অসিয়ত করা যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

মানুষের মৃত্যুর পর পালনীয় ও করণীয় সম্পর্কে উত্তরসূরীদের প্রতি যে নির্দেশনা দিতে হয়, তাই অসিয়ত। অসিয়ত মৃত ব্যক্তি সদিচ্ছায় করতে হবে। এর জন্য তাকে জবরদস্তি করার সুযোগ নেই। অসিয়ত হতে হবে ব্যক্তির পার্থিব উপার্জন থেকে। কাউকে ঠকানোর জন্য কখনও অসিয়ত করা যাবে না। অসিয়ত কীভাবে করতে হয়, কাদের জন্য করতে হয়, ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত করা যাবে কি না—এসব বিষয় জানা আমাদের জন্য জরুরি।
ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে কোরআন-হাদিসের বিধানসহ নানা বিষয় নিয়ে ‘ফারায়েজ আইন’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন গাজী শামসুর রহমান। বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৩ থেকে ১৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘অসিয়ত বা উইল’ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
অসিয়ত নিয়ে কোরআনে যা বলা হয়েছে
আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে, যখন তোমাদের কারও সামনে মৃত্যু উপস্থিত হয় এবং সে ব্যক্তি কিছু সম্পত্তি ছেড়ে যায়, তবে সে যেন সঙ্গতভাবে অসিয়ত করে যায় বাবা-মা ও নিকট আত্মীয়দের জন্য। মুত্তাকিদের জন্য এটা একটা কর্তব্য।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮০)
এ আয়াতে বলা হয়েছে, মৃত্যুকালে বাবা-মা ও নিকট আত্মীয়দের জন্য অসিয়ত বা উইল করা অবশ্য করণীয়। আগে যেসব আয়াত আলোচনা করেছি, সেগুলো নাজিল হওয়ার আগেই এ আয়াত নাজিল হয়েছে। এ আয়াতটি যখন নাজিল হয় তখন মিরাস বা উত্তরাধিকারের আয়াত নাজিয় হয়নি। এ আয়াতকে মিরাসের আয়াত দ্বারা পূর্ণ করা হয়েছে।
কতটুকু সম্পত্তি উইল করা যায়—এ সম্পর্কে কোরআনে কিছু বলা হয়নি। মিশকাতের একটি হাদিসে দেখা যায় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত করার অনুমতি দিয়েছেন।

কার জন্য অসিয়ত করা যাবে
কোনো ব্যক্তি যেকোনো অপরিচিতের জন্য তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ অসিয়ত করতে পারেন। তিনি উত্তরাধিকারীকে উইলক্রমে কোনো সম্পতি দিতে পারেন না; তবে তিনি সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ মাত্র তার ওয়ারিশকে উইল করে দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে অন্য ওয়ারিসের সম্মতি লাগবে।
যেকোনো সুস্থমনা, প্রাপ্তবয়ষ্ক স্বেচ্ছায় তার এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি অপরিচিতদের বরাবরে উইল করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তার মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিসদের সম্মতি লাগবে না। উইলের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। লিখন, বাক্য কিংবা ইঙ্গিত দ্বারা উইল করা যায়। (তবে পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ১০৬ নম্বর আয়াতে দুজন ন্যায়-নিষ্ঠাবান সাক্ষীর উপস্থিতিতে অসিয়ত করতে বলা হয়েছে)।
যেকোনো ব্যক্তি উইল গ্রহণ করতে পারে। যেকোনো প্রতিষ্ঠান উইল গ্রহণ করতে পারে। শুধু যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অজ্ঞাত, তার সম্পর্কে উইল হয় না। উইলগ্রহীতা অমুসলমান বা বিধর্মী হলেও উইলকৃত সম্পত্তি গ্রহণে কোনো বাধা নেই।

অসিয়ত কি প্রত্যাহার করা যায়
উইলদাতা উইল প্রত্যাহার করার ক্ষমতা রাখে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, মৌখিক কিংবা লিখিতভাবে, সুস্থ অবস্থায় কিংবা মৃত্যু-পথযাত্রী শয্যাশায়ী অবস্থায় উইলদাতা উইল প্রত্যাহার করতে পারে। উইলের মাধ্যমে ওয়াকফ সৃষ্টি করা যায়। এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি উইল করা হলে ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার ওয়ারিসরা সম্মতি দিয়ে উইলকে কার্যকরী করতে পারে।
লেখকের পরিচয়
গাজী শামছুর রহমান (১৯২১-১৯৯৮) বাংলাদেশি আইনবিদ ও আইন সংস্কারক, বিচারক, ভাষাবিদ এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলায় আইনবিষয়ক গ্রন্থ রচনায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। তিনি ১৯৮৫ সালে একুশে পদক পান। তিনি জেলা জজ ছিলেন। সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন কিছুদিন।


