logo

বাড়ির জমি কেনার আগে করণীয়

বাড়ির জমি কেনার আগে করণীয়
জমির প্রতীকী ছবি।

বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন পূরণে জমি কেনা প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে শুধু পছন্দের জায়গা বা কম দামে জমি পেলেই তা কেনা উচিত নয়। জমির আকৃতি, অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সুবিধা থেকে শুরু করে মালিকানা ও আইনি জটিলতা—সবকিছু যাচাই করেই বাড়ি নির্মাণের জন্য জমি নির্বাচন করা জরুরি। একই সঙ্গে জমি কেনার পর ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।

জমির হিসাব, বাড়ি নির্মাণ ও এর তত্ত্বাবধানের আইন ও আইনি বাধার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন মো: শহিদুল ইসলাম (শাহীন)। তার রচিত ‘জমির হিসাব, আইন, বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ১১৯ ও ১২০ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমি নির্বাচন, ক্রয়, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘জমির হিসাব, আইন, বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমির হিসাব, আইন, বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাড়ির জমি নির্বাচনে যেসব বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে

বাড়ি নির্মাণের জন্য জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

আবাসিক প্রকল্পের জমি: সাধারণত হাউজিং সোসাইটি বা আবাসিক প্রকল্পের জমি বাড়ি নির্মাণের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। এসব এলাকায় পরিকল্পিত রাস্তা ও বসতবাড়ির পরিবেশ থাকায় নির্মাণকাজও সহজ হয়। অন্যদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অনেক সময় আকারবিহীন হওয়ায় বাড়ির পরিকল্পনা অনুযায়ী নকশা করা কঠিন হয় এবং জমির কিছু অংশ অকেজো থেকে যেতে পারে।

নাগরিক সুবিধা: জমিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন ও টেলিফোনসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা রয়েছে কি না, তা আগে নিশ্চিত হতে হবে।

জমির আকৃতি: আয়তাকার কিংবা বর্গাকৃতির জমি বাড়ি নির্মাণের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। এ ধরনের জমিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবনের নকশা করা সহজ হয়।

উঁচু ও বন্যামুক্ত জমি: বন্যার ঝুঁকি রয়েছে এমন নিচু জমির পরিবর্তে উঁচু ও বন্যামুক্ত জমি নির্বাচন করা ভালো।

প্রশস্ত ও ব্যবহারযোগ্য রাস্তা: জমির সঙ্গে এমন রাস্তা থাকা প্রয়োজন, যাতে অ্যাম্বুলেন্স, দমকলের গাড়ি ও নির্মাণসামগ্রী বহনকারী ট্রাক সহজে চলাচল করতে পারে।

আশপাশের পরিবেশ: জমির চারপাশে ভালো পরিবেশ ও পরিকল্পিত ভবন রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। আশপাশের পরিবেশ ভবিষ্যতে বসবাসের স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বাড়ি নির্মাণে জমি কেনার সময় যেসব বিষয় যাচাই করবেন

বাড়ি নির্মাণের জন্য জমি কেনার আগে শুধু জমির অবস্থান দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। মালিকানা ও আইনি বিষয়গুলোও যাচাই করা জরুরি।

আবাসিক প্রকল্পে অবস্থান: জমিটি কোনো আবাসিক প্রকল্পে হলে তা সুবিধাজনক কি না, যাচাই করে নিতে হবে।

শরিক বা অংশীদার আছে কি না: জমিটির অন্য কোনো শরিক বা অংশীদার রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।

মৌজা ও অবস্থান যাচাই: মৌজা ম্যাপ ও সংশ্লিষ্ট নথি দেখে জমিটির সঠিক অবস্থান ও ঠিকানা নির্ণয় করতে হবে।

মামলা রয়েছে কি না: জমিটি নিয়ে কোনো মামলা বা আইনি বিরোধ রয়েছে কি না, তা খোঁজ নিতে হবে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মালিকানার ধারাবাহিকতা: সিএস খতিয়ান থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত জমিটির মালিকানার ধারাবাহিকতা ঠিক আছে কি না, যাচাই করতে হবে।

খারিজ বা নামজারি: জমিটির খারিজ বা নামজারি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।

রেজিস্ট্রি ও দখল: জমি রেজিস্ট্রি করার পর দ্রুত দখল বুঝে নিয়ে নামজারি বা খারিজ সম্পন্ন করা উচিত।

বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন

জমি কেনার পর ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা ও নির্মাণমানের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে বহুতল ভবন নির্মাণে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মাটি পরীক্ষা: বহুতল ভবন নির্মাণের আগে অবশ্যই মাটির (সয়েল) পরীক্ষা করতে হবে। মাটির ধরন ও ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ভবনের ভিত্তি ও কাঠামোর পরিকল্পনা করা জরুরি।

মাটি ভরাট: প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে মাটি ভরাট করে তা যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে।

স্থাপত্য নকশা: নিজের প্রয়োজন ও জমির ধরন অনুযায়ী অভিজ্ঞ আর্কিটেক্টের মাধ্যমে ভবনের নকশা তৈরি করতে হবে।

নকশার অনুমোদন: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, যেমন পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে।

বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ: অনুমোদিত নকশা ও প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড মেনে বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করতে হবে।

কিউরিং: নির্মাণকাজে ইট ও খোয়া পর্যাপ্ত পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে। গাঁথুনি, ঢালাই ও আস্তরের কাজে নিয়ম অনুযায়ী পানি দিয়ে কিউরিং করতে হবে।

রং করার আগে দেয়াল শুকানো: আস্তরের কাজ শেষ হওয়ার পর দেয়াল ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে রং করতে হবে।

