ভাইয়ের ছেলে কিংবা বাবার আপন ভাইয়ের ছেলেকেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
কোনো আত্মীয় না থাকলে আদালত তার স্ববিবেচনামূলক ক্ষমতাবলে নাবালক, নির্বোধ, উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির অভিভাবক হিসেবে যেকোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগ করতে পারে।
মুসলিম আইনে বাবা সন্তানের স্বাভাবিক আইনগত অভিভাবক। মুসলিম আইনে মা সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক হতে পারেন না। তবে মা ৭ বছর বয়স পর্যন্ত পুত্রসন্তানকে এবং বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত কন্যাসন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেন। এ অধিকারকে হিজানা বা জিস্মাদারিত্ব বলা হয়।
তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে মা অভিভাবকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। যেমন, মা যদি দেখেন সন্তানের প্রকৃত অভিভাবক ঠিকমতো দেখাশোনা করছেন না বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাহলে সন্তানের কল্যাণের জন্য সন্তান তার কাছে থাকা উচিত, এই মর্মে অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠার আবেদন করতে পারেন।
কখন আদালত অভিভাবক নিয়োগ করেন
কোনো নাবালকের স্বাভাবিক অভিভাবক থাকলে আদালতের মাধ্যমে আলাদা করে অভিভাবক নিয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে স্বাভাবিক অভিভাবক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, তার মৃত্যু হলে কিংবা অভিভাবকত্বের অধিকার নিয়ে মা-বাবা, দাদা বা নানি-নানার মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
একইভাবে সন্তানের অভিভাবকত্ব দাবি করে একাধিক আবেদন জমা পড়লেও আদালত সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এরপর নাবালকের কল্যাণের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত ব্যক্তিকে অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ করা যায়।

সন্তানের সম্পত্তির অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইনেও বিভিন্ন ধরনের অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো আইনগত অভিভাবকআইনগত অভিভাবক কখন সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন
নাবালকের খাদ্য, বস্ত্র বা লালন-পালনের মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে নাবালকের জিনিসপত্র ও অস্থাবর সম্পত্তি আইনগত অভিভাবক বিক্রি বা বন্ধক দিতে পারেন।
এ ছাড়া একজন আইনগত অভিভাবক নির্দিষ্ট কিছু কারণে নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন। যেমন-
- ক্রেতা দ্বিগুণ মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকলে।
- সম্পত্তিটি ধ্বংসের পথে থাকলে।
সম্পত্তির ব্যয় যদি তার আয়কে ছাড়িয়ে যায়। তবে এ ধরনের বিক্রয় নাবালকের ভরণপোষণ, উইলের দাবি পরিশোধ, ঋণ বা ভূমি কর পরিশোধের জন্য করা যেতে পারে।
সম্পত্তি অন্যভাবে গ্রাস হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে।
এরপর রয়েছে আদালত কর্তৃক নিয়োগকৃত অভিভাবক। আইনগত অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে সন্তানের সম্পত্তির তত্ত্বাবধানের জন্য আদালত কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। তবে আদালতের অনুমতি ছাড়া এই অভিভাবক নাবালকের স্থাবর সম্পত্তির কোনো অংশ বন্ধক দিতে বা বিক্রি, দান, বিনিময় কিংবা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করতে পারবেন না।
কার্যত অভিভাবক কারা
তৃতীয় ধরনের অভিভাবক হলেন কার্যত অভিভাবক। কোনো ব্যক্তি আইনগত অভিভাবক কিংবা আদালত কর্তৃক নিয়োগকৃত অভিভাবক না হলেও স্বেচ্ছায় নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির দায়িত্ব নিতে পারেন। এ ধরনের অভিভাবককে কার্যত অভিভাবক বলা হয়।
একজন কার্যত অভিভাবক নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক মাত্র। তিনি নাবালকের স্থাবর সম্পত্তির কোনো স্বত্ব, স্বার্থ বা অধিকার হস্তান্তর করতে পারেন না। তিনি তা করলে সেই হস্তান্তর বাতিল হবে। মা, চাচা, ভাই, শ্বশুর প্রমুখ কার্যত অভিভাবক হতে পারেন। সন্তানের ক্ষেত্রে বাবার বংশের লোকদের ওপর প্রথমে দায়িত্ব ন্যস্ত হবে।
তারা ব্যর্থ হলে মায়ের বংশের আত্মীয়রা নাবালকের বিবাহ চুক্তি সম্পাদনের দায়িত্ব পেতে পারেন।

১৮৯০ সালের গার্ডিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্টের ১৭(ক) ধারার অধীনে নাবালকের অভিভাবক হিসেবে নিয়োগের জন্য শুধু নিকটাত্মীয় বা প্রিয়জনই নন, নাবালকের যেকোনো আত্মীয় বা বন্ধুও পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে পারেন।
আদালত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করে অভিভাবকত্ব নির্ধারণ করতে পারেন। যেমন-
- নাবালকের কল্যাণ।
- নাবালকের বয়স, লিঙ্গ ও ধর্ম।
- আবেদনকারী অভিভাবকের চরিত্র ও আর্থিক সক্ষমতা এবং নাবালকের সঙ্গে তার গোত্র-সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা।
- বাবা-মায়ের কেউ মারা গেলে মৃত ব্যক্তির অভিমত বা ইচ্ছা, অর্থাৎ সন্তান কার কাছে মানুষ হবে।
- নাবালক বা তার সম্পত্তির অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সঙ্গে নাবালকের সম্পত্তির অতীত বা বর্তমান সম্পর্ক।
- নাবালকের নিজস্ব ইচ্ছা, যদি তার অভিভাবক নির্বাচনের মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা থেকে থাকে।
পিতা কখন সন্তানের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য
মুসলিম আইনে একজন বাবা তার নাবালক পুত্র-কন্যার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। তবে পুত্রসন্তান বয়ঃসন্ধিতে পদার্পণ করার পর থেকে বাবা-পুত্রের ভরণপোষণ দিতে আর বাধ্য নন। কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা তার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকে।
বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকেও বাবা ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। তবে বিধবা পুত্রবধূর ভরণপোষণ দিতে তিনি বাধ্য নন।
কোনো বাবার যুবক সন্তান পঙ্গু বা অসমর্থ হয়ে থাকলে বাবা তাকে ভরণপোষণ প্রদান করবেন। অন্যদিকে, নাবালক পুত্র ও অবিবাহিত কন্যা যৌক্তিক কারণ ছাড়া বাবার কাছ থেকে পৃথকভাবে বসবাস শুরু করলে বাবা সে ক্ষেত্রে তাদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন।
যে শিশুর নিজস্ব সম্পত্তি রয়েছে, বাবা তার ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।
তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।



