পর্চা, মাঠ পর্চা ও খতিয়ান—কোনটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ

জমি-জমা সংক্রান্ত কাগজপত্রের মধ্যে ‘পর্চা’ ও ‘খতিয়ান’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করতে এসব নথির প্রয়োজন হয়। আবার জরিপ চলাকালে দেওয়া ‘মাঠ পর্চা’ এবং জরিপ শেষে পাওয়া পর্চার মধ্যেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশের পরও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক কিংবা মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয় জানা তাই জরুরি।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সাবেক মহাপরিচালক এ জেড এম শামসুল আলম। তার রচিত ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইটির ১১৯, ১২০, ১২১ ও ১২২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘পর্চা’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

পর্চা বলতে কী বোঝায়
ভূমি জরিপকালে ভূমির অবস্থান, দাগ, খতিয়ান উল্লেখপূর্বক প্রজার নামসহ জমির পরিমাণ উল্লেখ করে সার্ভেয়ারগণ মালিকানা স্বত্বের যে তালিকাপত্র তৈরি করেন, তাকে পর্চা বলা যায় এবং বলা হয়। খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশ হওয়ার পর তার অনুলিপিকেও পর্চা বলা হয়।
জরিপকালীন ‘বুঝারত’ স্তরে জমির মালিককে প্রস্তুতকালীন খসড়া খতিয়ানের যে কপি দেওয়া হয়, তা হলো মাঠ পর্চা। এটা থাকে জরিপ কর্মচারীর অনুস্বাক্ষরিত। মাঠ পর্চা না বলে এ শব্দটি মাঠ খতিয়ান বলেই অধিকতর অর্থবহ হতো।
মাঠ পর্চা ও পর্চার মধ্যে পার্থক্য কী
কোনো জরিপ চলাকালে জরিপ এলাকার জমির মালিকদের মাঠে যে পর্চা ভূমি জরিপ অফিসের কর্মকর্তাগণ কর্তৃক দেওয়া হয়, সেই পর্চাকে বলা হয় মাঠ পর্চা।
এই মাঠ পর্চা পরবর্তী পর্যায়ে পরীক্ষান্তে পরিবর্তিত হতে পারে এবং হয়। জরিপ সমাপনান্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যে পর্চা জরিপ অফিস থেকে দেওয়া হয়, সেই পর্চার নাম পর্চা।
যেহেতু কোনো জেলা জরিপ কয়েক বছর যাবত চলে, তাই প্রাথমিকভাবে মাঠ পর্চা দেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষান্তে মাঠ পর্চা পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয়।
পরিবর্তন এবং সংশোধনের পর যে পর্চা দেওয়া হয়, সেটাকেই পর্চা বলা হয়। তা মাঠ পর্চা থেকে অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ।
খতিয়ান মুদ্রিত হয়ে গেলে পর্চার কী গুরুত্ব থাকে
খতিয়ান মুদ্রিত হয়ে গেলে পর্চার গুরুত্ব থাকে ইতিহাসসংক্রান্ত। খতিয়ান না পাওয়া গেলে দুর্বল বিকল্প প্রমাণ হিসেবে পর্চা দেখা যেতে পারে।
পর্চাসমূহের ধারাবাহিকতা বলতে কী বোঝায়
পর্চাসমূহের ধারাবাহিকতা বলতে নথিপত্রের ধারাবাহিকতা বা দলিলের সংযোগকে বোঝায়। যেমন—সি.এস., আর.এস., এস.এ. পর্চাকে বোঝায়।
জরিপ এবং খতিয়ানের মধ্যে পার্থক্য কী
জরিপের উদ্দেশ্য হলো সঠিক খতিয়ান তৈরি। জরিপের মাধ্যমেই খতিয়ান তৈরি হয়।
জমা খারিজ করে এবং নামজারি করে নতুন হোল্ডিং সৃষ্টি করা এবং নতুন খতিয়ান তৈরি করা যায়। এ কাজে সমগ্র দেশে বা অঞ্চলে সার্বিক বা জাতীয় বা জেলাভিত্তিক সর্বত্র একসঙ্গে খতিয়ান তৈরি করতে হলে জরিপ প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
দরখাস্তকারীদের প্রয়োজনে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে পুরোনো বড় জোত বা বড় খতিয়ান ভেঙে শরিকদের জন্য আলাদা খতিয়ান বা খাজনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

পর্চা ও খতিয়ান কোথায় যাচাই করা যায়
খতিয়ান ও পর্চার কপি থাকে জরিপ অফিসে, সহকারী ভূমি অফিসে, ভূমি অধিগ্রহণ অফিসে। ওই সব অফিস থেকে অনুলিপি নিয়ে পর্চা, খতিয়ান ইত্যাদির যথার্থতা যাচাই করা যায়। জমির দাগের নম্বর যাচাই করতে হলে মৌজা নকশা সংগ্রহ করতে হবে।
খতিয়ান চূড়ান্ত প্রকাশনার পর সংশোধন
সার্ভে অ্যান্ড সেটেলমেন্ট ম্যানুয়াল বা জরিপ ও বন্দোবস্ত নির্দেশিকা, ১৯৩৫-এর ৫৩৩ ও ৫৩৪ বিধি মতে সাধারণত করণিক বা হিসাবসংক্রান্ত ভুল, জালিয়াতি, তঞ্চকতা বা প্রতারণা বা চাতুরীজনিত ভুলের প্রমাণ সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট আবেদনের মাধ্যমে সংশোধন করা যায়।
এই সংশোধন হবে ৫৩৭ বিধি অনুসারে।
কালেক্টর কর্তৃক সংশোধন কখন হয়
সার্ভে অ্যান্ড সেটেলমেন্ট ম্যানুয়াল, ১৯৩৫-এর ৫৩৭ বিধিমতে জেলার রাজস্ব কালেক্টর বা জেলা প্রশাসক যুক্তিসংগত কারণে এবং ক্ষেত্রে রেকর্ড অব রাইটসের চূড়ান্ত প্রকাশনার পর করণিক ভুল বা হিসাবসংক্রান্ত ভুল, জালিয়াতি ও তঞ্চকতা বা প্রতারণা বা চাতুরী-সংক্রান্ত ভুল সংশোধন করতে পারেন।
রেকর্ড অব রাইটস প্রকাশনা যে চূড়ান্ত হয়েছে তার অকাট্য প্রমাণ কী
রেকর্ড অব রাইটস প্রকাশনা যে চূড়ান্ত হয়েছে তার অকাট্য প্রমাণ হলো প্রজাস্বত্ব বিধিমালা, ১৯৯৫-এর ৩৪ বিধি মতে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ।
চূড়ান্ত প্রকাশনার পর স্বত্বলিপি বা রেকর্ড অব রাইটস সংশোধনের অধিকার
রেকর্ড অব রাইটস প্রকাশনা গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়ার পরও তা সংশোধনের সুযোগ আছে। সেটা হলো দেওয়ানি আদালতে মামলা করা। রেকর্ড অব রাইটসের ভুল সংশোধনের জন্য জমির মালিক দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারেন। রেকর্ড অব রাইটস সংশোধন করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। জমি-জমা প্রায়ই বিক্রি হয়। বিক্রির পর স্বত্বলিপি সংশোধনের জন্য আদালতে যেতে হয় না। তা নামজারির মাধ্যমে সংশোধন করা যায়।
লেখকের পরিচয়
এ জেড এম শামসুল আলম
সাবেক চেয়ারম্যান, অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লি.
সাবেক মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
চেয়ারম্যান, আবুজর গিফারী সোসাইটি



