logo

প্রবাসে থেকেও দেশের জমি বিক্রি ও আইনি ঝামেলা মেটাবেন যেভাবে

প্রবাসে থেকেও দেশের জমি বিক্রি ও আইনি ঝামেলা মেটাবেন যেভাবে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

জীবিকার তাগিদে শত শত ক্রোশ দূরে প্রবাসী জীবন কাটালেও বাংলাদেশিদের নাড়ির টান থাকে প্রিয় স্বদেশের মাটিতে। প্রবাসে অর্জিত কষ্টের উপার্জনে কেনা সম্পত্তি কিংবা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জায়গা-জমি দেখাশোনা, কেনাবেচা এবং বিভিন্ন আইনি সুরক্ষা নিয়ে প্রায়শই দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের। একদিকে যেমন কাজের ব্যস্ততা ও ছুটির সীমাবদ্ধতার কারণে হুট করে দেশে ফেরা সম্ভব হয়ে ওঠে না, অন্যদিকে সঠিক তথ্যের অভাবে দেশে থাকা নিজস্ব সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার বা আইনি জটিলতায় পড়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।

তবে দেশে না ফিরেও প্রবাসে বসেই সম্পূর্ণ আইনি উপায়ে দেশের যেকোনো স্থাবর সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, কেনাবেচা কিংবা মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনার চমৎকার সুযোগ রয়েছে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ বা আমমোক্তারনামার মাধ্যমে।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে সরকার হস্তান্তরযোগ্য যেকোনো জমির দলিল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করায় প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য সঠিক নিয়মে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির চতুর্থদশ অধ্যায়ের ৩৩৩ ও ৩৩৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘বিদেশ থেকে জমি ক্রয়-বিক্রয়, আমমোক্তারনামা ও প্রাসঙ্গিকতা’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

প্রবাসে অবস্থান করে একজন ব্যক্তি দেশের যেকোনো বিশ্বস্ত প্রতিনিধিকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদান করতে পারেন।


ক্ষমতা অর্পণের কারণ

সাধারণত নিম্নলিখিত কাজগুলোর জন্য এই ক্ষমতা অর্পণ করা যায়-

  • দেশে থাকা জমি বা সম্পত্তি বিক্রয় করা।
  • ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিপরীতে স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখা।
  • জায়গা-জমি দেখাশোনা ও তত্ত্বাবধান করা।
  • থানা বা কোর্ট-কাচারিতে মামলা দায়ের ও পরিচালনা করা।
  • স্বামী বা স্ত্রীকে তালাক প্রদান সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নির প্রকারভেদ

আইন অনুযায়ী আমমোক্তারনামা প্রধানত দুই প্রকার:সাধারণ মোক্তারনামা (General Power of Attorney):এতে প্রতিনিধিকে বিস্তৃত ও ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়।

বিশেষ মোক্তারনামা (Special Power of Attorney): এটি নির্দিষ্ট কোনো একটি কাজের জন্য তৈরি করা হয়।

ধাপে ধাপে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করার আইনি প্রক্রিয়া

বিদেশে বসে দেশে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কার্যকর করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ধারাবাহিক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়-

দলিল মুসাবিদা (Drafting): প্রথমত, দেশের কোনো অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে ইংরেজিতে একটি ক্ষমতাপত্র মুসাবিদা বা ড্রাফট করিয়ে নিতে হবে।

বিদেশে প্রেরণ ও সত্যায়ন: মুসাবিদা করা দলিলটি কুরিয়ার বা অন্য কোনো মাধ্যমে বিদেশে থাকা ব্যক্তির কাছে পাঠাতে হবে। সেখানে ছবি সংযুক্ত করে প্রবাসীকে নিজ দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে উপস্থিত হতে হবে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাষ্ট্রদূত (Ambassador) বা কনস্যুলারের সামনে স্বাক্ষর করে এটি সত্যায়ন করাতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন: দূতাবাস থেকে সত্যায়িত দলিলটি দেশে থাকা নির্ধারিত প্রতিনিধির কাছে পাঠাতে হবে। প্রতিনিধিকে ৪ মাসের মধ্যে দলিলটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়ে সত্যায়ন করাতে হবে।

জেলা প্রশাসন (ডিসি অফিস) ও এসি ল্যান্ড যাচাই: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়ন শেষে এটি সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসি অফিসের রেভিনিউ শাখায় জমা দিতে হবে। ডিসি অফিস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দলিলের সত্যতা যাচাই করবে এবং জমির অস্তিত্ব ও বর্তমান অবস্থা জানতে সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড অফিসে তথ্য পাঠাবে।

স্ট্যাম্প সংযোজন ও ট্রেজারি চালান: সব তথ্য সঠিক থাকলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়নের ৩ মাসের মধ্যে ২,০০০ টাকার আঠালো স্ট্যাম্প লাগানোর আদেশ দেওয়া হবে। নির্ধারিত টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিয়ে স্ট্যাম্প সংযুক্ত করতে হবে।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি: স্ট্যাম্প লাগানোর পর ৪ মাসের মধ্যে ক্ষমতাপত্রটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করতে হবে।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল ও অন্যান্য নিয়ম

রেজিস্ট্রিকৃত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিল করতে চাইলে যে জেলার অধীনে এটি রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল, সেখানকার জেলা রেজিস্টারের কাছে আবেদনের মাধ্যমে বাতিল করা যায়। যৌথ ক্ষমতার মোক্তারনামা হলে পক্ষের যেকোনো একজনের মৃত্যুতে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হয়। উল্লেখ্য, জমি বিক্রি, রক্ষণাবেক্ষণ, বন্ধক কিংবা মামলা পরিচালনার উদ্দেশ্য অনুযায়ী পাওয়ার অব অ্যাটর্নির বিবরণ ও শর্তাবলীতে ভিন্নতা থাকে।

সঠিক আইনি পদ্ধতি না মেনে আংশিক বা ত্রুটিপূর্ণ উপায়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করলে পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা বা প্রতারণার মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাই বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের উচিত সঠিক কাগজপত্র ও নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী আমমোক্তারনামা সম্পাদন করা, যাতে স্বদেশের সম্পত্তি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।