logo
Advertisement

ভূমি জরিপের ১১ ধাপ, কোন ধাপে কী হয়

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ভূমি জরিপের ১১ ধাপ, কোন ধাপে কী হয়
ফসলি জমি। ছবি: ফ্লিকার

জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, ভুল রেকর্ড, দখল, জাল হস্তান্তর—ভূমিকে ঘিরে মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। অথচ একটি জমির মালিকানা ও সীমানা নির্ধারণে জরিপের প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। খানাপুরী থেকে তাসদিক, আপত্তি থেকে আপীল—প্রতিটি স্তরে ভূমি মালিকের সচেতন থাকা জরুরি। কারণ জরিপের সময় সামান্য অসচেতনতার খেসারত অনেক সময় সারা জীবন দিতে হয়।

এ সম্পর্কিত বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন অমৃত বাড়ৈ। তার রচিত ‘জমা-জমি (স্বত্ব) রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি’ বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে (১৫ থেকে ২৩ নম্বর পৃষ্ঠা) ‘ভূমি জরিপের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি’ শিরোনামে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘জমা-জমি (স্বত্ব) রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘জমা-জমি (স্বত্ব) রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ভূমি জরিপের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি

ভূমি আমাদের দেশের একটি মূল্যবান সম্পদ। দেশের শতকরা ৮০ জন লোকই ভূমির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। ভূমির ওপর এরূপ নির্ভরতার কারণে ভূমির মূল্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি এ দেশের জনসংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ফলে মাথাপিছু ভূমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

ভূমি প্রতিনিয়ত হস্তান্তরিত হচ্ছে। এরূপ বারবার হস্তান্তরের ফলে ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ বাড়ছে। এর মধ্যে অনেক ভুয়া হস্তান্তরও হচ্ছে। ফলে দেশে লাখ লাখ বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে যত মামলার সংখ্যা রয়েছে, তার শতকরা ৮০ ভাগই ভূমিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি। ভূমির মালিকানা কিসে পূর্ণতা পায়, তা না জানার ফলেই বেশির ভাগ বিরোধের উৎপত্তি।

প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমি মালিকানার মূল দলিল হলো খতিয়ান। এ খতিয়ান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সংরক্ষিত হয়। এ খতিয়ানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলো নকশা। এ নকশায় ভূমির চিত্র থাকে এবং প্রত্যেক ভূমিখণ্ডের একটি দাগ নম্বর থাকে। এ নকশা ও খতিয়ান কীভাবে প্রস্তুত করা হয়, তা নিচে বর্ণনা করা হলো।

জরিপ পরিচালনার দায়িত্ব যাদের

খতিয়ান ও নকশা প্রস্তুত করার দায়িত্ব জরিপ বিভাগের ওপর ন্যস্ত। প্রধান জরিপ অফিসের নাম ‘ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর’। এ অফিস ঢাকায় অবস্থিত।

এ অফিসের অধীনে আছে ১০টি জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস। অফিসগুলো হলো—

(১) নোয়াখালী, (২) কুমিল্লা, (৩) সিলেট, (৪) বরিশাল, (৫) ফরিদপুর, (৬) খুলনা, (৭) যশোর, (৮) বগুড়া, (৯) রংপুর ও (১০) টাঙ্গাইল।

প্রত্যেকটি বৃহত্তর জেলা নিয়ে এ সেটেলমেন্ট গঠিত। এছাড়াও রয়েছে ৪টা রিভিশনাল সেটেলমেন্ট অফিস। তা হলো—(১) ঢাকা, (২) ময়মনসিংহ ও (৩) পাবনা। এগুলো বৃহত্তর জেলা নিয়ে গঠিত।

আরও একটি সেটেলমেন্ট আছে, তার নাম দিয়ারা সেটেলমেন্ট। এর অফিস ঢাকায় অবস্থিত। আমাদের দেশের যেসব অঞ্চলে নদী বা সাগরের ভাঙা-গড়া আছে, সেসব অঞ্চলে কাজ করা এ বিভাগের দায়িত্ব।

একটি জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে ১ জন সেটেলমেন্ট অফিসার থাকেন। তাকে সহায়তা করেন ২ জন চার্জ অফিসার। প্রত্যেক জোনাল সেটেলমেন্টের অধীনে প্রত্যেক থানায় একটি করে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের কার্যালয় রয়েছে। এসব কার্যালয়ে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এ অফিসের প্রধান সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার। তাকে সহায়তা করেন ২ জন উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার।

