খতিয়ানে নাম আছে, কিন্তু জমির মালিকানা বদলালে কী হবে

ভূমির মালিকানা, খাজনা আদায়, খাসজমি বন্দোবস্ত, নামজারি কিংবা অর্পিত সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা সবকিছুর সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত ভূমি প্রশাসন। দীর্ঘ সময় পরপর জরিপের মাধ্যমে তৈরি হওয়া খতিয়ানকে ভিত্তি করেই পরিচালিত হয় ভূমি ব্যবস্থাপনার বড় একটি অংশ। কিন্তু জরিপের পর মালিকানা পরিবর্তন, জমি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার, আদালতের রায় কিংবা সরকারি বন্দোবস্তের মতো নানা কারণে ভূমির রেকর্ডে পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। সেই পরিবর্তনকে সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াই হলো নামজারি বা মিউটেশন। একই সঙ্গে অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তি, খতিয়ানের অনুলিপি ও নকশা সংগ্রহ, ভূমি-সংক্রান্ত মামলা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির মতো বিষয়ও ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
এ সম্পর্কিত বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন অমৃত বাড়ৈ। তার রচিত ‘জমা-জমি (স্বত্ব) রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি’ বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়ে (২৪ থেকে ৩০ নম্বর পৃষ্ঠা) ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা’ শিরোনামে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রধান কাজ
দীর্ঘদিনের ব্যবধানে জরিপ বিভাগ ভূমি জরিপ করে। একবার জরিপ সম্পন্ন হওয়ার পর যে খতিয়ান তৈরি করা হয়, তার ভিত্তিতেই ব্যবস্থাপনা বিভাগ তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
ব্যবস্থাপনা বিভাগ সাধারণত যেসব কাজ করে থাকে, সেগুলো হলো—
ভূমির মালিকদের ভূমির খাজনা নির্ধারণ ও আদায়।
খাসজমি চিহ্নিতকরণ ও বন্দোবস্ত প্রদান।
অর্পিত সম্পত্তি রক্ষা করা, লিজ প্রদান বা নবায়ন করা এবং লিজের অর্থ আদায়।
সায়রাত মহাল অর্থাৎ ফেরিঘাট, হাট-বাজার, জলমহাল ইত্যাদির তথ্য সংরক্ষণ ও লিজ প্রদান।
কোনো ভূমি হস্তান্তরিত হলে গ্রহীতার নামে নামজারি করা।
ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের নিষ্পত্তি করা।
উপরোক্ত কাজগুলোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা বিভাগ আরও অনেক ধরনের দায়িত্ব পালন করে থাকে। স্বল্প পরিসরের কারণে সেসব কাজ এখানে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো না।
ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার ওপর
ভূমি ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের ওপর ন্যস্ত। জেলা প্রশাসক কালেক্টর হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করেন। তার কাজে সহায়তা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর।
জেলা প্রশাসকের এ ধরনের কাজের তদারক করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ও বিভাগীয় কমিশনার। এসব কাজের তদারকির সর্বোচ্চ দায়িত্বে রয়েছে ভূমি সংস্কার বোর্ড।
একটি জেলার প্রত্যেক থানায় ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি অফিস রয়েছে। এই অফিসটি থানা ভূমি অফিস হিসেবে পরিচিত। এর দায়িত্ব পালন করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তিনিই জেলা প্রশাসকের মুখপাত্র হিসেবে থানা পর্যায়ে ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রকৃতপক্ষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) একটি থানার স্বত্বলিপি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন। তাকে কাজে সহায়তা করেন কানুনগো। থানা ভূমি অফিসের অধীনে প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন তহসিলদার এবং এক বা একাধিক সহকারী তহসিলদার থাকেন। তহসিলদার সরাসরি গ্রামের মানুষের সঙ্গে ভূমি ব্যবস্থাপনার কাজে যুক্ত থাকেন। তারা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ বাস্তবায়ন করেন।
নতুন খতিয়ানই হয়ে ওঠে প্রধান ভিত্তি
