logo
Advertisement

জমির দলিলের প্রকারভেদ, কোন দলিলের কী কাজ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমির দলিলের প্রকারভেদ, কোন দলিলের কী কাজ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

বাংলাদেশে জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি বণ্টন ও ধর্মীয় কাজে সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের দলিলের প্রচলন রয়েছে। হেবা, কবলা, এওয়াজ বদল, বাটোয়ারা, অধিগ্রহণ, উইল, অসিয়ত ও দেবোত্তর দলিলের উদ্দেশ্য ও আইনি ব্যবহার এক নয়। জমি বা সম্পত্তি নিয়ে ভবিষ্যতে বিরোধ এড়াতে সংশ্লিষ্ট দলিলের ধরন, উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

Advertisement

বিশেষ করে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগাভাগি, জমি বিনিময়, দান বা সরকারি প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিক দলিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত প্রচলিত দলিলগুলোর ধরন এবং কোন দলিল কী কাজে ব্যবহৃত হয়, তা জানা প্রয়োজন। এসব বিষয় নিয়ে ‘জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ে আলোচনা করেছেন এ জেড এম শামসুল আলম।

হেবানামা দলিল কি?

হেবা শব্দের অর্থ হলো দান। কোন জমি বা সম্পত্তি দান করে যে দলিল দেওয়া হয়, ইসলামি আইনে ঐ দানপত্র দলিলকে হেবানানা বলে। হেবানামা সাধারণত মুসলিমদের মধ্যে ইসলামি আইনানুসারে সম্পাদিত হয়।

জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
জমি ক্রয়-বিক্রয়, বন্ধক’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমি বা সম্পত্তি সম্পৰ্কীয় হেবানামায় দাতার দান করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে এবং দানের প্রস্তাব করতে হবে। দান গ্রহিতা যদি সেই দান গ্রহণে সম্মত হন, তবে দান বা হেবানামা সম্পাদিত হতে পারে। হেবানামা দলিল রেজিস্ট্রির পর সম্পত্তি হস্তান্তর করা হলে হেবা কাজ সম্পন্ন হয়।

কবলা দলিল ও সাফ কবলা দলিলের মধ্যে পার্থক্য কি?

কবলা দলিল অর্থ হলো যে দলিল উভয় পক্ষ কবুল করে নিয়ে সম্পাদন করেছেন। কবলা দলিলের অপর নাম হলো সাফ কবলা দলিল।

এওয়াজ বদল দলিল কি?

দু'জন মালিকের পারস্পরিক সুবিধা স্বার্থ ও সম্মতিতে জমি অদল বদল হতে পারে। পারস্পরিক অদল বদল দলিলকে এওয়াজ বদল দলিল বলা হয়। ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান ত্যাগী হিন্দু এবং ভারত ত্যাগী মুসলমানদের মধ্যে জমি অদল বদল হতো। এ সংক্রান্ত দলিলও এওয়াজ বদল দলিল। এই দলিলকে সম্পত্তি বিনিময় দলিল বলা হয়ে থাকে।

বাটোয়ারা দলিল কি?

বিভিন্ন কারণে মালিকদের মধ্যে জমি ভাগাভাগি হয়। পরিবার প্রধানের মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগাভাগি হয়। যারা যৌথ ব্যবসা করেন, তাদের মধ্যে জমি ভাগাভাগি হতে পারে। আপসে মালিকদের মধ্যে জমি বণ্টন ও ভাগাভাগি করে যে দলিল সম্পাদন করা হয়—তাকেই বাটোয়ারা দলিল বলে।

আপসে ওয়ারিশ, বংশধর এবং যৌথ মালিকদের জমি পরস্পরের মধ্যে বাটোয়ারা বা ভাগাভাগি বা বণ্টন কীভাবে হয়?