প্রত্যেক রিভিশনাল সেটেলমেন্টে আছেন ১ জন সেটেলমেন্ট অফিসার ও ৪ জন চার্জ অফিসার। এছাড়া যথেষ্ট সংখ্যক সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার, উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার রয়েছেন এবং রয়েছেন অন্যান্য প্রয়োজনীয় কর্মচারী।

ঢাকায় অবস্থিত দিয়ারা সেটেলমেন্টে রয়েছে ১ জন সেটেলমেন্ট অফিসার ও ৪ জন চার্জ অফিসার। এ অফিসের অধীনে ৩টি আঞ্চলিক অফিস রয়েছে। তা হলো—রাজশাহী, নোয়াখালী ও বরিশাল। প্রত্যেক আঞ্চলিক অফিসের প্রধান চার্জ অফিসার হওয়ার কথা থাকলেও এ দায়িত্ব পালন করেন ১ জন সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার। তার অধীনে রয়েছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার ও অন্যান্য কর্মচারী।

সেটেলমেন্ট বিভাগে কর্মরত সেটেলমেন্ট অফিসারগণ বি সি এস (প্রশাসন) ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তা এবং চার্জ অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকেন বি সি এস (প্রশাসন) ক্যাডারের মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা। এছাড়াও প্রত্যেক সেটেলমেন্টে ১ জন ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা রয়েছেন। সে পদটির নাম ‘সদর সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার’। তিনিও বি সি এস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।

ঢাকায় অবস্থিত ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের প্রধান হচ্ছেন বি সি এস (প্রঃ) ক্যাডারের সিনিয়র (যুগ্ম সচিব বা অতিরিক্ত সচিব) কর্মকর্তা। তাঁকে সহায়তা করেন পরিচালক (ভূমি রেকর্ড), পরিচালক (জরিপ) ও পরিচালক (প্রশাসন)। এঁরা সকলেই বি সি এস প্রশাসন ক্যাডারের সিনিয়র (উপ-সচিব বা যুগ্ম সচিব) কর্মকর্তা। পরিচালকবৃন্দের অধীনে আছেন কয়েকজন উপ-পরিচালক। এরা সকলেই উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

এ সকল ১ম শ্রেণির কর্মকর্তা ছাড়া অন্যান্য সকল কর্মকর্তা/কর্মচারী জরিপ বিভাগের নিজস্ব কর্মকর্তা/কর্মচারী।

ভূমি জরিপের কাজগুলো সাধারণত সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার ও উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসাররাই করেন। জরিপের কাজ অনেকগুলো স্তরে বিভক্ত। স্তরগুলোর নাম হলো—

(১) ট্রাভার্স

(২) কিস্তোয়ার

(৩) খানাপুরী

(৪) বুঝারত

(৫) তাসদিক

(৬) তাসদিকোত্তর যাঁচ

(৭) খসড়া প্রকাশনা

(৮) আপত্তি

(৯) আপীল

(১০) চূড়ান্ত যাঁচ

(১১) চূড়ান্ত প্রকাশনা।

১। ট্রাভার্স

এ কাজটি অফিসের কাজ। এ কাজের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। এ স্তরে খালি নকশায় মৌজার সীমানার কিছু খুঁটি স্থাপন করা হয়।

২। কিস্তোয়ার

যে নকশায় ট্রাভার্স করে পয়েন্ট বসানো হয়েছে, সে পয়েন্টগুলোর ওপর ভিত্তি করে আমিন কিস্তোয়ার কাজ করেন। কিস্তোয়ারের সাহায্যে মৌজার নকশা অঙ্কন করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ভূমি মালিকদের কর্তব্য হলো তাঁদের জমির আইল আমিনদের দেখিয়ে দেওয়া। এ পর্যায়ে খতিয়ান প্রস্তুত হয় না। কোনো জমির দাগ নম্বরও দেওয়া হয় না।

৩। খানাপুরী

কিস্তোয়ারের কাজ শেষ হওয়ার পর খানাপুরী কাজ করা হয়। এ স্তরে প্রত্যেক ভূমিখণ্ডের আলাদা নম্বর দেওয়া হয়। এ নম্বরকে দাগ নম্বর বলা হয়।