জরিপ বিভাগ কোনো মৌজার জরিপ শেষ করার পর সংশ্লিষ্ট মৌজার খতিয়ানের কপি বিভিন্ন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরিত খতিয়ানের একটি কপি জেলা প্রশাসকের রেকর্ডরুমে, একটি কপি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের দৈনন্দিন কাজের জন্য, একটি কপি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়ে এবং একটি কপি তহসিল কার্যালয়ে রাখা হয়।
নতুনভাবে তৈরি করা খতিয়ান পাওয়ার পর পূর্বের খতিয়ানের ভিত্তিতে আর কোনো কাজ করা হয় না। তখন নতুন খতিয়ানই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অফিসের সব কার্যক্রম নতুন খতিয়ানের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
নতুন খতিয়ানের আলোকে ভূমি রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায় করা হয়। নতুন খতিয়ান চালু হওয়ার পর ধরে নেওয়া হয়, খতিয়ানে যার নাম রয়েছে তিনিই ভূমির মালিক।
জমি বিক্রি হলে কীভাবে নামজারি হয়
খতিয়ানে নাম থাকা ভূমির মালিক তার জমি অন্যের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করলে বিক্রয় বা হস্তান্তরের দলিল করতে হয় এবং সেটি রেজিস্ট্রেশনও করতে হয়। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর ক্রেতার নামে নতুন খতিয়ান খোলা বা বিদ্যমান খতিয়ানে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় মিউটেশন বা নামজারি।
জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের পর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জমি ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরের দলিল রেজিস্ট্রি করে একটি এলটি (ল্যান্ড ট্রান্সফার) নোটিশ সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়ে পাঠায়।
এই এলটি নোটিশের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সংশ্লিষ্ট ক্রেতার নামে নামজারি করেন। যে খতিয়ান থেকে জমি বিক্রি করা হয়েছে, সেই খতিয়ানেই ক্রেতার নাম অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আবার ক্রেতার নামে নতুন খতিয়ানও খোলা যায়।
কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) তার অফিসের কানুনগোর সহযোগিতায় এ কাজ সম্পন্ন করেন।
এলটি নোটিশের ভিত্তিতে সব সময় নামজারি হয় না
এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে-এলটি নোটিশের ভিত্তিতে বাস্তবে কি নামজারি করা হয়?
সাধারণত এলটি নোটিশের ভিত্তিতে সব ক্ষেত্রে মিউটেশন হয় না। এর একটি কারণ হলো, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ভূমি হস্তান্তরের দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় হস্তান্তরকারীর বিক্রয়াধিকারের বিষয়টি সব সময় গভীরভাবে যাচাই করে না। এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সচেতন থাকেন। ফলে অনেক সময় ভূমি হস্তান্তরের দলিল সম্পন্ন হলেও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিউটেশন করেন না।
এ ছাড়া এলটি নোটিশ অনেক সময় অত্যন্ত তাড়াহুড়া করে লেখা হয়। ফলে নোটিশে লেখা বিষয় অনেক ক্ষেত্রেই পড়া যায় না। এলটি নোটিশের ভিত্তিতে তহসিলদার যে তদন্ত করেন, সেখানেও অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে দেখা যায়, বাস্তবে এলটি নোটিশের ভিত্তিতে খুব কম নামজারি হয়।
আবেদন করে পরেও নামজারি করা যায়
কোনো ক্রেতা জমি রেজিস্ট্রি হওয়ার পর এলটি নোটিশের ভিত্তিতে মিউটেশন করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী যেকোনো সময় তার কেনা ভূমি মিউটেশনের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে আবেদন করতে পারেন।
নামজারির আবেদন পাওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি তদন্তের জন্য তহসিলদারের কাছে পাঠান। তহসিলদার তদন্ত করে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন। আবেদন অনুযায়ী প্রতিবেদন সন্তোষজনক মনে হলে তিনি নামজারি করেন। আর প্রতিবেদন ও অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে যদি মনে হয় আবেদনটি নামজারির উপযুক্ত নয়, তাহলে তিনি নামজারি না করার আদেশ দেন।