সাধারণত পিতামাতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ সন্তান বা পরস্পরের আস্থাভাজন অন্য সন্তানের নেতৃত্বে অথবা পিতামাতার কেউ জীবিত থাকলে তার নেতৃত্বে ওয়ারিশদের মধ্যে আপসে সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়।

বাটোয়ারা দলিল রেজিস্ট্রেশন করে এই আপস বাটোয়ারা আইনগত স্বীকৃতি লাভ করে। অনেক ক্ষেত্রে বাটোয়ারা বা ভাগাভাগী প্রাথমিকভাবে মৌখিক হয়। সম্পত্তি বণ্টননামা বাস্তবায়ন এবং দখল নিয়ে সমস্যার সম্ভাবনা থাকলে আপস বণ্টননামা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করে নেওয়া যেতে পারে।

যদি আপসে ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ বা বাটোয়ারা করা সম্ভব না হয়, তাহলে কীভাবে তা করা যায়?

আপসে ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ না হলে তারা পারস্পরিক আস্থাভাজন আত্মীয়-স্বজন বা প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদেরকে সালিশ মানতে পারে। সালিশের বিচার যদি শরীকেরা মানতে না পারে, তবে আইন আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৪৫। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৪৫। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ওয়ারিশদের মধ্যে বা যৌথ মালিকদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগাভাগির জন্য ১৮৯৩ সালে বাটোয়ারা আইন পাস হয়। এই আইন অনুযায়ী কোন পক্ষ দেওয়ানী আদালত বা সিভিল কোর্টে মামলা করে জজ বা হাকিমের মাধ্যমে ওয়াকিল কমিশনারের মাধ্যমে সম্পত্তি বাটোয়ারা করে নিতে পারে।

সম্পত্তি বাটোয়ারা বা ভাগাভাগির জন্য ওয়াকিল কমিশন নিয়োগের বিধিমালা কি?

ওয়ারিশ এবং যৌথ মালিকগণ আপসে যদি সম্পত্তি ভাগ করে নিতে না পারেন, তবে তাদের কেউ ১৮৯৩ সালের বাটোয়ারা আইন অনুযায়ী দেওয়ানী আদালতে মামলা করতে পারেন আদালত শুনানীর পর কীভাবে বিভিন্ন ধরনের বা মূল্যের সম্পদ অংশীদারদের মধ্যে ভাগ হবে—ঐ সংক্রান্ত কিছু নীতিমালা অনুযায়ী ওয়ারিশগণ নিজের মধ্যে আলোচনা করে অথবা সালিশের মাধ্যমে সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নিতে পারেন।

তা যদি সম্ভব না হয়, আদালত একজন আইনজ-লইয়ারকে বাটোয়ারা সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশের জন্য ‘কমিশন’ নিয়োগ করে। এই কমিশনকে ওয়াকিল কমিশন বলা হয়। ওয়াকিল কমিশনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে আদালত ফাইনাল ভিতি জারি করে। এই ডিক্রি অনুসারে বাটোয়ারা দলিল রেজিস্ট্রি হয়।

অগ্র ক্রয় (Pre emption) কি?

১৯৫১ সালের জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে অগ্র হয় বা Pre emption ক্রয়ের বিধান রাখা হয়েছে। যে কোন এলাকায় পাড়া-পড়শি এবং আত্মীয়-স্বজন মিলে মিশে থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। তাদের মধ্যে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বহু কারণে ঝগড়া ফ্যাসাদ হওয়াও স্বাভাবিক।

কোন ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোন ব্যক্তি প্রতিবেশীদের সঙ্গে শত্রুতার কারণে অন্য এলাকায় চলে যান। স্থান পরিবর্তনের সময় তার মালিকানাধীন জমি প্রতিবেশীদের সাথে শত্রুতার কারণে এমন দুষ্ট ও সন্ত্রাসীদের নিকট বিক্রয় করে যান, যা প্রতিবেশীদের ওপর গজবস্বরূপ হতে পারে। অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়াও কোন ব্যক্তি প্রয়োজনের তাগিদে যার কাছে বিক্রয় মূল্য বেশি পান, তার কাছে জমি বিক্রয় করে যান।