এ স্তরে খতিয়ান খোলা হয়, কিন্তু খতিয়ানে জমির পরিমাণ লেখা হয় না। এমনকি কোন দাগে কী পরিমাণ ভূমি আছে, তাও নির্ধারণ করা হয় না।

৪। বুঝারত

খানাপুরী স্তরের কাজ হওয়ার পর আমিন বুঝারতের কাজ করেন। খানাপুরী স্তরের পরে অফিসে বসে প্রত্যেক ভূমিখণ্ডের এরিয়া/সীমানা কষা হয় এবং বুঝারত স্তরের কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে খানাপুরী স্তরে যে খতিয়ান তৈরি হয়েছে, সে খতিয়ানেই জমির পরিমাণ লেখা হয়।

ভূমির মালিককে জিজ্ঞেস করেই তা সংশোধন করা হয় এবং তার একটি অনুলিপি ভূমি মালিককে দেওয়া হয়। এ অনুলিপিকে মাঠ পর্চা বলা হয়। বুঝারত স্তরে জরিপকারকদের থেকে পর্চা চেয়ে নেওয়া ভূমি মালিকদের দায়িত্ব।

৪-ক। খানাপুরী-কাম-বুঝারত

জরিপের কাজ দু’ভাবে করা হয়। একেবারে নতুন নকশা যদি করা হয়, তবে উপরে বর্ণিত ৪টি স্তর অনুসরণ করা প্রয়োজন। আর যদি পুরোনো নকশার (ব্লু-প্রিন্ট) ওপর কাজ করা হয়, তবে (১) ট্রাভার্স ও (২) কিস্তোয়ার করার প্রয়োজন নেই।

তবে খানাপুরী ও বুঝারত করার প্রয়োজন আছে। পুরোনো নকশার ওপর কাজ করার সময় খানাপুরী ও বুঝারত কাজ একই সঙ্গে করা হয়। তাই একে বলা হয় খানাপুরী-কাম-বুঝারত।

৫। তাসদিক

তাসদিক স্তরের পূর্বের সকল স্তরের কাজ করেন মৌসুমী আমিন। এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমিনের সেটে ৩ জন লোক থাকে—১ জন সর্দার আমিন, ১ জন বদর আমিন ও ১ জন চেইনম্যান। এরা ৬ মাসের জন্য নিয়োগ পান। এরা অস্থায়ী কর্মচারী। ফলে কাজে একটু ডান-বাঁ করতে আমিনরা দ্বিধাবোধ করেন না।

অপরদিকে তাসদিক কাজ করেন একজন কানুনগো। তিনি রাজস্ব ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। সাধারণত উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারগণ তাসদিক করেন। তাঁকে সহায়তা করেন একজন বেঞ্চ ক্লার্ক (বি সি)।

তাসদিক স্তরের কাজ শুরুর ২/১ সপ্তাহ আগে এলাকায় নোটিস জারি করা হয়। তাসদিক করার পূর্বে তাসদিক কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ভূমি মালিক/মালিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। কোন দাগের কোন সম্পত্তির মালিক কে, তা ভালোভাবে জিজ্ঞাসা করে খতিয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন।

যদি খতিয়ানে কোনো ছোটখাটো ভুলত্রুটি থাকে, তবে তাসদিক কর্মকর্তা তা নিজ হাতে সংশোধন করে ‘তাসদিককৃত’ সিল মারবেন ও স্বাক্ষর করবেন। ভূমি মালিকের মাঠ পর্চায় বি সি অনুরূপ সংশোধন করবেন এবং তাসদিক কর্মকর্তা তাতে সিল ও স্বাক্ষর দেবেন।

একটি খতিয়ান তাসদিক হয়ে গেলে তাসদিক কর্মকর্তার আর কিছুই করণীয় থাকে না। তাই খতিয়ান তাসদিকের পূর্বেই ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

বুঝারত স্তর পর্যন্ত তৈরি খতিয়ানের বিরুদ্ধে যদি কারও কোনো অভিযোগ থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের বিরুদ্ধে তাসদিক অফিসারের কাছে ডিসপিউট দাখিল করতে হবে। কোনো খতিয়ান তাসদিক হওয়ার পূর্বে ডিসপিউট দিতে হয়।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-১৭। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ, পৃষ্ঠা-১৭। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এরূপ ডিসপিউট দাখিলের জন্য নির্দিষ্ট ফরম তাসদিক অফিসারের কাছে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কোনো খতিয়ানের ওপর ডিসপিউট পড়লে তাসদিক কর্মকর্তা উভয় পক্ষকে নোটিস করে নির্দিষ্ট তারিখে শুনানি দেবেন। শুনানি শেষে তিনি যে সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন, সে অনুযায়ী খতিয়ান ঠিক করে খতিয়ান তাসদিক করবেন।