এসব কাজ করতে গিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর পক্ষে সব ধরনের কাগজপত্র সব সময় নিজে দেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে তাকে কানুনগো, মিউটেশন ক্লার্ক ও তহসিলদারের ওপর নির্ভর করতে হয়। একটি থানার এসব কর্মচারী দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে সংশ্লিষ্ট থানার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুচারুরূপে কাজ করতে পারেন।
খতিয়ানের অনুলিপি কোথায় পাওয়া যায়
জেলা প্রশাসকের রেকর্ডরুমে নতুন প্রাপ্ত খতিয়ান সংরক্ষণ করা হয়। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী জরিপে তৈরি খতিয়ানও সেখানে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
কোনো ব্যক্তি তার প্রয়োজনীয় যেকোনো খতিয়ানের-যেমন সিএস, আরএস বা এসএ-অনুলিপি নিতে চাইলে কালেক্টরের কাছে আবেদন করতে পারেন। সেই আবেদনের ভিত্তিতে রেকর্ডরুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহিমুহুরী নকল সরবরাহ করেন।
অর্থাৎ কেউ তার খতিয়ান হারিয়ে ফেললে বা নতুন করে খতিয়ানের অনুলিপি সংগ্রহ করতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তা নিতে পারেন। অন্য কোনো কার্যালয় থেকে খতিয়ানের সহিমুহুরী নকল সরবরাহের ব্যবস্থা নেই।
জমির রেকর্ড ভুল হলে মামলা
জরিপ বিভাগ কোনো মৌজার জরিপ শেষ করার পর বিভিন্ন বিভাগের কাছে খতিয়ান হস্তান্তর করে। একটি কপি বিজ্ঞ জেলা জজের কাছেও দেওয়া হয়।
এই খতিয়ানের আলোকে কোনো ব্যক্তি যদি দেখেন, তার জমি যথাযথভাবে তার নামে রেকর্ড হয়নি, তাহলে তিনি বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালতে সিভিল স্যুট বা দেওয়ানি মামলা করতে পারেন।
আদালত রায়ে যে ধরনের পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করবেন, সেই রায়ের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) খতিয়ানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনয়ন করবেন।
খতিয়ানের সঙ্গে নকশার সম্পর্ক
প্রত্যেকটি খতিয়ান সংশ্লিষ্ট মৌজার নকশার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চূড়ান্ত প্রকাশনার পরপরই কেউ নকশা সংগ্রহ করতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তা সংগ্র মৌজার নকশা ছাড়া খতিয়ান অনেকটাই অর্থহীন।
কোনো মৌজার জরিপকাজ শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত প্রকাশনার জন্য একটি ক্যাম্প খোলা হয়। ওই প্রকাশনা ক্যাম্প থেকে নকশা কেনা যায়।
চূড়ান্ত প্রকাশনা শেষ হলে এসব নকশা জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চূড়ান্ত প্রকাশনার পরপরই কেউ নকশা সংগ্রহ করতে চাইলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তা সংগ্রহ করতে পারেন।
তবে অনেকের সিএস বা আরএস নকশারও প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার তেজগাঁওয়ে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরে আবেদন করে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে যেকোনো নকশার ফটোকপি নেওয়া যায়। যেসব মৌজার চূড়ান্ত প্রকাশনা শেষ হয়েছে, সেসব নকশার ফটোকপি ওই কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা যায়। তবে কিছুদিন ধরে এ ধরনের নকশা সরবরাহের কাজ বন্ধ রয়েছে।
নামজারি ও জমা খারিজ কেন গুরুত্বপূর্ণ
ব্যবস্থাপনা বিভাগ নতুন খতিয়ান পাওয়ার পর সেই খতিয়ানের ভিত্তিতে কার্যক্রম শুরু করে। এই খতিয়ানই ভূমিমালিকদের ভূমিস্বত্বের প্রধান সরকারি রেকর্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
রেকর্ডে অন্তর্বর্তীকালীন পরিবর্তন, সংশোধন ও হালনাগাদ মূলত জমাখারিজ, জমা একত্রীকরণ ও নামজারির মাধ্যমে করা হয়। তাই অন্তর্বর্তীকালীন রেকর্ড পরিবর্তন, সংশোধন ও হালনাগাদের প্রক্রিয়াকে নামজারি ও জমাখারিজ বলা হয়।
যেসব কারণে নামজারি ও খারিজ করা যায়, সেগুলো হলো-
খতিয়ানে থাকা ভূমির মালিক রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর-যেমন বিক্রি, দান ইত্যাদি করলে।
ভূমির মালিক মারা গেলে তার ওয়ারিশদের নাম রেকর্ড করার জন্য।
সার্টিফিকেট মামলা বা আদালতের মামলার মাধ্যমে কোনো ভূমি নিলাম হলে।
আদালতের মামলার মাধ্যমে কোনো স্বত্ব ঘোষণা করা হলে।
