দান, হেবা ও উইলকৃত সম্পত্তি বাতিলের আইনি নিয়ম
-7a8543-720x405.webp)
ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দান, হেবা কিংবা উইল (অছিয়ত) অত্যন্ত পরিচিত আইনি মাধ্যম। দৈনন্দিন জীবনে পরম স্নেহে বা ভালোবাসার খাতিরে প্রিয়জন, স্বজন কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। তবে অনেক সময় দেখা যায়—যে উদ্দেশ্যে সম্পত্তিটি হস্তান্তর করা হয়েছিল, পরবর্তীতে গ্রহীতার আচরণ বা মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণে সেই উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়।
কখনো কখনো পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, অনাকাঙ্ক্ষিত পারিবারিক কলহ কিংবা প্রতারণামূলক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে দাতা তার হস্তান্তর করা সম্পদ ফেরত পেতে চান কিংবা সেই আইনি দলিলটি বাতিল করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ দাতা ঘোর আইনি অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন যে, একবার হস্তান্তরিত জমি বা সম্পত্তি কি পুনরায় নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব? বাংলাদেশের ভূমি আইন, মুসলিম আইন ও হিন্দু আইনে এই সংক্রান্ত সুস্পষ্ট বিধান ও নীতিমালা রয়েছে, যা সঠিকভাবে জানা থাকলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দশম অধ্যায়ের ৩১৮ ও ৩১৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দান, হেবা, উইল, অছিয়ত সম্পর্কিত: দান, হেবা, উইল, অছিয়ত সম্পত্তি কখন বাতিল করা যায়?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

হেবা বা দান বাতিলের নিয়মাবলী
মুসলিম আইনের ১৬৭ ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী, গ্রহীতাকে দখল হস্তান্তরের আগে যেকোনো সময় দাতা তার হেবা বাতিল করতে পারেন। কারণ দখল অর্পণ না করা পর্যন্ত আইনত দান পুরোপুরি সম্পন্ন হয় না। তবে দখল হস্তান্তরের পরেও নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে উপযুক্ত আদালতের ডিক্রি নিয়ে হেবা বাতিল করা সম্ভব।
নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলোতে আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে হেবা বাতিল হতে পারে-
- স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দানকৃত সম্পত্তির উদ্দেশ্য ব্যাহত হলে।
- রক্তসম্পর্কীয় ও নিষিদ্ধ ধাপের মধ্যে দান করা হলে (যেমন: পিতা কর্তৃক মেয়েকে দান)।
- দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে।
- দানকৃত সম্পত্তির মূল্য সময়ের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেলে।
- সম্পত্তির প্রকৃতি এমনভাবে পরিবর্তিত হলে যা আর চেনার উপায় থাকে না।
- দাতা যদি দানের বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করে থাকেন।
- গ্রহীতা কর্তৃক সম্পত্তিটি অন্য কারো কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা হলে, অথবা সম্পত্তিটি হারিয়ে গেলে বা ধ্বংস হয়ে গেলে।
উল্লেখ্য, দাতা জীবিত থাকাকালে হেবা বাতিল করতে পারলেও, দাতার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীরা উক্ত হেবা বাতিল করতে পারবেন না। এছাড়া আদালতের আদেশ ছাড়া একবার দখল হস্তান্তরিত দান বাতিল করা যায় না এবং আদালত ডিক্রি না দেওয়া পর্যন্ত গ্রহীতা তা ভোগদখল ও হস্তান্তর করতে পারবেন।
অন্যদিকে, হিন্দু আইন অনুযায়ী আইনত সম্পন্ন দান বাতিলযোগ্য নয়। তবে প্রতারণা, অবৈধ প্রভাব বিস্তার কিংবা পাওনাদারকে ঠকানোর উদ্দেশ্যে দান করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
হেবা সম্পন্নের ৩টি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত
আইন অনুযায়ী হেবা পুরোপুরি বৈধ হতে ৩টি বিষয় আবশ্যক-
- দাতার প্রস্তাব
- গ্রহীতার সম্মতি
- সম্পত্তির বাস্তব দখল হস্তান্তর।
স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে অন্তত দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে রেজিস্টার্ড দলিলের প্রয়োজন হয়, তবে অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরই যথেষ্ট। অজাত শিশুর নামে হেবা করা যায় না, তবে ভিন্ন ধর্মের মানুষকে হেবা করা আইনিভাবে বৈধ। এমনকি নামজারির (মিউটেশন) জন্য লিখিত দলিলের বাধ্যবাধকতা নেই; স্থানীয় তদন্ত ও সাক্ষীদের প্রমাণের ভিত্তিতে নামজারি সম্ভব।

একইভাবে, মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে কৃত ‘মৃত্যুশয্যাকালীন দান’-এর ক্ষেত্রেও দখল হস্তান্তরের শর্ত প্রযোজ্য। ১৯১৬ সালের ‘রফিকুল্লাহ বনাম নূরজাহান বেগম’ মামলার রায়ে উচ্চ আদালত স্পষ্ট জানান, দখল হস্তান্তর প্রমাণিত না হলে এবং দাতা সম্পত্তি নিজের দখলে রাখলে সেই হেবা বাতিল বলে গণ্য হবে।
উইল বা অছিয়ত বাতিলের বিধান
উইল বা অছিয়তের ক্ষেত্রে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের (১/৩) বেশি উইল করা যায় না; এর বেশি করা হলে অতিরিক্ত অংশ বাতিল হবে। উইলকারী নিজের জীবদ্দশায় যেকোনো সময় তার উইল বাতিল করতে পারেন। এছাড়া নতুন উইল করলে, সম্পত্তি বিক্রি বা রূপান্তর করলে, অথবা সম্পত্তিতে কোনো নতুন নির্মাণকাজ চালালে পূর্বের উইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
সম্পত্তি দান, হেবা বা উইল করা একটি সংবেদনশীল ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া। অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি জটিলতা বা পারিবারিক বিরোধ এড়াতে দাতা ও গ্রহীতা উভয় পক্ষকেই সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা ও শর্তাবলি সঠিকভাবে মেনে চলা জরুরি।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।