কোনোভাবে যদি একটি খতিয়ান তাসদিক হয়ে যায়, তবে সে খতিয়ানের পুনরায় পরিবর্তন করা যাবে না। যদি কোনো মৌজার সমস্ত খতিয়ান তাসদিক করা হয়ে যায়, তবে মৌজাটির যাঁচ করা হবে।

৬। তাসদিকোত্তর যাঁচ

যাঁচ কাজটি সম্পূর্ণ অফিসের কাজ। এ কাজে কোনো ভূমি মালিকের উপস্থিতির প্রয়োজন নেই।

যাঁচ স্তরের কাজের সময় খতিয়ানের ভূমির হিসাব, নামের বিবরণ, হিস্যা ইত্যাদি অর্থাৎ খতিয়ানের পরিপূর্ণতা পরীক্ষা করা হয় এবং প্রয়োজনবোধে ছোটখাটো ত্রুটি ও অসংলগ্ন তথ্য সংশোধন করা হয়।

যাঁচ শেষে খতিয়ানের ভলিউম ভেঙে খতিয়ান সাজিয়ে খতিয়ানে নতুন নম্বর প্রদান করা হয়। খতিয়ানের এ নম্বরকে ডি পি নম্বর বলা হয়।

৭। খসড়া প্রকাশনা

তাসদিকোত্তর যাঁচ শেষ হওয়ার পর মৌজার নকশা এবং খতিয়ান জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য একজন প্রকাশনা কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে খসড়া প্রকাশনা দেওয়া হয়।

সাধারণত খসড়া প্রকাশনার সময় ১ মাস বা তার চেয়ে কিছু বেশি। এ খসড়া প্রকাশনা চলাকালীন ভূমি মালিকগণ খতিয়ান—যা তাঁর জন্য প্রয়োজনীয়—দেখবেন এবং প্রয়োজনে তিনি নিজে অন্য কোনো কাগজে নোট করে নিতে পারবেন।

যদি কোনো ব্যক্তি মনে করেন যে, তাঁর খতিয়ান সঠিকভাবে রেকর্ড করা হয়নি, তবে তিনি আপত্তি দায়ের করতে পারেন। প্রকাশনা অফিসারের কাছে বিনামূল্যে আপত্তি ফরম পাওয়া যায়। খসড়া প্রকাশনা চলাকালীন সময়ে আপত্তি দাখিল করা যায়।

খসড়া প্রকাশনার সময় বাড়ানো হলে আপত্তি দাখিলের সময়সীমাও আপনা-আপনি বেড়ে যায়। আপত্তি ফরম যথাযথভাবে পূরণ করে প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি লাগিয়ে আপত্তি ফরম জমা দিতে হয়।

যথাসময়ে আপত্তি দায়ের করা না হলে সাধারণভাবে আপত্তি দায়ের করা যায় না। তবে যদি কেউ কোনো বিশেষ কারণবশত যথাসময়ে আপত্তি দাখিল করতে না পারেন, তবে তিনি যথাযথ কোর্ট ফি লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে বিশেষ আপত্তি দায়ের করতে পারেন।

সেটেলমেন্ট অফিসার তা অনুমোদন করলে উক্ত আপত্তি কেস দাখিল করতে হবে। সাধারণত আপত্তি কেস চলার সময়ই বিশেষ আপত্তির অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু যদি সংশ্লিষ্ট মৌজার আপত্তি স্তরের সকল কাজ শেষ হয়ে যায়, তবে বিশেষ আপত্তির অনুমতি দেওয়া হয় না।

৮। আপত্তি

আপত্তি স্তরের কাজ করেন একজন সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার। আপত্তি স্তরের কাজ ৩০ ধারা হিসেবেও পরিচিত।

যে মৌজার তাসদিক স্তরের কাজ যিনি করেছেন, তিনি সে মৌজার আপত্তি শুনানি দেবেন না। এ স্তরে আপত্তি অফিসার একটি মৌজার সকল আপত্তি পর্যায়ক্রমে শুনানি দিয়ে নিষ্পত্তি করবেন।

