জমির অগ্রক্রয়ের মামলা কারা করতে পারবেন, কারা পারবেন না
-43b8f5-720x405.webp)
বাংলাদেশি আইন ও ভূমির মালিকানা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অগ্রক্রয় বা প্রিয়েমশন (Pre-emption) একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সহজ কথায়, নিজের মালিকানাধীন জমির অংশ কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির পূর্বে সহ-শরিক বা প্রতিবেশীদের তা কেনার প্রথম সুযোগ দেওয়াকে আইনের ভাষায় অগ্রক্রয় বলা হয়। জমি কেনাবেচায় অপ্রত্যাশিত বহিরাগত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ রোধ এবং সম্পত্তির অংশীদারদের স্বত্ব সুরক্ষায় এই বিধান তৈরি করা হলেও, বিভিন্ন সময়ে আইনের অসচ্ছতার সুযোগে বহু ভিত্তিহীন মামলারও জন্ম হয়েছে। এ কারণে আদালতের মামলার চাপ কমাতে ২০০৬ সালসহ বিভিন্ন সময়ে আইন সংশোধনের মাধ্যমে অগ্রক্রয়ের সীমানায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে সরকার।
ফলে এখন যে কেউ চাইলেই জমি সংলগ্ন প্রতিবেশী হিসেবে অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারেন না। আপনি যদি জমি কেনাবেচা করার পরিকল্পনা করেন বা সহ-শরিকের জমি সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন, তবে আপনার স্বার্থ সুরক্ষায় জানা প্রয়োজন যে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বর্তমানে কারা অগ্রক্রয়ের মামলা করার অধিকার রাখেন, আবেদনের সময়সীমা কত এবং আদালতের নিয়মাবলী কী। নিচে এ বিষয়ে সবিস্তারে তুলে ধরা হলো।
আরও পড়ুন: জমি বিক্রিতে অংশীদারকে পাশ কাটালে কী হয়, অগ্রক্রয়ের অধিকার জানুন
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ২৭৪ ও ২৭৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘কে কে এ অধিকার প্রয়োগ করতে পারে’ ও ‘অগ্রক্রয়ের মামলা করার নিয়ম’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
কারা অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন?
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী
পূর্বে এই আইনের ৯৬ ধারা মতে বিক্রীত জমির ওয়ারিশ সূত্রে শরিক, খরিদ সূত্রে শরিক এবং সংলগ্ন জমির স্বত্বাধিকারী প্রজা অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারতেন। তবে সংলগ্ন প্রজাদের মামলার সংখ্যা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০০৬ সালের ৩৪ নম্বর আইনের মাধ্যমে ৯৬ ধারা সংশোধন করা হয়। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী সংলগ্ন স্বত্বাধিকারীর অগ্রক্রয়ের অধিকার বাতিল করা হয়েছে।

ফলে ২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শুধুমাত্র নিম্নলিখিত দুই শ্রেণির শরিকেরা এ অধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন-
- বিক্রীত জমির ওয়ারিশ সূত্রে শরিক।
- বিক্রীত জমির খরিদ সূত্রে শরিক।
মুসলিম আইন অনুযায়ী
মুসলিম আইনের ২৩১ ধারা অনুযায়ী প্রধানত তিন শ্রেণির ব্যক্তি অগ্রক্রয়ের দাবি করতে পারেন-
শাফি-ই-শরিক: সম্পত্তির সহ-অংশীদার।
শাফি-ই-খালিত: খালাস বা অনুবন্ধের অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তি (যেমন: সড়ক বা পানি নিষ্কাশনের সুবিধা ভোগকারী)।
শাফি-ই-জার: সংলগ্ন স্থাবর সম্পত্তির মালিক।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: কোনো ভাড়াটিয়া বা অবৈধ দখলদার অগ্রক্রয়ের দাবি করতে পারবেন না। ওয়াকিফ বা মতোয়ালিরও এই অধিকার নেই, কারণ ওয়াকফ সম্পত্তির মালিকানা তাদের কাছে বর্তায় না। এছাড়া বিক্রেতার জমি ও শাফির জমির মধ্যে সরকারি জমি থাকলে সংলগ্নতা বাতিল বলে গণ্য হবে।
অগ্রক্রয়ের মামলা করার সময়সীমা ও নিয়মাবলী
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী-
- জমি হস্তান্তরের তথ্য জানার বা দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার ২ মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।
- আবেদনের সাথে বিক্রয় মূল্যের ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ জমা দিতে হবে।
- বিক্রয় মূল্যের ওপর বার্ষিক ৮ শতাংশ সরল সুদ জমা দিতে হবে।
- ১৯৪৯ সালের অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী:
- দরখাস্ত জমা দেওয়ার সময়সীমা ১ মাস।
- বিক্রীত মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ জমা দিতে হয়।
আরও পড়ুন: জমির অগ্রক্রয় মামলায় আইনি জটিলতা ও হাইকোর্টের নির্দেশনা
ক্রেতা জমি কেনার পর তার কোনো উন্নয়ন বা উৎকর্ষ সাধন করলে, সেই ব্যয়ের ওপর বার্ষিক ৬.২৫ শতাংশ (সোয়া ছয় টাকা) হারে সুদ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
যেসব ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের মামলা চলবে না
আইনের শর্ত পূরণ না হলে দরখাস্ত অগ্রাহ্য হবে। এছাড়া ১৯৫০ সালের আইনের ৯৬ ধারা ও ১৯৪৯ সালের আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী নিম্নে উল্লেখিত পরিস্থিতিতে অগ্রক্রয়ের মামলা গ্রহণযোগ্য হবে না-
- বিক্রীত জমিটি যদি বসতবাড়ি হয়।
- মামলা দায়ের করার আগেই যদি জমিটি মূল বিক্রেতার কাছে পুনরায় হস্তান্তরিত হয়।
- উক্ত বিক্রয় প্রক্রিয়া যদি যোগসাজশী (Collusive) বা জাল (Fraudulent) বলে প্রমাণিত হয়।
- সম্পত্তি হস্তান্তরটি যদি বিনিময় বা ভাগবাটোয়ারা সংক্রান্ত হয়।
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে উইল বা দানমূলে হস্তান্তর হলে।
- হেবা-বিল-এওয়াজ মূলে সম্পত্তি হস্তান্তর করা হলে।
- রক্তের সম্পর্কযুক্ত তিন পুরুষের মধ্যে কোনো দান বা উইল মূলে হস্তান্তর হলে।
- মুসলিম আইন অনুযায়ী ওয়াকফ, ধর্মীয় বা দাতব্য উদ্দেশ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ করা হলে।
কোন আদালতে মামলা করবেন?
যে আদালতের 'Suit for recovery of possession' বা দখল পুনরুদ্ধারের মামলা গ্রহণের এখতিয়ার রয়েছে, কেবল সেই আদালতেই অগ্রক্রয়ের আবেদন ('Application for pre-emption') জমা দেওয়া যাবে। সহজ কথায়, সংশ্লিষ্ট জমির দখল উদ্ধারের জন্য যে আদালতে মামলা করতে হয়, অগ্রক্রয়ের মামলার জন্যও সেই আদালতেই যেতে হবে।

জমির অগ্রক্রয় আইন মূলতঃ সহ-শরিক ও প্রকৃত সত্যভোগীদের স্বার্থ সুরক্ষায় তৈরি করা হয়েছে। তবে অযথা মামলা-মোকদ্দমা এড়াতে আইনগত নিয়ম ও সময়সীমা সঠিকভাবে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। জমি কেনাবেচা বা অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগের পূর্বে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে সঠিক আইনি ধারা অনুসরণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।