সরকার কর্তৃক খাসভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হলে।
সাধারণত খতিয়ানই ভূমির মালিকের পরিচয় বহন করে। যেহেতু জরিপের কাজ দীর্ঘ ২৪-২৫ বছর পরপর সম্পন্ন হয়, এই দীর্ঘ সময়ে মালিকানা পরিবর্তন হলে সেই পরিবর্তন যেন সরকারি অফিসে সংরক্ষিত খতিয়ানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়, সে জন্যই নামজারির বিধান রাখা হয়েছে।
ভূমি ক্রয় বা অন্য কোনোভাবে মালিকানা অর্জনকারী প্রত্যেক ব্যক্তিরই যথাসময়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়ে গিয়ে নামজারি বা মিউটেশন করিয়ে নেওয়া উচিত।
মিউটেশন না করলে ভূমির খাজনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। খাজনা দেওয়ার রসিদও অনেক সময় ভূমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অনিবাসী সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক সরকারের পক্ষে এসব অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্ত ভূমিকা রাখে। তাই প্রত্যেক ভূমিমালিকের এ বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তি
সাধারণভাবে কোনো ব্যক্তি তার জমিজমা, ঘরবাড়ি ফেলে রেখে দেশ ত্যাগ করলে সেগুলো অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক সরকারের পক্ষে এসব অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির দখল নেওয়া, লিজ দেওয়া এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) জেলা প্রশাসকের পক্ষে এসব বিষয়ে কাজ করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার জন্য জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বাংলাদেশে যে পরিমাণ অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তি রয়েছে, তার কতটুকু প্রকৃতপক্ষে অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তি-এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এই সমস্যার উদ্ভব কীভাবে হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে দেশে থানা পর্যায়ে রাজস্ব কর্মকর্তা (দ্বিতীয় শ্রেণি) কাজ করতেন। একই সঙ্গে প্রত্যেক থানায় একজন কমিশনুশিমতো অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকা তৈরি করা হতো বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে সারা দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তহসিলদারেরা এসব সম্পত্তির খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্ত পত্র জারি করেছে, যাতে সংশ্লিষ্ট ভূমিমালিকেরা তাদের সম্পত্তি ফিরে পান। তবে এসব নির্দেশি অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকায় থাকলে সেটি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কেউ যদি জানতে পারেন যে তার সম্পত্তি অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকাভুক্ত, তাহলে দ্রুত জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে তা অবমুক্তরা সাধারণ ব্যক্তিদের নামজারি করিয়ে দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে নথি প্রক্রিয়াজাত করেন। এতে অনেক সময় ভালোভাবে বোঝেন না। ফলে তহসিলদার যখন বলেন যে জমির কাগজপত্রে কোনো সমস্যা বা ‘ঘাপলা’ রয়েছে, তখন ভূমির মালিক অসহায় হয়ে পড়েন। তিনি তহসিলদারকে অনুরোধ করেন, যেভাবেই হোক যেন তার নামজারি করেভিত্তিক ভিপি তহসিলদার কাজ করতেন।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে কমিশনভিত্তিক তহসিলদারেরা নিত্যনতুন অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকা তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক তালিকায় সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর দেওয়া ছিল। কে, কখন ওই স্বাক্ষর করেছেন, তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না।
ফলে তহসিলদারদের খেয়ালখুশিমতো অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকা তৈরি করা হতো বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে সারা দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক সম্পত্তি তালিকাভুক্ত হয়েছে, যদিও এসব সম্পত্তির অনেকগুলো এখনো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ভোগদখল করছেন।