মানসম্মত কাঠ ব্যবহার: ভবনের বিভিন্ন কাজে প্রয়োজন অনুযায়ী ভালো মানের কাঠ ব্যবহার করতে হবে।

মানসম্মত বালু ও ইট: নির্মাণকাজে নির্ধারিত মানের বালু ব্যবহার করা জরুরি। কোনো অবস্থাতেই নিম্নমানের বা দুই নম্বর-তিন নম্বর ইট ব্যবহার করা উচিত নয়।

সিমেন্ট ও রড: অনুমোদিত নকশা ও প্রকৌশলীর পরামর্শ অনুযায়ী সিমেন্ট ও রড ব্যবহার করতে হবে।

পানি নিষ্কাশন: পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী মোটা ও উপযুক্ত পাইপ ব্যবহার করা ভালো।

বাথরুমের দরজা: বাথরুমের জন্য প্লাস্টিকের দরজা ব্যবহার করা যেতে পারে।

গ্লাস ও থাই: বহুতল ভবনে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লাস ও থাই ব্যবহার করা যেতে পারে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম: বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে শুধু কম দাম বিবেচনা না করে মান ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পানির ট্যাংক: পানির ট্যাংকের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ট্যাংক ব্যবহার করা যেতে পারে।

ঢালাইয়ের সময় যন্ত্রপাতি: বড় ধরনের ঢালাইয়ের কাজে মিক্সার মেশিন ও ভাইব্রেটর মেশিন ব্যবহার করতে হবে, যাতে নির্মাণকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা যায়।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ: বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের পরও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিবছর রং করা এবং ছোটখাটো সংস্কার করা উচিত।

প্রকৌশলী ও সার্ভেয়ার: বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের সময় একজন আমিন-সার্ভেয়ার এবং একজন সাইট ইঞ্জিনিয়ার থাকা ভালো। এতে জমির পরিমাপ ও নির্মাণকাজের তদারকি যথাযথভাবে করা সম্ভব হয়।

ভূমিকম্প প্রতিরোধ ব্যবস্থা: ভবন নির্মাণের সময় ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কি না, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

অগ্নিনিরাপত্তা: ভবনে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ও অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা রাখতে হবে।

আইন ও করসংক্রান্ত পরামর্শ: বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী একজন আইন উপদেষ্টা, কর উপদেষ্টা ও সাইট ম্যানেজার থাকলে কাজের সমন্বয় ও তদারকি সহজ হয়।

বাড়ি নির্মাণের জন্য জমি কেনার ক্ষেত্রে তাই শুধু জমির দাম বা অবস্থান নয়, ভবিষ্যৎ বসবাসের সুবিধা, জমির মালিকানা, আইনি অবস্থান, নির্মাণযোগ্যতা এবং আশপাশের পরিবেশ—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে নির্মাণের সময় মানসম্মত উপকরণ, অনুমোদিত নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

লেখক পরিচিতি

মোঃ শহিদুল ইসলাম (শাহীন) জামালপুর জেলার সদর থানাধীন দাপুনিয়া গ্রামে নানার বাড়ি আতাহের আলী সাধু মাস্টারের বাড়ীতে ১৯৭১ সালে ২৬শে মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। দাদা বাজিতুল্লাহ্ সরকার টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার মুতণ্ডী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কর্ত্তাঁ ছিলেন। পিতা- মরহুম মোকাদ্দেছ আলী বাংলাদেশ রেলওয়েতে মেডিকেল বিভাগে ফার্মাসিষ্ট হিসেবে দেশের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে চাকুরী করে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে অবসর গ্রহণ করেন। মাতা- মোছাঃ ফিরোজা বেওয়া।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তিনি দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানার রিয়াজনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী থানার মুতণ্ডী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিনাজপুর জেলার সেবাতগঞ্জ থানার সেবাতগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি, দিনাজপুর সঙ্গীত ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি, জামালপুর আশেক মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বি.এ পাশ করে জামালপুর আইন কলেজে অধ্যয়ন করেন। কম্পিউটার সাইন্স ও মেডিক্যাল সাইন্সে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ময়নামতি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে আমিন-সার্ভেয়ার ডিপ্লোমা করেন। ধানসিঁড়ি মডেল টাউনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট ও ফ্ল্যাটের ব্যবসার সাথে জড়িত। জামালপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয় পরিষদ, অপরাধ সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি এবং রোগী কল্যাণ সমিতির আজীবন সদস্য সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি বাজিতুল্লাহ্-সাধু মাষ্টার স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক। জামালপুর জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন।

তার লেখা অনেক কবিতা, গল্প, নাটক দেশের বহু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পায়। তার লেখা উপন্যাস বড় প্রেম, ফারায়েজ শিক্ষার সহজ উপায়, জমির হিসাব আইন-বাড়ী নির্মাণ ও তত্ত্বাবধান, ভূমি আইন মামলা ও রায়, কম্পিউটার শিক্ষার সহজ উপায়, সূত্রের পকেট ডায়রি, ভূমি নামজারি, দলিল লিখন পদ্ধতি ও রেজিস্ট্রেশন আইন, এফিডেবিট চুক্তিপত্র লিখন পদ্ধতি, ডিজিটাল ভূমি জরিপ, বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া আইন ও বিধি, কড়া ক্রান্তি বা ব্রিটিশ পদ্ধতি শিক্ষার সহজ উপায় এবং চেক ডিসঅনার আইন ও বিধি বই আকারে প্রকাশ করে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে বই লেখার বিশেষ অবদানের জন্য তাকে ছায়ানীত পদক ২০১৪ প্রদান করা হয়।