সরকারি খাস জমি পেতে কোথায় আবেদন করবেন, জানুন আইনি নিয়ম ও ধাপ
-a8bcee-720x405.webp)
প্রকৃত ভূমিহীন ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে সরকারের খাস জমি বন্দোবস্ত কর্মসূচি একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ। গ্রামীণ অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করতে এবং খাস জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতি বছরই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বন্দোবস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে সঠিক তথ্য, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এবং আইনি জটিলতার ভীতি থেকে সাধারণ মানুষ প্রায়শই এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অনেক ক্ষেত্রে প্রচারের অভাব কিংবা অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র বা অবৈধ দখলদাররা খাস জমির প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা চালায়।
সরকারি নিয়ম কানুন মেনে সঠিক উপায়ে আবেদন করা থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা ভূমি অফিসের মাধ্যমে দলিল সম্পাদন, নামজারি এবং চূড়ান্তভাবে জমিতে স্বশরীরে দখল পাওয়ার প্রতিটি ধাপের একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো রয়েছে। একজন প্রকৃত ভূমিহীন নাগরিক হিসেবে আপনার প্রাপ্য অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে এবং যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক বা সামাজিক প্রতারণা থেকে সুরক্ষিত থাকতে এই প্রতিটি প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি নিখুঁতভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি। পাঠকদের জন্য সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত, আইনি অধিকার এবং ধাপে ধাপে জমি বুঝে পাওয়ার বিস্তারিত প্রক্রিয়া সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির ষোড়শ অধ্যায়ের ৩৪৪, ৩৪৫ ও ৩৪৬ পৃষ্ঠায় ‘খাস জমি বরাদ্দ পদ্ধতি ও আলোচনা’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
১. খাস জমি বন্দোবস্তের প্রচারখাস জমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়ায় ভূমিহীনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এলাকাভিত্তিক অবহিতকরণ সভার আয়োজন করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে এসব সভা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া স্থানীয় হাট-বাজারে মাইকিং বা ঢোল-সহরতের মাধ্যমেও তথ্য প্রচার করা হয়। গোপনীয়তা বা সীমিত প্রচারের মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি রোধেই এই ব্যবস্থা। এ ধরনের প্রচার বা সভা না হলে জেলা প্রশাসক কিংবা স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। সেখান থেকেও প্রতিকার না মিললে আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা বা গণমাধ্যমের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে।
২. উপজেলা কমিটির সুপারিশউপজেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে প্রাথমিক ভূমিহীন নির্বাচন ও তালিকা অনুমোদন করে। সভার কার্যবিবরণীর ভিত্তিতে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের আবেদনের ফরম পূরণ করিয়ে বরাদ্দের সুপারিশসহ ফাইল জেলা প্রশাসক অফিসে পাঠানো হয়। নির্দিষ্ট ইউনিয়নে উপযুক্ত ভূমিহীন না পাওয়া গেলে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের ভূমিহীনদের অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে। তাই নিজ ইউনিয়নের বরাদ্দ তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নজর রাখা আবশ্যক।
৩. কেস নথি সৃজন ও রেজিস্টারভুক্তকরণজেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আবেদন পাঠানোর আগে প্রতিটি আবেদনের জন্য আলাদা ‘কেস নথি’ গঠন করা হয়। এতে উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্তের কপি ও মূল আবেদনপত্র সংযুক্ত থাকে। এই নথি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ভূমি অফিসের ৮ ও ১২ নম্বর রেজিস্টারে নথিভুক্ত করতে হয়। রেজিস্টারে সঠিকভাবে তথ্য লিপিবদ্ধ না হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে আবেদনের কোনো প্রমাণ থাকে না, যার ফলে একই জমি পুনরায় অন্য কাউকে বরাদ্দ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
