logo

চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিলে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন

চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিলে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

আমাদের সমাজে গ্রাম কিংবা শহর, সবখানেই জায়গা-জমি ও সীমানা সংক্রান্ত বিরোধ অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে, প্রতিবেশীদের মধ্যে চলাচলের রাস্তা, আলো-বাতাসের অধিকার কিংবা সাধারণ ব্যবহারের জমি নিয়ে মতবিরোধ থেকে প্রায়শই বড় ধরনের অমীমাংসিত আইনি জট তৈরি হয়। বহু বছর ধরে নিশ্চিন্তে যে পথ দিয়ে যাতায়াত করছেন, হঠাৎ একদিন দেখা গেল প্রতিবেশী সেই পথের ওপর বেড়া দিয়ে, দেয়াল তুলে কিংবা গর্ত খুঁড়ে আপনার পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প পথ ব্যবহার করার অনুচিত শর্ত চাপানো হয় অথবা মোটা অঙ্কের টাকায় জমি কিনে নেওয়ার চাপ দেওয়া হয়।

এ ধরনের আকস্মিক বাধাদানের ফলে ভুক্তভোগী পরিবারটি দৈনন্দিন যাতায়াত, সন্তানদের স্কুলে যাওয়া, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে চরম বিপাকে পড়ে। সামাজিকভাবে বিষয়টির সুরাহা না হলে মানসিক চাপ ও অশান্তির সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে মারামারি কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দিকে রূপ নেয়। তবে আইন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে অনেকেই অসহায় বোধ করেন এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রতিবেশীর অন্যায় দাবি মেনে নেন। প্রকৃতপক্ষে, দেশের প্রচলিত দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে ব্যক্তির পথ ব্যবহারের মৌলিক অধিকার রক্ষায় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, কার্যকর ও কঠোর প্রতিকারের স্পষ্ট বিধান রয়েছে।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ঊনবিংশ অধ্যায়ের ৪২০ ও ৪২১ পৃষ্ঠায় ‘প্রতিবেশী বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা না দিলে আইনি প্রতিকার কী?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ফৌজদারি প্রতিকার: দ্রুত পদক্ষেপ ও শান্তি রক্ষা

যাতায়াতের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে গেলে শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিকারের জন্য ফৌজদারি আদালতের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে দ্রুততম উপায়।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৭ ধারা: এটি রাস্তার বিরোধ নিষ্পত্তিতে অত্যন্ত কার্যকর একটি ধারা। পথ ব্যবহারের অধিকার নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে এবং শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে ভুক্তভোগী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন। ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করে যদি দেখেন যে বাদীর ওই রাস্তা ব্যবহারের অধিকার রয়েছে, তবে তিনি বিবাদীকে পথ উন্মুক্ত রাখা এবং ভবিষ্যতে বাধা না দেওয়ার নির্দেশ দেবেন। শুধু রাস্তা নয়; মসজিদে নামাজ পড়া, পুকুরে গোসল করা কিংবা নদীতে মাছ ধরার মতো সাধারণ অধিকার নিয়ে গোলযোগ হলেও ম্যাজিস্ট্রেট এই ধারায় প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারেন।

দণ্ডবিধির ৩৪১ ধারা (অন্যায়ভাবে বাধাদান): কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে (যেমন: দেয়াল তুলে, বেড়া দিয়ে বা গর্ত খুঁড়ে) কারো একমাত্র যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেন, তবে তা অন্যায়ভাবে বাধাদানের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এটি একটি আমলযোগ্য অপরাধ। ভুক্তভোগী এ বিষয়ে সরাসরি থানায় এজাহার দিতে পারেন অথবা আদালতে সি.আর (C.R) মামলা দায়ের করতে পারেন। অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড, ৫০০ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

দেওয়ানি প্রতিকার: স্থায়ী অধিকার ও আদালতের ডিক্লারেশন

স্থায়ীভাবে চলাচলের পথ এবং আলো-বাতাসের অধিকার ফিরে পেতে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা (সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৫৫ ধারা): রাস্তা যদি ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে শুধু সাধারণ নিষেধাজ্ঞায় সুফল পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে ‘বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা’ (Mandatory Injunction) প্রার্থনা করতে হয়। আদালত নির্দেশ দিলে বিবাদীকে নিজ খরচে সেই দেয়াল বা বেড়া ভেঙে ফেলে রাস্তাটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে।

অধিকারের ঘোষণা (সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা): সংক্ষুব্ধ পক্ষকে শুধু নিষেধাজ্ঞা চাইলেই চলবে না, বরং সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী উক্ত পথ ব্যবহারে নিজের আইনগত অধিকার রয়েছে মর্মে আদালতের ডিক্লারেশন বা ঘোষণা চাইতে হবে।

‘সুখাধিকার’ ও ‘আবশ্যিক সুখাধিকার’-এর আইনি শর্তাবলি

তামাদি আইনের ২৬ ধারা (সুখাধিকার/Easement Right): কোনো ব্যক্তি বা তার পূর্বসূরিরা যদি টানা ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জমি বিনা বাধায়, প্রকাশ্যে এবং অধিকার হিসেবে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করে থাকেন, তবে তিনি ওই পথের ওপর আইনগত ‘সুখাধিকার’ অর্জন করেন। (জমিটি সরকারি হলে টানা ৬০ বছর ভোগের প্রমাণ থাকতে হবে)।

ইজমেন্ট অ্যাক্টের ১৩ ধারা (আবশ্যিক সুখাধিকার): কোনো বাড়িতে ঢোকার বা বের হওয়ার যদি একটি মাত্রই পথ থাকে এবং কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকে, তবে ২০ বছর ব্যবহার না করলেও বাদী ‘আবশ্যিক সুখাধিকার’ (Easement of Necessity) দাবি করতে পারেন। আইনি লড়াইয়ে এটি অত্যন্ত শক্তিশালী পয়েন্ট।

বিশেষ সতর্কতা

আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে পথটি সাধারণ যাতায়াত বা মালামাল আনা-নেওয়ার কাজেই ব্যবহৃত হতো। পথটি যদি জুয়া, পতিতাবৃত্তি বা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে তা সুখাধিকার হিসেবে গণ্য হবে না। এ ছাড়া সাধারণ বসতবাড়ির পথে ভারী ট্রাক বা বাণিজ্যিক যানবাহন চলাচল করালেও তা পদাধিকার বা সুখাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে না।

প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা সামাজিক জীবনের অন্যতম শর্ত হলেও নিজের আইনগত অধিকার ছেড়ে দেওয়া অনুচিত। না জেনে আইন হাতে তুলে না নিয়ে বা সহিংসতায় না জড়িয়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। দীর্ঘদিনের যাতায়াতের পথ কোনো কারণ ছাড়াই বন্ধ করে দিলে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইন ভুক্তভোগীকে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা প্রদান করে। সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়াই আপনার চলাচলের মৌলিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।