প্রত্যেক পক্ষের প্রতি নোটিস জারি করা হবে। উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানি দিয়ে তা নিষ্পত্তি করা হবে। যদি আপত্তি অফিসার নিশ্চিত হন যে, আপত্তি কেসের উভয় পক্ষের প্রতি নোটিস যথাযথভাবে জারি করা হয়েছে, তবে এক পক্ষের অনুপস্থিতিতেও তা শুনানি দিয়ে নিষ্পত্তি করা যাবে।

তবে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানি নিয়ে নিষ্পত্তি করাই শ্রেয়। কিন্তু বাস্তবে একজন সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারকে প্রতিদিন গড়ে ২৫টি আপত্তি নিষ্পত্তি করতে হয়। ফলে তাঁর পক্ষে একটি আপত্তির পেছনে অধিক সময় ব্যয় করা সম্ভব হয় না।

আপত্তি কেসের আদেশপত্রে খুব সংক্ষেপে সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করা হয়। সিদ্ধান্তের কারণও অত্যন্ত সংক্ষেপে লেখা হয়। একবার আপত্তি আদেশ প্রদান করার পর তা সংশোধনের কোনো বিধান নেই।

আপত্তি আদেশের সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি অফিসার খতিয়ানে সংশোধন করবেন। আপত্তি স্তরে যদি কোনো পক্ষ নকশা সংশোধনের আবেদন করেন, তবে আপত্তি অফিসার অনুমোদিত বদর ফি নিয়ে বদর করবেন এবং বদরের ফলাফল অনুযায়ী নকশা সংশোধন করতে পারবেন।

আপত্তির সঙ্গে জড়িত পক্ষগণ চাইলে আপত্তি আদেশের নকল (অনুলিপি) নিতে পারেন। এ জন্য নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হয়।

৯। আপীল

আপত্তি আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আপীল দায়ের করতে পারেন। আপত্তি নিষ্পত্তি হওয়ার দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপীল দায়ের করতে হয়।

আপত্তি অফিসারের কাছে বিনামূল্যে আপীলের ফরম পাওয়া যায়। আপীলের ফরম পূরণ করে জমা দিতে হয়। আপীলের ফরমের সঙ্গে আপত্তি আদেশের নকলের কপিও জমা দিতে হয়।

সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের কাছে আপত্তি আদেশের নকল চাইলে তা তিনি সরবরাহ করবেন। এ নকল সরবরাহ করতে যতদিন সময় লাগবে, সে সময় বাদ দিয়ে আপীল দায়েরের সময়সীমা ৩০ দিন গণনা করতে হবে।

কোনো মৌজার সকল আপত্তি নিষ্পত্তি হওয়ার পর আপীল স্তরের কাজ শুরু হয়। আপীল স্তরের কাজ ৩১ ধারা হিসেবেও পরিচিত।

সাধারণত সিনিয়র সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারগণ আপীল শুনানি দেন। যে কর্মকর্তা আপত্তি শুনানি দিয়েছেন, তিনি আপীল শুনানি দেবেন না।

আপীল শুনানি দেওয়ার জন্য অত্যন্ত ভালো অফিসার প্রয়োজন। কারণ আপীল স্তরই হচ্ছে জরিপের খতিয়ান ও নকশা সংশোধনের সর্বশেষ স্তর।

কোনো আপত্তির ওপরেই কেবলমাত্র আপীল হয়। কোনো খতিয়ান সংশোধনের জন্য সরাসরি আপীল গ্রহণ করা যাবে না।

আপীল অফিসার উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানি দিয়ে নিষ্পত্তি করবেন। তবে কোনো পক্ষ যদি নোটিস যথাযথভাবে পাওয়ার পর উপস্থিত না হন, তবে আপীল অফিসার এক পক্ষের উপস্থিতিতে আপীল নিষ্পত্তি করতে পারেন।

তবে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে আপীল নিষ্পত্তি করাই শ্রেয়। কারণ একবার আপীল আদেশ প্রদানের পর তা পুনঃশুনানি দেওয়ার কোনো বিধান নেই।

১০। চূড়ান্ত যাঁচ

কোনো মৌজার আপীল স্তরের সকল কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর মৌজাটির চূড়ান্ত যাঁচ করা হয়। এ স্তর অফিসে বসে করা হয়। এ কাজে ভূমি মালিকদের উপস্থিতির প্রয়োজন নেই।

এ স্তরের কাজ শেষ হওয়ার পর মৌজার খতিয়ান ও নকশা ছাপানোর জন্য প্রেরণ করা হয়।

১১। চূড়ান্ত প্রকাশনা

মৌজার নকশা ও খতিয়ান ছাপা হওয়ার পর ১ (এক) মাসের জন্য একটি চূড়ান্ত প্রকাশনা ক্যাম্প খোলা হয়। এ প্রকাশনা ক্যাম্পে মৌজার খতিয়ান ও নকশা বিক্রয় করা হয়।

এছাড়া চূড়ান্ত প্রকাশনার বিষয়ে একটি গেজেট নোটিফিকেশন হয়। চূড়ান্ত প্রকাশনা কার্যক্রম সমাপ্ত হওয়ার পর খতিয়ান ও নকশা জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরূপ হস্তান্তরের পর নতুন এ খতিয়ান ও নকশাই ভূমি মালিকদের মালিকানার পরিচিতি বহন করবে।

জরিপে ভূমি মালিকের সচেতনতা কেন জরুরি

সাধারণভাবে মানুষ একটি কথা বলে—জরিপের সময় যারা ঘুমিয়ে থাকে, তাদের সারাজীবনের ঘুম হারাম হয়ে যায়। অর্থাৎ জরিপের সময় একটু সচেতন না হলে এর খেসারত সারাজীবনই দিতে হবে।

জরিপে খানাপুরী ও বুঝারত স্তরেই রেকর্ড করানো শ্রেয়। এ স্তরে সম্ভব না হলে তাসদিক স্তরে করিয়ে নিতে হবে। তাসদিক স্তরে না হলে আপত্তি স্তরে। এভাবে আপত্তি স্তরে ব্যর্থ হলে আপীল স্তরে রেকর্ড করানোর চেষ্টা করতে হবে।

বুঝারত বা তাসদিক স্তরে রেকর্ড করানো সহজ, কিন্তু আপত্তি স্তরে গিয়ে তা কঠিন হয়ে যায়। কেউ যদি তাসদিক স্তরে তার ভূমি রেকর্ড করিয়ে নিতে পারেন, তথাপিও পরবর্তীতে তার খতিয়ান বহাল আছে কি না বা খতিয়ানে কোনো আপত্তি পড়েছে কি না—এ সকল খোঁজখবর রাখা প্রয়োজন।

আপীল স্তর পার হওয়ার পর যে খতিয়ান যে রূপ থাকবে, সেই রূপেই ছাপা হবে। ছাপায় যদি কোনো ভুল থাকে, তা চূড়ান্ত প্রকাশনা ক্যাম্পে লিখিত আবেদন করলে সেটেলমেন্ট অফিসার সংশোধন করে দেবেন। এমনকি ছাপার ভুল হওয়ার বিষয় চূড়ান্ত প্রকাশনার অব্যবহিত পরেও সংশোধন করা যায়।

অনেক সময় দেখা যায়, ভূমি মালিকগণ ভূমি রেকর্ড কর্মীদের কাছে যান না। ফলে তাদের নামে রেকর্ড করা হয় না। পরবর্তীতে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন।

অভিযোগপত্রের দ্বারা তার ভূমি রেকর্ড করা সম্ভব নয়। অভিযোগের জন্য তদন্ত হতে পারে। কারও শাস্তি দেওয়া হতে পারে। কিন্তু অভিযোগ বা কোনো দরখাস্তের আলোকে রেকর্ড করা হয় না।

অভিযোগকারীকে ভূমি রেকর্ডের নির্দিষ্ট স্তরের—তাসদিক, আপত্তি, আপীল—আলোকে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে দাখিল করতে হবে।

সাধারণ মানুষ জরিপের স্তর জানে না বলে দরখাস্ত বা অভিযোগ করে। এ জন্য সাধারণ মানুষের জানা প্রয়োজন, জরিপের কাজ কীভাবে হয়।

জরিপে দুর্নীতি

অনেকেই একটি কথা প্রায়ই বলেন, দেশে এলে জরিপ মানুষ হয় গরিব। বাস্তবে এ প্রবচনটা অনেকাংশে সত্য। তবে যতটুকু বলা হয়, ততটুকু সত্য নয়।

জরিপ বিভাগ পরিচালনা করে এ দেশের মানুষ। সুতরাং এ দেশের সাধারণ মানুষের হিসেবে এ দেশের সাধারণ চরিত্র—কেমন কারেকটার—জরিপ কর্মচারীদের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।

জরিপ কর্মচারীদের সকলেই দুর্নীতিবাজ, তা বলা যাবে না। আবার দুর্নীতিবাজদের মধ্যেও ধরন আছে। কেউ কেউ আছেন, প্রত্যেকটা কাজেই পক্ষগণের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন। আবার কেউ কেউ আছেন, সাধারণভাবে অর্থ আদায় করেন না; তবে সুযোগমতো পেলে তবেই আদায় করেন।

এখানে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন—যারা অর্থ দিচ্ছে, তারা যদি অর্থ না দেয়, তবে কী হবে?

হ্যাঁ, কেউ যদি কর্মচারীদের অর্থ না দিত, তাহলে এ সমস্যা হতো না। কিন্তু সমস্যা হলো, এটা আজকের প্রথা নয়। অতীতে, অর্থাৎ ৫০ বছর আগে যখন জরিপ হয়েছে, তখনও এ কাজে অর্থের বিনিময় হয়েছে। তবে এখন তার মাত্রা বেড়েছে এবং প্রচার হচ্ছে তার চেয়েও বেশি।

অর্থের বিনিময় যদি বন্ধও হয়ে যায়, তবুও দুর্নীতির প্রচার বন্ধ হবে না। কারণ এমনিতেই ভূমি বিষয়ক অনেক বিরোধ রয়েছে, যার থেকেই এ প্রচারের উৎপত্তি।

ধরা যাক, কোনো মৌজার ভূমি মালিকের সংখ্যা ৫,০০০ জন। এর মধ্যে দেখা যাবে যে, ৪,০০০ জন ব্যক্তির জমিতে পুরোনো কোনো গণ্ডগোল নেই। তাঁদের জমি সাধারণভাবেই রেকর্ড হয়ে যাবে।

কিন্তু বাকি ১,০০০ জনের ভূমিতে যে পুরোনো বিরোধ রয়েছে, তার রেকর্ড প্রণয়ন করাও জরিপ কর্মচারীদের দায়িত্ব। যখন আমিন উক্ত বিতর্কিত ভূমিগুলো রেকর্ড করতে যাবে, তখন সে সমস্যায় পড়বে এবং যেভাবেই হোক তাকে এক পক্ষের নামে রেকর্ড করে দিতে হবে।

ফলে ১,০০০ লোক তার বিরুদ্ধে বলবেই। অপরপক্ষে যে ৪,০০০ জনের কাজ ভালোভাবে হয়ে গেছে, তারা নিশ্চুপ থেকে যাবে। আর বিতর্কিত জমির লোকেরা জরিপ কর্মচারীদের বদনাম করতেই যাবে।

ফলে আসলে জরিপে কে ভালো কর্মচারী বা কে খারাপ, তা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার।

এ সকল দুর্নীতির সঙ্গে বর্তমানে আরেকটা শ্রেণী জড়িত। তাদের মাস্তান, দালাল বা অন্য যেকোনো নামে অভিহিত করা যায়। এরা জমির দলিলপত্র ভালো বোঝে এবং তারাই বিভিন্ন ভূমি মালিককে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়। তারাই দালাল চরিত্র ধারণ করে লেনদেন ও রেকর্ড করানোর দায়িত্ব নেয়।

জরিপ কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই তাদের এড়িয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং হচ্ছেন। ফলে এ মধ্য শ্রেণীর সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করতে কর্মচারীরা বাধ্য হচ্ছেন এবং এতে তারা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন না।

অনেক জায়গাতেই এখন তাসদিক, আপত্তি, আপীল পর্যায় পর্যন্ত তৃতীয় পক্ষের আধিপত্য বিস্তৃত। ফলে এ সমস্যা অত্যন্ত জটিল।

কেবলমাত্র জরিপ কর্মচারীদের চাপ প্রয়োগ করে এর কোনো সমাধান দেওয়া যাবে না। এর জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রয়োজন।


লেখক পরিচিতি

অমৃত বাড়ৈ

চার্জ অফিসার, দিয়ারা সেটেলমেন্ট, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, তেজগাঁও, ঢাকা।