শুধু তা-ই নয়, অনেক স্থানে মুসলমানদের সম্পত্তিও একইভাবে অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একবার কোনো সম্পত্তি তালিকাভুক্ত হয়ে গেলে তখন থেকেই সেটি অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তহসিলদারেরা এসব সম্পত্তির খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের ভূমিতেই পরবাসী হয়ে পড়েন।
কখনো দেখা গেছে, ভূমির প্রকৃত মালিক থাকা অবস্থাতেই সেই সম্পত্তি অন্য ব্যক্তির নামে লিজ দেওয়া হয়েছে।
এসব সমস্যা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্র জারি করেছে, যাতে সংশ্লিষ্ট ভূমিমালিকেরা তাদের সম্পত্তি ফিরে পান। তবে এসব নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ খুব কম হয়েছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে মুক্তির প্রক্রিয়া
কেউ তার সম্পত্তি অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকা থেকে মুক্ত করতে চাইলে তাকে বেশ কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় তথ্য জানা যাবে।
অবমুক্ত করার আদেশ জেলা প্রশাসক প্রদান করেন। কখনো কখনো বিভাগীয় কমিশনার বা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও যেতে হয়। বিষয়টি সর্বশেষ সরকারি আদেশের ওপর নির্ভর করবে।
এসব বিষয়ে সঠিক পরামর্শের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করাই শ্রেয়। যথাসময়ে যোগাযোগ না করলে ভবিষ্যতে অন্য কেউ ওই ভূমি লিজ নিয়ে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারেন।
এ ছাড়া কোনো সম্পত্তি অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকায় থাকলে সেটি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কেউ যদি জানতে পারেন যে তার সম্পত্তি অর্পিত ও অনিবাসী সম্পত্তির তালিকাভুক্ত, তাহলে দ্রুত জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে তা অবমুক্ত করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির অভিযোগ
দেশের অন্যান্য সরকারি বিভাগের মতো ভূমি প্রশাসনও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে নয়। ভূমি প্রশাসনের কাজে সবচেয়ে বেশি মানুষ দুর্নীতির শিকার হন মিউটেশন বা নামজারির ক্ষেত্রে-এমন অভিযোগ রয়েছে।
নামজারি করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাধারণত বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের নবীন কর্মকর্তা। ভূমির দলিলপত্র, খতিয়ান, নকশা ইত্যাদি বিষয়ে ভালোভাবে জানার আগেই তাদের এ দায়িত্ব পালন করতে হয়।
ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের কানুনগো ও তহসিলদারদের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর এই নির্ভরতার সুযোগ কানুনগো ও তহসিলদারেরা গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তারা সাধারণ ব্যক্তিদের নামজারি করিয়ে দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে নথি প্রক্রিয়াজাত করেন। এতে একজনের নামজারি করাতে অনেক অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাধারণ মানুষ এ পথে আসার অন্যতম কারণ, তারা নিজেদের কাগজপত্র অনেক সময় ভালোভাবে বোঝেন না। ফলে তহসিলদার যখন বলেন যে জমির কাগজপত্রে কোনো সমস্যা বা ‘ঘাপলা’ রয়েছে, তখন ভূমির মালিক অসহায় হয়ে পড়েন। তিনি তহসিলদারকে অনুরোধ করেন, যেভাবেই হোক যেন তার নামজারি করে দেওয়া হয়।
কিছু ক্ষেত্রে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সঙ্গে কানুনগো ও তহসিলদারদের সমঝোতার অভিযোগও রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরম অবস্থায় পৌঁছায়।
এর আগে, যখন ইউআরওরা এ দায়িত্ব পালন করতেন, তখন এসব অফিসের অবস্থা আরও খারাপ ছিল বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সে তুলনায় বর্তমান অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের আরও উন্নতি হবে।
লেখক পরিচিতি
অমৃত বাড়ৈ
চার্জ অফিসার, দিয়ারা সেটেলমেন্ট, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, তেজগাঁও, ঢাকা।