৪. জেলা কমিটির অনুমোদন প্রক্রিয়াসহকারী কমিশনার (ভূমি) ২১ দিনের মধ্যে কেস ফাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠাবেন এবং ইউএনও পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে তা জেলা কমিটিতে পাঠাবেন। জেলা প্রশাসক অফিসে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং আরডিসির তত্ত্বাবধানে নথিটি যাচাই-বাছাই করা হয়। জেলা কমিটির অনুমোদনের পর ৩০ দিনের মধ্যে তা পুনরায় এসি (ল্যান্ড) অফিসে ফেরত পাঠানো হয়। ফাইল দীর্ঘদিন আটকে থাকলে অবৈধ দখলদাররা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে, তাই আবেদনকারীকে নিয়মিত খবরাখবর রাখতে হবে।
৫. সেলামি ও কবুলিয়ত সম্পাদনসহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্ধারিত সেলামি (প্রতীকী ১ টাকা) আদায়ের মাধ্যমে দলিলের খসড়া বা ‘কবুলিয়ত’ প্রস্তুত করেন। খাস জমি সাধারণত স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের যৌথ নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাই কবুলিয়তে উভয়ের স্বাক্ষর প্রদান বাধ্যতামূলক।
৬. সাব-রেজিস্ট্রারে রেজিস্ট্রিপ্রস্তুতকৃত কবুলিয়তটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিয়ম মেনে রেজিস্ট্রি করিয়ে নিতে হয়। আইনগতভাবে ফি মওকুফের বিধান থাকলেও বাস্তবে রেজিস্ট্রি ফি পরিশোধের মাধ্যমে দলিলটি পাকা করে নেওয়া প্রয়োজন, কারণ রেজিস্ট্রি ব্যতীত মালিকানা দাবি করা যায় না।
৭. নামজারি (মিউটেশন) ও খতিয়ান গ্রহণদলিল Registrations সম্পন্ন হলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ১৫ দিনের মধ্যে নামজারি বা মিউটেশন সম্পন্ন করে দেবেন। এই খতিয়ানে জমিটি ‘অহস্তান্তরযোগ্য খাস জমি’ হিসেবে উল্লেখ থাকে। নির্ধারিত ২৫ টাকা ফি জমা দিয়ে মিউটেশন খতিয়ান সংগ্রহ করতে হবে। পাশাপাশি খাস খতিয়ান থেকে নাম কেটে নতুন জোত খোলা এবং দুই টাকা ফি দিয়ে মওকুফ দাখিলা সংগ্রহ করা জরুরি। ভবিষ্যৎ ভূমি জরিপের সময় মালিকানা প্রমাণের জন্য এই খতিয়ানটি সংরক্ষণ করতে হবে।
৮. আনুষ্ঠানিক দলিল ও খতিয়ান হস্তান্তরসাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একটি সুনির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মূল দলিল ও খতিয়ান তুলে দেওয়া হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত খবর বা সনদপত্র পরবর্তী সময়ে জমি হস্তান্তরের অতিরিক্ত আইনি প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
৯. চূড়ান্ত দখল গ্রহণবন্দোবস্ত প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জমির প্রকৃত দখল লাভ। অনেক ক্ষেত্রে খাস জমি স্থানীয় প্রভাবশালী বা অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই কবুলিয়ত ও মিউটেশনের ১৫ দিনের মধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক সত্যায়িত ‘লিখিত দখলনামা’ গ্রহণ করা আবশ্যক। স্থানীয় মুরুব্বি ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে জমিতে সরজমিনে দখল গ্রহণ করলে পরবর্তীতে কোনো আইনি জটিলতায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়।
সরকারি খাস জমি পাওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি ভূমিহীনদের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করার একটি অন্যতম আইনি মাধ্যম। অসচেতনতা এবং দাপ্তরিক জটিলতার কারণে যেন কোনো প্রকৃত ভূমিহীন খাস জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেজন্য প্রতিটি ধাপে সচেতন থাকা জরুরি। আইনি নিয়ম কানুন মেনে সঠিকভাবে কবুলিয়ত, নামজারি ও লিখিত দখলনামা সংগ্রহ করতে পারলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি ও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নিজ জমি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
লেখকের পরিচয়
ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।
সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্ফ’ প্রভৃতি।