যদি কোন ব্যক্তি এলাকার বাইরের বা অপরিচিত ব্যক্তিদের নিকট জমি বিক্রয় করতে চান বা জমি বিক্রয় করে দেন, তবে প্রতিবেশী কর্তৃক বিক্রেতাকে অথবা ক্রেতাকে তার ক্রয় মূল্য পরিশোধ করে সে জমি পুনঃক্রয় করে নিতে পারেন। এরূপ ক্রয়কে অগ্র হয় বা অগ্রাধিকার ক্রয় বা অগ্র হয় বা Pre-emption ক্রয় বলা হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৪৭। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-৪৭। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অগ্রক্রয় বা অগ্রাধিকার ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাকে পূর্ববর্তী ক্রেতার ক্রয়মূল্যের ওপরে বেশি মূল্য দিতে হয়। কৃষি জমির ক্ষেত্রে ১০% এবং অকৃষি জমির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য ৫% এবং অন্যান্য বিধি মোতাবেক চার্জ দিতে হয়। এরূপ অগ্রক্রয় করতে পারেন প্রতিবেশী অথবা ওয়ারিশ বা অংশীদারগণ।

অধিগ্রহণ দলিল কি?

সরকারি কাজের জন্য অথবা বৃহত্তর জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হলে জনসাধারণের জমি সরকারি হুকুমে হুকুম দখল অথবা অধিগ্রহণ করা হয়ে থাকে। এজন্য ক্রেতা মূল্য দিয়ে থাকে। এ মূল্য অবশ্য বাজার দরের থেকে কম থাকে। জমি রেজিস্ট্রেশনের ফী হলো মূল্যের ১০ ভাগের ১ ভাগ। এজন্য অনেকেই রেজিস্ট্রেশন দলিলে মূল্য কম লিখে নেন।

বেসরকারি ক্রয়-বিক্রয় এর ক্ষেত্রে জমির মূল্য কম করে লেখানো হয়। তাই Average মূল্যে জমি অধিগ্রহণ করা হলে বিক্রেতাকে ঠকতে হয়। যে দলিলের মাধ্যমে সরকার বেসরকারি জমি ক্রয় করে থাকে বা হুকুম দখল অর্থাৎ হুকুম দিয়ে দখল করে থাকে—সেই দলিলকে অধিগ্রহণ দলিল বলা হয় ।

উইল এবং অসিয়ত ও প্রভেট কি?

যে কোন ব্যক্তি তার জীবিত থাকাকালে স্বীয় সম্পত্তি দান, বিলি, বণ্টন ও ব্যবহারের জন্য যে দলিল করে যান ঐ দলিলকে উইল বলা হয়। মুসলিমগণ জীবিত থাকা কালে তার সম্পত্তি বিলি বণ্টন কালে এবং ব্যবহারের জন্য উইল করে যেতে পারেন। এই উইল কে বলা হয় অসিয়ত। উইলের ইসলামি নাম হলো অসিয়ত।

কোন হিন্দু তার জীবদ্দশায় তার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি কিভাবে ব্যবহার হবে তার নির্দেশনা দিয়ে যেতে পারেন। এই নির্দেশনা জজ কোর্ট কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে উইল নামে খ্যাত হয়। মুসলিমদের জন্য অসিয়তনামা জজ কর্তৃক প্ৰভেট করার বিধান বা প্রয়োজন নেই।

দেবোত্তর দলিল কি?

দেবতার পূজা, আরাধনা, মানব সেবা এবং অন্যান্য ধর্মীয় কাজের জন্য যে কোন হিন্দু ব্যক্তি দেবতার নামে জমি উৎসর্গ করে যেতে পারেন। দেবতার নামে সম্পত্তি উৎসর্গ করা দলিলকে দেবোত্তর দলিল বলা হয়। দেবোত্তর দলিল অনুসারে দেবতা হন জমির মালিক। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পড়ে সেবায়েতের ওপর। সেবায়েত কখনও জমির মালিক হতে পারে না।


লেখকের পরিচিতি

এ জেড এম শামসুল আলম অডিট কমিটি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান। এ ছাড়াও তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের মহাপরিচালক, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আবুজর গিফারী সোসাইটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত।