logo
Advertisement

জমির দলিলে দাগ ও খতিয়ানে ভুল থাকলে সংশোধন করার আইনি নিয়ম

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জমির দলিলে দাগ ও খতিয়ানে ভুল থাকলে সংশোধন করার আইনি নিয়ম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

ভূমি বেচাকেনা বা মালিকানা হস্তান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জমি রেজিস্ট্রি বা দলিল। তবে অসাবধানতা কিংবা প্রতারণামূলক উদ্দেশ্যে প্রায়শই দলিলে দাগ নম্বর, খতিয়ান, মৌজা, চৌহদ্দি বা নামের বানানে নানান ভুল লক্ষ করা যায়। এ জাতীয় ভুল পরবর্তীতে স্বত্ব বা দখল নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কীভাবে দলিলে এই ভুলগুলো সংশোধন করা যায় এবং এতে কী কী আইনি নিয়ম রয়েছে চলুন তা জেনে নিই।

এ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ প্রামাণিক)। তার রচিত ‘জমি-জমা নিয়ে আপনার যত আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ২৩৬ ও ২৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘জমির দলিলে দাগ নম্বর ভুল হলে সেই দলিল সংশোধনের উপায় কী?’ শিরোনামে তিনি বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
‘আইনি সমস্যা ও তার আইনি সমাধান’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আইনি মেয়াদে মামলা ও ঘোষণার সুযোগ

দলিল রেজিস্ট্রির তারিখ থেকে ৩ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে দলিল সংশোধনের মোকদ্দমা দায়ের করতে হয়। ৩ বছর পার হয়ে গেলে তা তামাদি আইনের অধীনে বারিত হয়ে যায়; ফলে সরাসরি দলিল সংশোধনের মামলা করা যায় না। সে ক্ষেত্রে আদালতে ঘোষণামূলক মোকদ্দমা দায়ের করতে হয়। আদালত মামলা শেষে যে রায় দেবেন, সেটিই মূলত সংশোধিত দলিল হিসেবে গণ্য হবে। রায়ের সার্টিফায়েড কপি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো হলে তিনি তৎকালীন ভলিউমে তা সংশোধন করবেন। এর জন্য নতুন করে আলাদা কোনো দলিল সম্পাদন করার প্রয়োজন পড়ে না।

উল্লেখ্য, দেওয়ানি আদালতের সিংহভাগ মামলাই ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। যেমন - স্বত্বের মামলা, দখল উদ্ধারের মামলা, চুক্তির সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের মামলা, দলিল বাতিলের মামলা কিংবা নিষেধাজ্ঞার মামলা ইত্যাদি।

দলিল সংশোধনে আইনি শর্তাবলী

১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী, প্রতারণা কিংবা পক্ষগণের পারস্পরিক ভুলের কারণে লিখিত দলিল তৈরি হলে যেকোনো পক্ষ বা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি মামলা দায়ের করতে পারে। তবে দুটি শর্ত পূরণ আবশ্যক-

দলিলে প্রতারণা বা উভয় পক্ষের সাধারণ/পারস্পরিক ভুল থাকতে হবে এবং তা আদালতে প্রমাণ করতে হবে।

একক কোনো পক্ষের ভুলের কারণে দলিল সংশোধনের সুযোগ আইনত নেই।


বাস্তব উদাহরণের আলোকেই আইনি ব্যাখ্যা

প্রতারণা ও প্রতিকার: ধরা যাক, এক ব্যক্তি তিনটি দাগে (যেমন: ৫১, ৫২ ও ৫৩ দাগ) মোট জমির মালিক। তিনি কেবল ৫১ দাগের জমি বিক্রি করলেও প্রতারণামূলকভাবে দলিলে অন্য দুটি দাগও ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। পরবর্তী সময়ে যদি ৫২ দাগের জমি ভাই বা তৃতীয় কাউকে দান বা হস্তান্তর করা হয় এবং ৫৩ দাগের জমি তৃতীয় কোনো ব্যক্তি সরল বিশ্বাসে কিনে নেন—তবে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী ৫২ দাগের জন্য দলিল সংশোধনের প্রতিকার পাওয়া যাবে। কিন্তু সরল বিশ্বাসে কেনা ৫৩ দাগের ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষিত থাকবে; ফলে সংশোধন না পেয়ে মূল বিক্রেতার থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরল বিশ্বাসে ক্রেতার সুরক্ষা: যদি প্রতারণার মাধ্যমে অন্তর্ভূক্ত করা জমি ইতোমধ্যেই কোনো তৃতীয় ব্যক্তির কাছে সরল বিশ্বাসে মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যায়, তবে সেই জমিতে দলিল সংশোধন কার্যকর করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মূল প্রতারক ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাবেন।

কোন কোন দলিল সংশোধনযোগ্য এবং আদালতের এখতিয়ার

কবলা দলিল, লিখিত চুক্তিপত্র কিংবা বন্ধকী দলিল—সবকিছুই সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী সংশোধন করা যায়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, দলিল সংশোধনের মামলা দায়ের করলেই যে আদালত সংশোধন মঞ্জুর করবেন, বিষয়টি তেমন নয়। মামলা দায়েরকারীর আইনগত একক অধিকার (as of right) হিসেবে দলিল সংশোধন পাওয়া যায় না; এটি বিচারকের বিবেচনামূলক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। তবে এই বিবেচনামূলক ক্ষমতা কোনোভাবেই স্বেচ্ছাচারী হবে না, যা একই আইনের ২২ ধারায় স্পষ্ট করা রয়েছে।

বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটি থেকে লেখার অংশ বিশেষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমির দলিল হস্তান্তরের সময় সতর্ক থাকা এবং পরবর্তীতে কোনো ভুল চোখ পড়লে দ্রুত আইনি পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অযাচিত ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখকের পরিচয়

ড. পি. এম. সিরাজুল ইসলাম পাঠকসমাজে ‘সিরাজ প্রামাণিক’ নামে পরিচিত। কলেজজীবন থেকেই তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। তিনি দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আমার দেশসহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় লিখেছেন।

সংবাদপত্রের সুবাদে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বিভিন্ন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। গবেষণার কাজে কিছু সময় কাটিয়েছেন থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজধানী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মণ্ডলের তত্ত্বাবধানে উচ্চতর গবেষণা করেন।

বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বইটির ফ্লাপে দেওয়া লেখক পরিচিতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তার গবেষণার বিষয় ছিল, ‘Right to life and personal liberty in Bangladesh with special reference to extra-judicial killing.’ লেখকের আইনবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আইনবিষয়ক একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বইয়ের লেখক পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘পকেট আইন’, ‘আইনে আপনার যত অধিকার’, ‘২২টি আইনের সহজ পাঠ’, ‘জমি ক্রয়-বিক্রয় আইন’, ‘জমি জমার আইন-কানুন ও আলোচনা’, ‘রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট অ্যান্ড ডিড রাইটিং’, ‘উইথ মডেল’, ‘রিয়াদ আইন’, ‘বিয়ে-তালাক-দেনমোহর-ভরণপোষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’, ‘সংবাদপত্র বিষয়ে আইন’, ‘কম্পিউটার অপরাধ আইন’, ‘ফৌজদারি মামলা পিটিশন পদ্ধতি’, ‘পারিবারিক আইন’, ‘নাগরিক অধিকার আইন’, ‘লিগ্যাল নোটিশ অ্যান্ড অ্যাফিডেভিট লেখার পদ্ধতি’, ‘প্রাত্যহিক জীবনে আইন’, ‘উত্তরাধিকার আইন’ ও ‘ওয়াক্‌ফ’ প্রভৃতি।